ইলেক্ট্রোন
Electron
[দেখুন: ইলেক্ট্রোন অভিধান]

পরমাণুর একটি মৌলিক কণা। এই কণাটি একটি ঋণাত্মক তড়িৎ আধান বহন করে। পরমাণুর মৌলিক অন্যান্য মৌলিক কণার (প্রোটন, নিউট্রোন) বিচারে এটি সবচেয়ে হাল্কা। এর ভর ৯.১০৯ ৩৮২ ৯১ (৩০) × ১০-৩১ কেজি। তুলনামূলক বিচারে প্রোটনের চেয়ে এর ভর ‌১/১৮৩৬ অংশ। এর ঘূর্ণন ১/২। এই বিচারে ইলেক্ট্রনগুলোকে ফার্মিয়ন (
fermion) বলা হয়। আধুনিক পরমাণু-বিশ্লেষণে পরমাণুর ইলেক্ট্রোনের পরিচয় তুলে ধরা হয় কোয়ান্টাম সংখ্যা দ্বারা। পরমাণুতে ইলেক্ট্রোনের পরিচয় তুলে ধরা হয় চারটি মান দ্বারা। এই মানগুলোকে বলা হয় প্রধান কোয়ান্টাম সংখ্যা, সহকারী কোয়ান্টাম সংখ্যা, চৌম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা ও চক্রণ কোয়ান্টাম সংখ্যা। [দেখুন : কোয়ান্টাম সংখ্যা]

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে জে জে থমসন (
J. J. Thomson, ) ইলেক্ট্রোন আবিষ্কার করেন এবং একই সাথে তিনি পদার্থের ভিতর ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের বিন্যাসের বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন। থমসনের পরমাণু মডেলকে Plum pudding model নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই মডেল অনুসারে পুডিং-এর ভিতরে কিশমিশ যেমন ইতস্তত বিক্ষিপ্তাকারে থাকে, পরমাণুর ভিতরে তেমনি ধনাত্মক আধানের ভিতর ঋণাত্মক আধান বিক্ষিপ্তভাবে থাকে। এই ঋণাত্মক আধানগুলোর ভিতরে তড়িৎ মিথস্ক্রিয়ার কারণে এরা এক এ্যাংস্ট্রম পর্যায়ের ব্যাসার্ধের কল্পিত গোলাকৃতি পরমাণুর ভিতর বিন্যস্ত থাকে।

থমসনের পরমাণু মডেল থেকে পরমাণুর যে গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, রাদার ফোর্ডের মডেল দ্বারা বাতিল হয়ে যায়। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে রাদার্ডফোর্ড আলফা কণিকা বিক্ষেপণ পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষা থেকে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে রাদার্ডফোর্ড একটি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে বলা হয় পরমাণুর কেন্দ্রে ধনাত্মক আধানযুক্ত ভারি বস্তু রয়েছে। বিজ্ঞানীরা পরবরতী সময়ে এর নামকরণ করেন নিউক্লিয়াস। পরমাণুর সকল ভর পরমাণুর নিউক্লয়াসে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এই নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ ১০-১৫ মিটার। এই নিউক্লয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেক্ট্রোনগুলো আবর্তিত হচ্ছে। এই মডেল পরবর্তী সময়ে ত্রুটিপূর্ণ হিসাবে বাতিল হয়ে যায়। এরপরে এই স্থান পূরণ করে বোরে পরমাণু মডেল।

১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে নেইলস বোর নতুন একটি মডেল উপস্থাপন করেন। একে বলা হয় বোর-এর পরমাণু মডেল। তিনি দুটি স্বীকার্য দ্বারা এই মডেলকে উপস্থাপন করেন। পরবর্তীকালে পরমাণুর অন্যান্য কণা সম্পর্কে জানা গেছে।

শক্তিস্তরে ইলেকট্রন বিন্যাস
বোরের মডেল অনুসারে জানা যায়, পরমাণুর ইলেক্ট্রোনগুলো তাদের নিজ নিজ শক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তিস্তরে অবস্থান করে।
ইলেক্ট্রোনগুলো যে গতিপথ ধরে পরিভ্রমণ করে তাকে বলা হয় কক্ষপথ নামে পরিচিত।
বোরের মডেল অনুসারে জানা যায়, পরমাণুর ইলেক্ট্রনগুলো তাদের নিজ নিজ শক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তিস্তরে অবস্থান করে। এই শক্তিস্তরগুলোকে কয়েকটি সাংকেতিক নামে চিহ্নিত করা হয়। এই নামগুলো হলো K, L, M, N। 

এই কক্ষপথের আকৃতি এবং ইলেক্ট্রোন ধারণক্ষমতা নির্ভর করে নিউক্লিয়াস থেকে কক্ষপথের দূরত্বের উপর। নির্দিষ্ট দূরত্বের প্রতিটি কক্ষপথের সর্বোচ্চ ইলেক্ট্রন ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট। অণু বা পরমাণুর কোন কতগুলো ইলেক্ট্রন অবস্থান করবে তা আউফবাউ বিধি অনুসারে নির্ধারিত হয়। এই বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে-

কোন কক্ষপথে ইলেক্ট্রোন প্রবেশের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোন সর্বপ্রথম নিম্নশক্তির কক্ষপথ পূর্ণ করে, তারপর উচ্চশক্তির অরবিটালে প্রবেশ করে। এই শক্তিক্রমগুলো হলাে- 1s, 2s, 2p, 3s, 3p, 4s, 3d, 4p, 5s, 4d, 5p, 6s, 4f, 5d, 6p, 7s, 5f, 6d ।

১৯২৯ খ্রিষ্টাব পাউলি্ বিভিন্ন মৌলের পারমাণবিক বর্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যামে পরমাণুতে ইলেক্ট্রোনগুলোর উপস্থিতি বিষয়ক একটি বিধি দিয়েছেন। সাধারণভাবে এই বিধিকে বলা হয়- পাউলির বর্জন বিধিপাউলর বর্জনবিধি অনুসারে একই কক্ষে একই চক্রণমান যুক্ত ইলেক্ট্রন একই কক্ষে থাকতে পারে না। কিন্তু এই মান ভিন্ন হলে একটি কক্ষে ইলেক্ট্রন আবর্তিত হতে পারবে। যেমন হিলিয়ামের পরমাণুর প্রথম কক্ষপথে দুটি ইলেক্ট্রন থাকে। এদের প্রথম তিনটি কোয়ান্টাম মান একই কিন্তু এদের চক্রণের দিক ভিন্ন, তাই একই কক্ষে দুটি ইলেক্ট্রন থাকতে পারে।

কোন অণু বা পরমাণুর অর্বিটালগুলোতে কতটি করে ইলেক্ট্রন রয়েছে তা বিশেষ উপায়ে প্রকাশিত রূপই হচ্ছে ইলেক্ট্রন বিন্যাস। পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাসের উপরে ঐ পরমাণুর যোজনী নির্ভর করে। ইলেক্ট্রন বিন্যাসের বৈশিষ্ট্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে সমযোজী বন্ধনের ভিত্তি। এই শক্তিস্তরগুলোকে কয়েকটি সাংকেতিক নামে চিহ্নিত করা হয়। এই নামগুলো হলো ।  পরমাণুর কেন্দ্র থেকে এই শক্তিস্তরগুলোকে ক্রমিক সংখ্যা দ্বারা নির্ধারিত হয়। এই বিচারে শক্তিস্তরগুলোর মান হয়

  • K=n=1
  • L=n=2
  • M=n=3
  • N=n=4
  • O=n=5
  • P=n=6
  • Q=n=7
প্রতিটি শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনেরসংখ্যা একটি গাণিতিক সূত্রে নির্ধরিত থাকে। সূত্রটি হলো- 2n² । এখানে
  • 2 হলো ধ্রুব মান
  • n হলো পরমাণুর শক্তিস্তর মান
উল্লিখিতি দুটি ছকের বিচারে পরমাণুর শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোন সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা হয়−
  • K শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×2² ২ টি
  • L শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×2² =৪ টি
  • M শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×3² =১৮ টি
  • N শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×4² =৩২টি
  • O শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×5² =৫০ টি
  • P শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনেরধারণক্ষমতা 2×6² =৭২ টি
  • Q শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোনের ধারণক্ষমতা 2×7² = টি
১ থেকে ১৮ পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট মৌলসমূহ অর্থাৎ হাইড্রোজেন থেকে আর্গন পর্যন্ত এই নিয়ম মেনে চলে। এই মৌলসমূহের ইলেকট্রনকে বিভিন্ন শক্তিস্তরে উপরের ধারণক্ষমতা অনুসারে সাজানো যায়। নিম্ন শক্তিস্তর ইলেক্ট্রোন দ্বারা পূর্ণ হলে পরবর্তী শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোন প্রবেশ করে। পারমাণবিক সংখ্যা ১৯ থেকে অধিক পারমাণবিক সংখ্যাবিশিষ্ট মৌলের পরমাণুর ইলেক্ট্রোন বিন্যাসের সময় তৃতীয় শক্তিস্তর পূর্ণ না হয়ে চতুর্থ শক্তিস্তরে ইলেক্ট্রোন প্রবেশ করে।
সূত্র:
বাংলা একাডেমী বিজ্ঞান বিশ্বকোষ। ১-৫ খণ্ড।

http://en.wikipedia.org//a.org/