বিংশ শতাব্দীর ৮০'র দশকের ছায়ানট আয়োজিত নববর্ষ

বঙ্গাব্দ
ঊর্ধ্বক্রমবাচকতা   {| বৎসর | পর্যায় কাল |মৌলিক পরিমাপ | পরিমা | বিমূর্তন | বিমূর্ত সত্ত | সত্তা |}
 

বঙ্গের অব্দ, এই অর্থে বঙ্গাব্দ। বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। এটি একটি সৌরবর্ষ পঞ্জিকা। খ্রিষ্টাব্দের (গ্রেগোরিয়ান পঞ্জিকা) দিনের শুরু হয় রাত ১২টা থেকে। কিন্তু বঙ্গাব্দের দিন গণনা হয় সূর্যোদয় থেকে। এই অব্দ গ্রেগোরিয়ান পঞ্জিকা-র মতোই ১২ মাসে বিভক্ত। এই মাসগুলো হলো  বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র।


এই অব্দের শুরু হয় ১লা বৈশাখ থেকে। খ্রিষ্টাব্দের বিচারের বঙ্গাব্দের নববর্ষ শুরু হয় বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল এবং ভারতে ১৪ বা ১৫ এপ্রিল থেকে। যে কোনো খ্রিষ্টাব্দের (গ্রেগোরিয়ান পঞ্জিকা) ১৪ বা ১৫ এপ্রিলে যে অব্দমান পাওয়া যায়, সেখান থেকে ৫৯৩ বৎসর বিয়োগ করলে বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়। যেমন কোনো বৎসরের ১৪ বা ১৫ এপ্রিল তারিখে যদি বৎসরের সংখ্যা ২০১২ হয়, তবে ওই দিন থেকে বঙ্গাব্দের প্রথম দিন হিসাবে গণনা শুরু হবে এবং তখন বঙ্গাব্দ হবে ২০১২ ৫৯৩= ১৪১৯। কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ ১লা বৈশাখের আগের দিনে ওই বঙ্গাব্দ হবে ১৪১৮।

 

চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা

সূর্যসিদ্ধান্ত ও বাংলা মাসের নাম
বাংলা মাসের নামগুলো গৃহীত হয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বজ্ঞানের ক্রমধারার সূত্রে। ভারতের আর্যদের দ্বারা প্রণীত বেদকে আদিগ্রন্থ বলা হয়। বেদের আনুষঙ্গিক বিষয়ে নিয়ে ছয় প্রকার শাখা তৈরি হয়েছিল। এই শাখাগুলি বেদাঙ্গ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এর ভিতরে পঞ্চম শাখা হলো–  জ্যোতিষ। জ্যোতিষশাস্ত্র প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত। এই ভাগগুলো হলো–  গণিত, হোরা এবং সংহিতা। জ্যোতিষশাস্ত্রের গণিত দুই ভাগে বিভক্ত। এই ভাগ দুটি হলো–  সিদ্ধান্তকরণ

৫৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বরাহমিহির পঞ্চসিদ্ধান্তিকা নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। গ্রন্থটি পাঁচটি খণ্ডে সমাপ্ত। এই গ্রন্থটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের সংক্ষিপ্তসার বলে অভিহিত করা হয়। পঞ্চসিদ্ধান্তিকার মতে পাঁচটি সিদ্ধান্ত হলো– সূর্যসিদ্ধান্ত, বশিষ্ঠসিদ্ধান্ত, পৌলিশ সিদ্ধান্ত, রোমক সিদ্ধান্ত ও ব্রহ্ম সিদ্ধান্ত। এর ভিতরে প্রাচীন ভারতের দিন, মাস, বৎসর গণনার ক্ষেত্রে 'সূর্যসিদ্ধান্ত' একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল।


বরাহমিহিরের পরে ব্রহ্মগুপ্ত নামক অপর একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী (জন্ম ৫৯৮) একটি সিদ্ধান্ত রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থটির নাম ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত। এই গ্রন্থটি খলিফা আল-মনসুরের আদেশে সিন্দহিন্দ নামে আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল।
 
ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে সৌর-মাস নির্ধারিত হয়, সূর্যের গতিপথের উপর ভিত্তি করে। সূর্যের ভিন্ন অবস্থান নির্ণয় করা হয় আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের বিচারে। প্রাচীন কালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের বার্ষিক অবস্থান অনুসারে আকাশকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। এর একটি ভাগকে তাঁরা নাম দিয়েছিলেন রাশি। আর ১২টি রাশির সমন্বয়ে যে পূর্ণ আবর্তন চক্র সম্পন্ন হয়, তার নাম দেওয়া হয়েছিল রাশিচক্র। এই রাশিগুলোর নাম হলো– মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন।

 

আবার অন্যদিক থেকে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সমগ্র আকাশকে একটি বৃত্তাকার চক্র হিসাবে কল্পনা করে ২৭টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। এই ভাগগুলোকে নক্ষত্র হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এই নক্ষত্রগুলো হলো– অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আর্দ্রা, পুনর্বসু, পুষ্যা, অশ্লেষা, মঘা, পূর্ব-ফাল্গুনী, উত্তর-ফাল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, ধনিষ্ঠা, শতভিষা, পূর্বভাদ্রপদা, উত্তরভাদ্রপদা এবং রেবতী। এর ফলে নক্ষত্রের স্থানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬০/২৭ ডিগ্রি= ১৩ ডিগ্রি ২০ মিনিট=৮০০ মিনিট। 
 

সূর্যের বার্ষিক অবস্থানের বিচারে, সূর্য কোনো না কোন রাশির ভিতরে অবস্থান করে। এই বিচারে সূর্য পরিক্রমা অনুসারে, সূর্য যখন একটি রাশি থেকে অন্য রাশিতে যায়, তখন তাকে সংক্রান্তি বলা হয়। এই বিচারে একবৎসরে ১২টি সংক্রান্তি পাওয়া যায়। মূলত একটি সংক্রান্তির পরের দিন থেকে অপর সংক্রান্ত পর্যন্ত সময়কে এক সৌর মাস বলা হয়। লক্ষ্য করা যায়, সূর্য পরিক্রমণ অনুসারে সূর্য প্রতিটি রাশি অতিক্রম করতে একই সময় নেয় না। এক্ষেত্রে মাসভেদে সূর্যের রাশি অতিক্রমের সময় হতে পারে–  ২৯, ৩০, ৩১ বা ৩২ দিন। সেই কারণে একটি বৎসরের ১২ মাসের দিন সংখ্যা সমান হয় না।


মাসের নামকরণের ক্ষেত্রে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূল তিনটি সূত্রকে অনুসরণ করেছিলেন। সূত্র তিনটি হলো–  

এই তিনটি সূত্রের উপর ভিত্তি করে মাসের দিন সংখ্যা এবং নাম বিবেচনা করা হয়েছে। ধরা যাক বৎসরের কোনো এক সময় সূর্য মেষ রাশিতে আছে। যে মুহূর্তে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করবে, সেই মুহূর্ত থেকে মেষরাশির মাস শুরু হবে। যে  মুহূর্তে সূর্য মেশ রাশি অতিক্রম করে, পরবর্তী বৃষ রাশিতে প্রবেশ করবে, সেই মুহূর্তে মেষ রাশির মাস শেষ হবে যাবে।

তৃতীয় সূত্রানুসারে, মেষরাশির পূর্ণিমার সময় সূর্য বিশাখা নক্ষত্রের উপর অবস্থান করেছিল, এই কারণে বিশাখা নক্ষত্রের নামানুসারে মেষ রাশির মাসটির নামকরণ করা হয়েছিল– বৈশাখ। এই সূত্রে ১২টি মাসের নামকরণ করা হয়েছিল যে সকল নামে, তা হলো-
 

মাস

রাশি

নক্ষত্রের নাম

বৈশাখ

মেষ

বিশাখা

জ্যৈষ্ঠ

বৃষ

জ্যেষ্ঠা

আষাঢ়

মিথুন

উত্তরাষাঢ়া

শ্রাবণ

কর্কট

শ্রবণা

ভাদ্র

সিংহ

পূর্বভাদ্রপদ

আশ্বিন

কন্যা

অশ্বিনী

কার্তিক

তুলা

কৃত্তিকা

মার্গশীর্ষ

বৃশ্চিক

মৃগশিরা

পৌষ

ধনু

পুষ্যা

মাঘ

মকর

মঘা

ফাল্গুন

কুম্ভ

উত্তরফাল্গুনী

চৈত্র

মীন

চিত্রা

 

বেদাঙ্গ মতে বর্ষ শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাসে। উল্লেখ্য সংস্কৃত 'অয়ন' বৎসর। বৎসরের অগ্র হিসাবে এই মাসের নাম ছিল 'অগ্রহায়ণ'। মূলত সে সময়ে বৎসর শুরু হতো বৃশ্চিক রাশিতে, মৃগশিরা নামক নক্ষত্রের নামানুসারে মাসের নাম মার্গশীর্ষ না হয়ে দাঁড়িয়েছিল 'অগ্রহায়ণ'।

বঙ্গাব্দের দিনের নাম
বাংলা মাসের নামগুলো গৃহীত হয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্রমধারার সূত্রে। এই নামগুলি মূলত মহাকাশীয় বস্তু (গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র) থেকে গৃহীত হয়েছে।

দিনের নাম

মহাকাশীয় বস্তু

সোম

চন্দ্র

মঙ্গল

মঙ্গল গ্রহ

বুধ

বুধ গ্রহ

বৃহস্পতি

বৃহস্পতি গ্রহ

শুক্র

শুক্র গ্রহ‌

শনি

শনি গ্রহ

রবি

সূর্য


বঙ্গাব্দের ইতিহাস
বঙ্গদেশে কবে থেকে বর্ষ গণনা শুরু হয়েছিল, তার যথাযথ ইতিহাস জানা যায় না। কেউ কেউ বলে থাকেন, প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা
শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯৩-৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন ৷ সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন। কিন্তু মোগল আমল পর্যন্ত বঙ্গাব্দ নামক কোনো অব্দের সন্ধান পাওয়া যায় না। মূলত বঙ্গাব্দ হলো বঙ্গদেশের বর্ষগণনার একটি ধারাবাহিকতার একটি ফসল। কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারা বঙ্গাব্দ নামের অব্দ শুরু হয়েছিল, তা বলা যায় না। বিক্রামাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ ইত্যাদির মতো অত সহজে বলা যায় না অমুকে অমুক সময় বঙ্গাব্দ নামে একটি অব্দ চালু করেছিলেন।


বঙ্গাব্দ-সহ ভারতীয় সকল অব্দের শুরুটা হয়েছিল মূলত বৈদিক ঋষিদের দ্বারাই। আর্যরা যখন বঙ্গদেশে প্রবেশ করেছিল, তখন এই অঞ্চলের আদিবাসীরা বর্ষগণনা করতেন কি না তা জানা যায় না। সেকালের বৈদিক ঋষিরা ছিলেন সর্বভারতীয়। তাই সেকালের অর্জিত সকল জ্ঞানই ছিল, সকল ভারতবাসীর।


র্য ঋষিরা জ্যোতির্বিজ্ঞানর চর্চা করতেন জানার আগ্রহে। সে অধীত জ্ঞান আবার একই সাথে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড প্রতিপালনের জন্য ব্যবহার করতেন। এই সূত্রে আর্য ঋষিরা, খালি চোখে দেখা যায় এমন দূর আকাশের নক্ষত্রাদি, সূর্য, গ্রহাদি (খালি চোখে দেখা যায় এমন গ্রহগুলো), চন্দ্র ইত্যাদির গতিপথ এবং পৃথিবীর ঋতুচক্র ইত্যাদি মিলিয়ে পঞ্জিকার পত্তন ঘটিয়েছিলেন। প্রাচীনকালের ঋষিদের গবেষণালব্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান বহুভাবে বহুবার পরিবর্তিত ও সংশোধিত হয়েছে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে নানাবিধ পঞ্জিকার সৃষ্টি হয়েছিল এই সকল ঋষিদের অধীত জ্ঞান অনুসারে। প্রাচীন গ্রন্থাদিতে এসকল পঞ্জিকার নাম বা সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়া যায়।

 

বাংলা মাসের নামগুলো গৃহীত হয়েছে ভারতীয় জ্যোতির্বজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণের সূত্রে। প্রাচীন ভারতীয় বাহর্স্পত্য সংবৎ -এ বাংলা মাসের নামগুলো পাওয়া যায়। ভারতের একটি অন্যতম অব্দ 'বিক্রমাব্দ' শুরু হয়েছিল ৫৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। এই অব্দের মাসগুলো বাংলা মাসের নামের মতোই। এরপরে আমরা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো অব্দ পাই 'শকাব্দ'। এক সময় বাংলাদেশে এই অব্দ অনুসরণ করা হতো। ১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দের  পূর্বকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিক্রমাব্দ এবং শকাব্দ বিশেষ স্থান দখল করে ছিল।

বাংলার স্বাধীন শাসক হিসাবে সেন বংশীয় লক্ষ্মণ সেনের শাসনামলে একটি নতুন অব্দের প্রচলন শুরু হয়। এই অব্দটি লক্ষ্মণাব্দ নামেই পরিচিত। এক সময় এই অব্দটি বাংলা, বিহার ও মিথলাতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।  আবুল ফজল তাঁর আকবরনামা গ্রন্থে লিখেছেন 'বঙ্গে লছমন সেনের রাজ্য-প্রাপ্তির প্রারম্ভ থেকে সংবৎ গণনা করা হচ্ছে। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬৫ বৎসর হয়েছে'। এ থেকে বুঝা যায়, বঙ্গদেশে লক্ষ্মণাব্দ-এর একটি বিশেষ স্বীকৃতি ছিল।

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন
বখতিয়ার খলজি লক্ষ্মণসেন রাজ্য আক্রমণ করে দখল করে নেন। এরপর ধীরে ধীরে বঙ্গদেশে মুসলিম শাসকদের অধীনে চলে যায়। এই সূত্রে বঙ্গদেশে
হিজরি সন চালু হয়। বঙ্গদেশে ক্রমান্বয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মীয় কারণে হিজরি সন বিশেষ স্থান করে নেয়। তা ছাড়া সে সময়ে শাসকরা রাষ্ট্রীয় অব্দ হিসাবে হিজরি সনকে অনুসরণ করতো। এর ফলে মুসলিম শাসনামলে বঙ্গদেশে অন্ততঃ তিনটি অব্দ বিশেষভাবে অনুসরণ করা হতো। এই তিনটি অব্দ হলো

মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি সমন্বিত নতুন ধর্ম প্রচারের উদ্যোগ নেন। এই ধর্মের নাম দেওয়া হয়েছিল দীন-ই-ইলাহি বা তৌহিদ-ই-ইলাহি। এই ধর্মের আদর্শে তিনি মুদ্রা থেকে কালিমা তুলে দেন। মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে আরবি ভাষা তুলে দিয়ে ফারসি ভাষার প্রবর্তন করেন। একই সাথে তিনি আরব দেশীয় চান্দ্র মাসের পরিবর্তে পারস্যের সৌর বৎসরে প্রচলন করেন। প্রাথমিকভাবে এই বৎসর-গণন পদ্ধতির নাম দেন তারিখ-ই-ইলাহি বা সন ই ইলাহি। এই ইলাহি সনকে ভারতবর্ষের আদর্শে নতুন করে সাজানোর জন্য আকবর ৯৯২ হিজরি সনে, তাঁর রাজসভার রাজ জ্যোতিষী আমির ফতেউল্লাহ শিরাজীর উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। আকবর ৯৬৩ হিজরি সনের রবিউল আখির মাসের ২ তারিখে [১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ] সিংহাসনে আরোহণ করেন। হিজরি সনের মর্যাদা দেখিয়ে, ৯৬৩ সংখ্যাকে ইলাহি সনের প্রথম বৎসরের মর্যাদা দেন। এর পরবর্তী বৎসর থেকে সৌরবৎসর হিসাবে গণনা শুরু করেন। এই সূত্রে হিজরি চান্দ্র-মাস তুলে দিয়ে সৌরমাস গণনা শুরু করেন। আকবর এই নতুন বর্ষ-গণন পদ্ধতি প্রচলনের আদেশ জারি করেন ৯৯২ সালের ৮ই রবিউল তারিখ। খ্রিষ্টাব্দের বিচারে এই তারিখ ছিল ১০ মার্চ ১৫৮৫। যদিও আকবর-এর সিংহাসন আরোহণের দিন থেকে ইলাহি বর্ষের শুরু হওয়ার আদেশ জারি হয়েছিল, কিন্তু কার্যত দেখা গেল, পারস্যের পঞ্জিকা অনুসারে বৎসর শেষ হতে ২৫ দিন বাকি রয়ে যায়। তাই ইলাহি সন চালু হলো– আকবরের সিংহাসন আরোহণের ২৫ দিন পর। এই নির্দেশানুসরে বিষয়টি কার্যকরী হয়– ২৮ রবিউল আখের ৯৬৩ হিজরী, ১১ মার্চ, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ।

ইলাহি সনের প্রথম দিনটিকে প্রাচীন পারস্যের রীতি অনুসারে নওরোজ (নতুন দিন) হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। এছাড়া ইলাহি সনের মাসগুলোর নাম গ্রহণ করা হয়েছিল প্রাচীন পারস্যের পঞ্জিকায় প্রাপ্ত নামগুলো থেকে। পারস্যের এই মাসগুলোর নাম ছিল- ফারওয়ারদীন (فروردین), আর্দিবিহশ্‌ত (اردیبهشت), খুরদাদ (خرداد), তীর (تیر), মুরদাদ (مرداد), শাহরীয়ার (شهریور), মেহ্‌র (مهر), আবান (آبان), আজার (آذر), দে (دی), বাহমান (بهمن) এবং ইসপন্দর (اسفند)।  এই নামগুলো বঙ্গাব্দ কেন কোনো ভারতীয় সংবৎ-এর সাথে যুক্ত হয় নি।

 

সম্রাট আকবর পারস্যের সৌরবৎসরের অনুকরণে যে ইলাহি সন প্রবর্তন করেছিলেন, তা ছিল সর্বভারতীয় রাষ্ট্রীয় সন। কিন্তু এই সন ধরে একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজস্ব আদায় করাটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ রাজস্ব আদায়ের জন্য, সম্রাটকে কৃষকের ফসল ঘরে উঠার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। ভারতবর্ষের মতো বিশাল দেশে একই সময় সকল স্থানের কৃষকরা ফসল কাটতো না। সেই কারণে ফসল কাটার সময়কে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথক পৃথক সনের প্রচলন করা হয়েছিল। এই বিচারে ফসলি সন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ফসল-নির্ভর আঞ্চলিক বর্ষ গণন পদ্ধতি। এই কারণে তৎকালীন বঙ্গদেশে ফসলি সনের শুরু হতে অগ্রহায়ণ মাস থেকে। পক্ষান্তরে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে ফসলি সন শুরু হতো আষাঢ় মাস থেকে। তবে এই সকল ফসলি সনগুলো ছিল সৌর-বৎসর ভিত্তিক ইলাহি সন।

 

১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে আকবর বঙ্গদেশ জয় করার জন্য টোডরমল নামক সেনাপতির অধীনে সেনা অভিযান শুরু করেন। এই যুদ্ধে বঙ্গদেশ কাগজে কলমে মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারেও এলেও কার্যত তা বঙ্গদেশ অনেকাংশেই স্বাধীনই থেকে যায়। তাই আকবরের প্রণীত ফসলি সনও এই সময়ের ভিতরে বঙ্গদেশে কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে নি। যতটুকু তাঁর প্রবর্তিত ফসলি সন চালু চেয়েছিল, তা বাংলাদেশে স্থায়ী রূপ লাভ করে নি। বাংলার মানুষ অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখকে বৎসরে প্রথম মাস হিসেবেই মেনে নিয়েছিল।

 

বাংলাদেশের
ঋতুচক্র

বঙ্গদেশের লক্ষ্মণাব্দ ছিল চান্দ্র ও সৌর বৎসরের একটি সংমিশ্রণের ধারায়। কারণ বঙ্গদেশের ঋতুচক্রের সাথে সমন্বয় করা জন্য মল মাসের চল ছিল বেশ আগে থেকেই। ফসলি সন সৌর-বৎসর হ্‌ওয়ায় মলমাসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ফসলি সনের বিষয়টি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও বঙ্গদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ততটা আদৃত হয়ে উঠে নি। বঙ্গবাসী ফসলি সনের অনুসরণে সৌরবৎসরে অভ্যস্থ হয়ে উঠলেও অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখকে বৎসরের প্রথম মাস হিসাবে অণুসরণ করতো। এবং এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঋতুগুলোকে সাজিয়ে নিয়েছিল। বঙ্গাব্দের মাসগুলো একই সাথে বৎসরে অংশ এবং ঋতুর একটি একক। ঋতুচক্রের এই বিভাজনে যে ছয়টি নাম পাওয়া যায়, সেগুলো মাসের নামগুলোর মতই ভারতবর্ষের এবং বঙ্গদেশের আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন
 

   বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ   : গ্রীষ্মকাল
  আষাঢ় ও শ্রাবণ   : বর্ষাকাল
  ভাদ্র ও আশ্বিন   : শরৎকাল
  কার্তিক ও অগ্রহায়ণ   : হেমন্তকাল
  পৌষ ও মা    : শীতকাল
  ফাল্গুন ও চৈত্র    : বসন্তকাল


বঙ্গাব্দ নামটি শুনলেই মনে হয়, বঙ্গদেশের নিজস্ব অব্দ। কিন্তু এই নামটি কিভাবে প্রচারিত হলো, তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। সম্ভবত এই নাম জনসাধরণের দেওয়া। ফসলি সন খাজনা আদায়ের মাস ছিল বটে, কিন্তু অগ্রহায়ণ মাসকে বৎসরের শুরু এটা বঙ্গবাসী গ্রহণ করেন নাই। ফলে ঋতুগুলোকে শনাক্ত করা, হিন্দু ধর্মীয় পালাপার্বন, লৌকিক আচারাদি প্রচলিত বাংলা মাস ধরেই হতো। এছাড়া হালখাতা, চৈত্র সংক্রান্তির আচারাদি এবং তৎসম্পর্কিত বাৎসরিক মেলা ইত্যাদির বিচারে বৈশাখ নববর্ষের প্রথম মাস হিসাবেই মান্য করা হতো। সাধারণ মানুষ ফসলি সন, হিজরি সন, লক্ষণাব্দ ইত্যাদি থেকে পৃথকভাবে নতুন অব্দকে অনুসরণ করা শুরু করেছিল। এবং এই সব অব্দ থেকে স্বতন্ত্র অব্দ হিসাবে এ্‌ই লৌকিক অব্দকে বঙ্গাব্দ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

 

বঙ্গদেশে বঙ্গাব্দ সৌর-বৎসর হিসাবে গৃহীত হয়েছিল, কিন্তু এর মাসগুলো সনাতন সূর্যসিদ্ধান্ত অনুসারেই গণনা করা হতো। ফলে কোন মাস কতদিনে হবে, তা নিয়ে প্রতি বৎসরই ভাবতে হতো। অবশ্য এক্ষেত্রে সমাধান দিত জ্যোতিষীদের গণনা করা পঞ্জিকা। এই অসুবিধা দূর করার জন্য ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তৎকালীন বাংলা একাডেমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমী দায়িত্ব দিয়েছিল ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে। এই সূত্রে তিনি ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যাগত পঞ্জিকা'র অনুসরণে তিনি যে সৌরপঞ্জিকার প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবটি ছিল

 

  ১. 'বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ মাস হইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩১ দিন এবং আশ্বিন মাস হইতে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতিমাস ৩০ দিন হিসাবে গণনা করা হইবে'।
  ২. ''অতিবর্ষে (লিপ ইয়ারে) চৈত্র মাস ৩১ দিন হইবে। ৪ দিয়া যে সাল বিভাজ্য তাহাই অতিবর্ষ বলিয়া পরিগণিত হইবে।
  ৩. 'মুঘল আমলে বাদশাহ আকবরের সময় যে বঙ্গাব্দ প্রচলিত করা হইয়াছিল তাহা হইতেই বছর গণনা করিতে হইবে এবং সেই হিসাবে আগামী ১লাং বৈশাখ হইবে ১৩৭৩ সাল'।


১৩৭৩ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ৫ বৎসর বাংলা একাডেমী এই পঞ্জিকা প্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার পর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে (১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) দেয়াল পঞ্জিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এই পঞ্জিকা প্রকাশে কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকায় এই পঞ্জিকা প্রকাশের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসের এক সরকারি নির্দেশবলে শহীদুল্লাহ নির্দেশিত বাংলা সন কার্যকরী হয়। কিন্তু বিভিন্ন মহলে শহীদুল্লাহ-নির্দেশিত এই পঞ্জিকার পক্ষে বিপক্ষে নানাবিধ মতামত উঠতে থাকে। এই সূত্রে মুহম্মদ তকীউল্লাহ, জিএম আনিসুর রহমান, ড. মসিউর রহমান এবং জামিল চৌধুরী বাংলা একাডেমীর প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করেন। পরে এই কমিটি সকল বিষয় পর্যালোচনা করে যে প্রস্তাব রাখেন, তা হলো
 

  ১. সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জীর বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাস ৩০ দিন হিসাবে গণনা করা হবে।
  ২. গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর অধিবর্ষে. বাংলা সনের ফাল্গুন মাসের সাথে ১ দিন যুক্ত হবে এবং বাংলা বৎসরের অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে। ফলে অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস হবে ৩১ দিনে।


১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে নতুন নিয়মে একটি নতুন বাংলা পঞ্জিকা প্রকাশ করা হয়। এই পঞ্জিকার বঙ্গাব্দ ধরা হয়, ১৪০২ এবং এই বৎসর অধিবর্ষ থাকায় ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে নির্দেশিত করা হয়।
 

মূল বঙ্গাব্দ গণনা করা হতো সূর্য সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে। এই গণনা শুরু হয়, সাধারণত মধ্য এপ্রিলে । বাংলাদেশের বাইরে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরায় এই বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনকেই নতুন বর্ষের শুরু হিসেবে উদযাপন করা হয়। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলগুলোর ভিতরে একমাত্র বাংলাদেশে  সংশোধিত বঙ্গাব্দ অনুসরণ করা হয়। নিচে সংশোধিত পঞ্জিকা অনুসারে বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তালিকা দেওয়া হলো।
 

মাসের নাম দিন সংখ্যা নক্ষত্রের নাম
বৈশাখ ৩১ বিশাখা
জ্যৈষ্ঠ ৩১ জ্যেষ্ঠা
আষাঢ় ৩১ উত্তরাষাঢ়া
শ্রাবণ ৩১ শ্রবণা
ভাদ্র ৩১ পূর্বভাদ্রপদ
আশ্বিন ৩০ অশ্বিনী
কার্তিক ৩০ কৃত্তিকা
অগ্রহায়ণ ৩০ মৃগশিরা
পৌষ ৩০ পুষ্যা
মাঘ ৩০ মঘা
ফাল্গুন ৩০* উত্তরফাল্গুনী
চৈত্র ৩০ চিত্রা

*ফাল্গুন মাস অধিবর্ষে ৩১ দিন হবে।



সূত্র :