বিষয়:
রবীন্দ্রসঙ্গীত।
গান সংখ্যা:
শিরোনাম:
তুমি
কেমন করে গান করো হে গুণী
পাঠ ও পাঠভেদ:
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
আমি অবাক্ হয়ে শুনি কেবল শুনি॥
সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী॥
মনে করি অমনি সুরে গাই,
কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে—
হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে,
আমায় তুমি ফেলেছ কোন্ ফাঁদে
চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি॥
পাণ্ডুলিপির
পাঠ:
[RBVBMS 478] [নমুনা]
পাঠভেদ:
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী,
: গীতবিতান
(বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
তুমি কেমন কর গান করো যে গুণী:
: সঙ্গীত-গীতাঞ্জলি
(১৯২৭)
তুমি কেমন করে গান করো যে গুণী,
: পাণ্ডুলিপি (MS. 478
,
পৃষ্ঠা ২।
নমুনা)
কেমন করে গান করো, হে
গুণী :
গীতবিতান প্রথম খণ্ড
(বিশ্বভারতী,
১৩৪৮)
মনে করি অমনি সুরে গাই,
: গীতবিতান
(বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
[নমুনা:
২]
মনে করি অম্নি সুরে গাই,
: পাণ্ডুলিপি (MS. 478
,
পৃষ্ঠা ২।
নমুনা)
কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে
: গীতবিতান
(বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
কইতে কি চাই, কইতে কথা বাধ
: পাণ্ডুলিপি (MS. 478
,
পৃষ্ঠা ২।
নমুনা)
হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে
: গীতবিতান
(বিশ্বভারতী,
কার্তিক ১৪১২)
হার মেনে যে পরাণ আমার কাঁদে
: পাণ্ডুলিপি (MS. 478
,
পৃষ্ঠা ২।
নমুনা)
ভাবসন্ধান:
সৃষ্টির চার ধারে নিরন্তর গীত-ধ্বনি শুনতে পান কবি। বিস্মিত এবং
নির্বাক হয়ে সে-অপরূপ সঙ্গীত শুনতে থাকেন তিনি। আলোতে-বাতাসে-পাষাণভেদী
নির্ঝরিণীতে সে ব্যাকুল সুর অবাধ গতিতে বয়ে চলেছে। সে-সুরে সুর মিলিয়ে গান
গাইবার বাসনা কবির। কিন্তু কণ্ঠ পেরে ওঠে না, সুর হারিয়ে যায়। মনের কথা
মনেই থাকে, বাক্যহারা কবির হূদয় ভরে ওঠে রোদনে। নৈসর্গিক সুরের জাল চারদিক
থেকে ঘিরে ধরেছে কবিকে। তাঁকে ঘিরে ঘিরে সুরের জাল বোনা চলছে অবিরাম। মুগ্ধ
কবি ধরা পড়েছেন সেই ইন্দ্রজালে।
তথ্যানুসন্ধান
ক. রচনাকাল ও স্থান:
পাণ্ডুলিপি
RBVBMS 478
-এর দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লিখিত
গানটির সঙ্গে রচনার তারিখ উল্লেখ
আছে '১০ ভাদ্র, রাত্রি'।
গীতাঞ্জলি
-তে তারিখ ও স্থান উল্লেখ আছে 'রাত্রি
১০ ভাদ্র,
১৩১৬'।
[সূত্র:
গীতাঞ্জলি
রবীন্দ্ররচনাবলী
একাদশ খণ্ড (বিশ্বভারতী
আশ্বিন ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ),
পৃষ্ঠা ২১।]
উল্লেখ্য,
রবীন্দ্রনাথ
১৩১৬ বঙ্গাব্দের
৮ ভাদ্রে কলকাতা থেকে
শান্তিনিকেতনে আসেন এবং ১৯শে ভাদ্র পর্যন্ত এখানেই কাটান। ১০ই ভাদ্রে তিনি এই
গান-সহ দুটি গান রচনা করেন। উল্লেখ্য, অপর গানটি ছিল
'জানি
জানি কোন অনাদিকাল হতে [তথ্য]।
এই সময়
রবীন্দ্রনাথের
বয়স ছিল ৪৮ বৎসর ৪ মাস।
[দেখুন:
৪৮
বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিকা]
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই গানটির রচনাকাল সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যায় অধ্যাপক সুখরঞ্জন রায়ের স্মৃতিকথায়। উল্লেখ্য, ১২ আশ্বিন ১৩১৬ [২৮ সেপ্টেম্বর] তারিখে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত সঙ্গীতশিল্পী এনায়েৎ খানের বক্তৃতা সভায়- রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেন। প্রখ্যাত সমালোচক অধ্যাপক সুখরঞ্জন রায় এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। এই স্মৃতিকথা প্রশান্তকুমার পালের রবিজীবনী ষষ্ঠ খণ্ডে [আনন্দ পাবলিশার্স ফাল্গুন ১৪১৪। পৃষ্ঠা ১০৪] পাওয়া যায়। নিচে উল্লিখিত গ্রন্থ থেকে স্মৃতিকথার প্রাসঙ্গিক অংশ যুক্ত করা হলেও।
সভাপতির বক্তৃতার পর বেদীর উপর যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলে কবিকে ধরে বসলেন গান গাইবার জন্য। কবি আপত্তি জানালেন। সকলে জিদ করতে লাগলেন। কবির আপত্তি প্রবল থেকে প্রবলতর হতে লাগলো, তিনি বললেন,― শরীর ক্লান্ত, পূর্বের স্বরও আর নেই, তাছাড়া এই ওস্তাদের কাছে মুখ খুলতে আমি কিছুতেই রাজী নই। যাঁরা জিদ করছিলেন তাঁদের মধ্যে গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়ই ছিলেন প্রধান।...শেষে গুরুদাস বলে ফেললেন― (বেদীর খু্ব নিকটেই বসেছিলুম ব'লে স্পষ্ট শুনলুম)― 'আপনার ভালো গাইতে পারেন ব'লে অহংকার আছে, সেই অহংকারে পাছে কোনদিক দিয়ে ঘা লাগে তাই গাইতে চাচ্ছেন না'। তখন রবীন্দ্রনাথ আর না গেয়ে পারলেন না। প্রথম হারমোনিয়াম নিয়ে চেষ্টা করে পরে শুধু গলাতেই গাইলেন সেই বিখ্যাত গান ― 'কেমন ক'রে গান করো যে গুণী,আমি অবাক হয়ে শুনি।' .....সেটি ছিল তখনো অ-পূর্ব প্রকাশিত। কাজেই স্থান কাল পাত্র বিবেচনায় গানের অর্থ মিলিয়ে সকলে ধরে নিলেন গুণী এনায়েত খাঁকে উদ্দেশ করেই সেই গান তখনি মুখে মুখে রচিত হয়েছিল। সমস্ত হল-ভর্তি শ্রোতৃমণ্ডলীর ওপর আশ্চর্য মায়াজাল বিস্তার করেছিল কবির কণ্ঠ এমন অপরূপ সময়োচিত ভাবে বিকশিত হয়ে।"
এই তথ্যটি যে যথার্থ নয়, তা বুঝা যায়, গানটি রচনার তারিখ দেখে। পাণ্ডুলিপি অনুসারে গানটির রচনাকাল ১০ ভাদ্র। আর এর প্রায় একমাস পরে, রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত আসরে গানটি গেয়েছিলেন।
পত্রিকা
দেবালয়
পত্রিকা,
শিরোনাম 'গুণী' (ষষ্ঠ
সংখ্যা, আশ্বিন ১৩১৬ বঙ্গাব্দ)। পৃষ্ঠা: ১৩৩। [নমুনা]
রবীন্দ্রনাথ-কৃত অনুবাদ ইংরেজি গীতাঞ্জলির পাঠ:
I know not how thou singest, my master! I ever listen in silent amazement.
The light of thy music illumines the world. The life breath of thy music runs from sky to sky. The holy stream of thy music breaks through all stony obstacles and rushes on.
My heart longs to join in thy song, but vainly struggles for a voice. I would speak, but speech breaks not into song, and I cry out baffled. Ah, thou hast made my heart captive in the endless meshes of thy music, my master!সূত্র:
- Gitanjali, Rabindranath Tagore, Visva-Bharati and UBSPD, Thirteenth Reprint 2008, Page 7.
- নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতাঞ্জলি −রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সম্পাদনা : আবদার রশীদ। বাংলা একাডেমী ঢাকা। (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সংস্করণ) পৃষ্ঠা ৬১।
গ. সঙ্গীত বিষয়ক তথ্যাবলী:
স্বরলিপিকার: ভীমরাও শাস্ত্রী-কৃত স্বরলিপিটি সঙ্গীত-গীতাঞ্জলি তে প্রকাশিত হয়েছিল। এ. এ. বাকে,-কৃত স্বরলিপিটি বর্তমানে অপ্রচলিত।
রাগ ও তাল:
রাগ-মিশ্র
খাম্বাজ।
তাল
:
কাহারবা
(৪।৪
মাত্রা)।
[স্বরবিতান অষ্টাত্রিংশ
(৩৮, বৈশাখ ১৪১৫)। পৃষ্ঠা: ৭২।]
[স্বরলিপি]
সঙ্গীত-গীতাঞ্জলি (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ)-তে ভীমরাও শাস্ত্রী-কৃত স্বরলিপি'র সাথে এই গানের রাগ সম্পর্কে উল্লেখ আছে— রাগ মিশ্র খম্মাচ [খাম্বাজ]। তাল চতস্রজাতি ত্রিপুট মধ্যলয়। স্বরলিপিতে মন্দ্র পঞ্চমকে (প্) ষড়্জ (স) গণ্য করা হইয়াছে।
রাগ:
খাম্বাজ।
তাল: কাহারবা
[রবীন্দ্রসংগীত : রাগ-সুর নির্দেশিকা । সুধীর চন্দ। প্যাপিরাস,
ডিসেম্বর ২০০৬ । পৃষ্ঠা: ৫৫]।
[খাম্বাজ
রাগে নিবদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিকা]
রাগ- খাম্বাজ, তাল-ত্রিতাল। [রাগরাগিণীর এলাকায় রবীন্দ্রসংগীত, প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী, জুলাই ২০০১], পৃষ্ঠা: ৯৭।
বিষয়াঙ্গ: ভক্তিগীতি
সুরাঙ্গ: রবীন্দ্রনাথের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
গ্রহস্বর: ধা।
লয়: ঈষৎ দ্রুত।