ইতালিক
বানান বিশ্লেষণ : ই+ত্+আ+লিক্
উচ্চারণ:
i.t̪a.lik (ই.তা.লিক)
শব্দ-উৎস: গ্রিক
Italia ল্যাটিন Italia দেশের নাম> Italiano ইতালি ভাষা> ইংরেজি Italian> বাংলা ইতালিয়ান
পদ: বিশেষ্য
ঊর্ধ্বক্রমবাচকতা { | ইটালিক ভাষা | ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা | প্রাকৃতিক ভাষা | ভাষা | যোগাযোগ | বিমূর্তন | বিমূর্ত সত্তা | সত্তা | }

অন্যান্য নাম: ইতালীয়, ইতালিক, ইতালিয়ান, ইতালিয়ানো, লিঙ্গুয়া ইতালিয়া।

অর্থ:
ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্গত একটি ভাষা বিশেষ। অন্য নাম ইতালিয়ান ভাষা। খ্রিষ্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শুরু দিকে ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের মানুষ বর্তমান ইতালি-উপদ্বীপে ছোটো ছোটো দলে এসে বসতি স্থাপন করা শুরু করে। ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষার আদি রূপ বিবর্তিত হয়ে তৈরি হয়েছিল প্রাক্ ইতালীয় উপ-পরিবার।

প্রাক্-ইতালিক ভাষা
ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে খ্রিষ্টপূরব ২৫০০ অব্দের দিকে ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষার বিবর্তনের নানা ধরনের উপভাষার সৃষ্টি হয়েছিল। এই সূত্রে তৈরি হয়েছিল প্রাক-ইতালিক ভাষা। ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষার একটি অংশ  আল্পস পর্বতমালার উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার সূত্রে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল প্রাক-ইতালিক ভাষা। এদের ভিতরে কিছু কিছু মানুষ দল বেঁধে দক্ষিণ দিকের ইতালিয়ান উপদ্বীপে প্রবেশে করেছিল ২০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে। এই উপভাষা পরিবারের মানুষ বর্তমান ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার সূত্রে প্রাক্-ইতালিক ভাষা উপ পরিবার কয়েকটি ভাগ বিভাজিত হয়ে গিয়েছিল। এই ভাগগুলো-

 




ইতালিকা ভাষার আদি ভাষাভাষীরা বাস করতো এদের সাথে ভাষাগত মিল ছিল কেল্টিক ও প্রাক্-জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের। খ্রিষ্টপূর্বে ১৭০০ অব্দের দিকে উৎপত্তি ঘটেছিল

 ভাষার সূত্রে যে ইতালিক ভাষার আদি রূপ

আদি আদি ইতালীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি প্রাচীন উপ-গোষ্ঠী ছিল ভেনেটিক ভাষা। এরা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর উত্তর-পূর্ব ইতালিতে বসতি গড়ে তুলেছিল। খ্রিষ্টপূ্ব ১২০০ অব্দের দিকে ল্যাটিনো-ফালিস্কান ভাষার গোষ্ঠীর ইতালি উপদ্বীপে বসতি স্থাপন করে। এরূপ নানা দিক থেকে আগত গোষ্ঠীগুলোর কথ্যরূপ কাছাকাছি ছিল। ফলে সকল গোষ্ঠীর ভাষার সমন্বয়ে উদ্ভব হয়েছিল ইতালীয় ভাষাগোষ্ঠী। কালক্রমে ইতালি-উপদ্বীপে এই ভাষাগোষ্ঠী থেকে উদ্ভব হয়েছিল বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা। তবে এসকল ভাষাগোষ্ঠীর ভিতরে রোমের আশপাশে বসতি স্থাপনকারী আঞ্চলিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ শক্তিশালী রাজশক্তির বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।
সে সময়ে এই আঞ্চলিক ভাষার নাম ছিল লাতিনাম।
৭৫৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই ভাষাভাষীর রাজা রোমুলাস রোম নগরীর পত্তন করেন। এর ফলে রাজপরিবারের ভাষা হিসেবে ধীরে ধীরে লাতিনাম রোমের রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয়েছিল এবং অন্যান্য অঞ্চলিক ভাষাগুলো- লাতিন ভাষার আগ্রাসনে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে লাতিন ভাষায় ব্যাপকভাবে অন্যান্য ভাষার শব্দ প্রবেশ করে। ফলে ভাষাটি দুটি ভাগে ভাগে বিভাজিত হয়েছিল। এর ভিতর প্রাচীন ধ্রুপদী লাতিন ভাষাটির নাম দেওয়া হয়- লিঙ্গুয়া লাতিনা এবং নব্য ধারার লাতিনের নাম দেওয়া হয় লিঙ্গুয়া রোমানা। এই লিঙ্গুয়া রোমানা ভাষা রোম ইতালি এবং এর পারশ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে আঞ্চলিকতার সুবাদে সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক ইতালীয়, ফরাসি, স্পেনীয়, পর্জতুগিজ, রোমানীয় নামক ভাষাগুলো।

বর্তমানে আদর্শিকভাবে যে কথ্যরূপটি মান্য করা হয়, তা হলো- উত্তর ও দক্ষিণ ইতালিতে প্রচলিত উপভাষা। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লক্ষ লোক কথা বলে থাকেন। ইতালীয় ভাষাভাষীরা মূলত ইতালিতে বাস করেন। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের চারটি সরকারি ভাষার একটি হল ইতালীয় ভাষা। এবং সান মারিনো ও ভ্যাটিকান শহরের সরকারি ভাষা হলো ইতালীয়।
এই ভাষার শব্দের ভিতরে লাতিন শব্দের সর্বাধিক ব্যবহার হয়ে থাকে।


আজ হতে কমপক্ষে ৫০০০ বছর আগে এক জাতি ইউরোপের মধ্যভাগ হতে দক্ষিণ পূর্বাংশ ভূভাগে বাস করতো এবং তারা মোটামুটি একই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতো। এই ভাষাকে ইন্দো-ইউরোপীয় মূলভাষা (Indo-European Parent Speech) ধরা হয়। এই মূল ভাষাগোষ্ঠীর দুইটি বিভাগ (Groups) ছিলো। পণ্ডিতেরা একটিকে কেন্তুম (Centum) এবং অপরটিকে শতম (Satam) বিভাগ নাম দিয়েছেন। ইউরোপের ইন্দো-ইউরোপীয় মূলভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে আলবানি এবং বাল্টোস্লাবোনিক ছাড়া অপর সবগুলো ভাষা কেন্তুম বিভাগ থেকে উৎপন্ন। এশিয়া মহাদেশেও কেন্তুম বিভাগের দুইটি শাখা এক সময়ে বিদ্যমান ছিলো। তার একটির নাম হিত্তী (Hitti) ভাষা। এটি এশিয়া মাইনরে প্রায় দেড় হাজার খ্রিষ্টপূর্বে প্রচলিত ছিল। অপরটি তুখারী (Tokharian)ভাষা। এটি মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত ছিল। প্রায় খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতক পর্যন্ত এই ভাষা জীবিত ছিল। কেন্তুম বিভাগের সাথে আমাদের বাংলা ভাষার কোনো সাক্ষাৎ সম্বন্ধ নেই, কিন্তু শতম বিভাগ হতে যে আর্য শাখা উদ্ভূত হয় তার সাথেই বাংলার সাক্ষাৎ সম্পর্ক রয়েছে। আর্য শাখার স্বাবিভাগীয় শাখাগুলো এই, যথা : আলবানি, বাল্টোস্লাবোনিক, আরর্মানী। আর্য শাখার দুইটি প্রধান প্রশাখা স্বীকার করা হয় : একটি ইরানি এবং অপরটি ভারতি। ইরানি প্রশাখা হতে আবেস্তার ভাষা, প্রাচীন পারসী ভাষা, পহলবি বা মধ্য পারসী ভাষা, আধুনিক পারসী ভাষা, কুর্দিস্তানি, বলোচি, আফগানি বা পোশতু, ওসেটিক, পামিরি প্রভৃতি ভাষা উৎপন্ন হয়েছে।

ভারতীয় আর্য প্রশাখা হতে ক্রমে বিবর্তন ও পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে বাংলার বর্তমান রূপ আমরা পেয়েছি। এই দুই প্রশাখার মধ্যবর্তী একটি প্রশাখাকে দারদি (Dardic) আখ্যা দেয়া হয়েছে। এটি হতে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের প্রদেশের কাফিরি ভাষাগুলো উৎপন্ন হয়েছে। ভারতীয় আর্য ভাষাকে আমরা প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত করতে পারি-
১. আদিম স্তর : – প্রাচীন ভারতীয় আর্য এবং আদিম প্রাকৃত (১২০০-৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)।
২. মধ্য স্তর : – মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা। এর তিনটি উপস্তর রয়েছে। যথা-
(ক) ১ম উপস্তর : – অশোক অনুশাসন লিপি, সাঁচি ও বাহুরতের প্রস্তর লিপি, খারবেল লিপি প্রভৃতির ভাষা। পালি এর একটি সাহিত্যিক রূপ। সংস্কৃত এই যুগের ব্রাহ্মণ্য সমাজের সাহিত্যিক ভাষা ছিল। এটি আদিম ও মধ্য স্তরের অন্তর্বর্তী। ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব হতে ১০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই উপস্তর। আমরা একে প্রাচীন প্রাকৃত বলতে পারি।
সন্ধি স্তর : – (Transitional stage)_ নাসিক গুহার লিপি। পল্লব লিপি, সাতবাহন লিপি প্রভৃতির ভাষা। ১০০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।
(খ) ২য় উপস্তর : – নাটকীয় প্রাকৃত ভাষা। ২০০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আমরা একে মধ্য প্রাকৃত বলতে পারি। পরে এটি সাধারণত সংস্কৃত নাটকে ও জৈন সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
(গ) ৩য় উপস্তর : – অপভ্রংশ। ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। নাটকীয় প্রাকৃত অপভ্রংশ বস্তুত সমকালীন। কিন্তু আদিতে অপভ্রংশ ব্রাহ্মণেতর অর্থাৎ বৌদ্ধ বা জৈন সমাজে ব্যবহৃত হতো। সম্ভবত সম্মতীয় মতের বৌদ্ধগণ সর্বপ্রথম অপভ্রংশ ব্যবহার করেন। পরে ব্রাহ্মণ্য সমাজেও অপভ্রংশ ব্যবহৃত হতে থাকে।
আধুনিক স্তর : – আধুনিক ভারতীয় আর্য ভাষাগুলির (New Indo-Aryan) প্রাচীনতম রূপ ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষা প্রাচীন রূপ (Old Bengali) পরিবর্তন করে মধ্য বাংলায় (Middle Bengali) পরিণত হয়। এই মধ্য বাংলা হতে আধুনিক বাংলার (Modern Bengali) উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন বাংলা ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। সন্ধিযুগ ১২০০-১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। মধ্যযুগ ১৩৫০- ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। নব্য যুগ ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত। নব্যযুগকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ১৮০০ হতে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পুরাতন কাল এবং ১৮৬০ থেকে এখন পর্যন্ত বর্তমান কাল।

ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা হতে আধুনিক বাংলা পর্যন্ত স্তরগুলির কালক্রম

  1. ইন্দো-ইউরোপীয়ান, আনুমানিক ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
  2. ইন্দো-ইরানি, আনুমানিক ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
  3. প্রাচীন ভারতীয় আর্য (বৈদিক উপভাষাগুলো), আনুমানিক ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
  4. মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচ্য শাখার বিবর্তন, আনুমানিক ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
  5. মগধের মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার আদি স্তর (প্রাচীন মাগধী), আনুমানিক ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ।
  6. মগধের পরিবর্তনশীল মধ্যভারতীয় আর্য ভাষা, খ্রিষ্টাব্দের প্রায় সমকালীন।
  7. মগধের মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার দ্বিতীয় স্তর, আনুমানিক ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ।
  8. মগধ এবং বাংলার অর্বাচীন মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা বা মাগধ অপভ্রংশও, আনুমানিক ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ।
  9. প্রাচীন বাংলা, আনুমানিক ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ।
  10. আদি মধ্য বাংলা, আনুমানিক ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ।
  11. অর্বাচীন মধ্য বাংলা, আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ।
  12. নব্য বাংলা বা আধুনিক বাংলা ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পর।

তিনি তাঁর পরবর্তী Indo-Aryan and Hindi পুস্তকে মূল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা সময় ৩৫০০- ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ অনুমান করেছেন। তবে তাঁর এই সমস্ত কাল নির্ণয় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বীকার করেন নি।