রবীন্দ্রসঙ্গীত
গান সংখ্যা: ১
                গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে,
                    তারকামণ্ডল চমকে মোতি রে ॥
                 ধূপ মলয়ানিল, পবন চামর করে,
                    সকল বনরাজি ফুলন্ত জ্যোতি রে॥
                 কেমন আরতি, হে ভবখণ্ডন, তব আরতি–
                    অনাহত শব্দ বাজন্ত ভেরী রে॥
গানটি গীতবিতানের অখণ্ড সংস্করণ, তৃতীয় সংস্করণ ( বিশ্বভারতী, পৌষ ১৩৮০ বঙ্গাব্দ)-এ 'পূজা ও প্রার্থনা' পর্যায়ের প্রথম গান হিসেবে পাওয়া যায়।

এই ভজনটি গুরুমুখী বর্ণ থেকে প্রথম বাংলা বর্ণে প্রকাশিত হয়েছিল- ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের বাংলা পাক্ষিক মুখপত্র ধর্মতত্ত্ব পত্রিকার ১ ভাদ্র ১৭৯৪ শক [১২৯৭ বঙ্গাব্দ, ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ] সংখ্যার [৫।১৪] ৭৩৮ পৃষ্ঠায়। এরপর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার 'ফাল্গুন -১২৯৪ শক' সংখ্যার ১৯১-৯২ পৃষ্ঠায়- 'সংবাদ' শিরোনামে, ২৪ ভাদ্র তারিখে লাহোর সৎসভার 'দ্বিতীয় সাংবৎসরিক' প্রসঙ্গে গদ্যানুবাদ-সহ এই গানটি মুদ্রিত হয়েছিল।

এই অনুবাদটি প্রকাশের কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের  সাথে বোলপুর যান এবং সেখান থেকে পরে অমৃতসরে আসেন। ধারণা করা হয়, দেবেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ অমৃতসরে পৌঁছান ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে [ফাল্গুন-চৈত্র ১২৭৯ বঙ্গাব্দে]। সেখানে রবীন্দ্রনাথ পিতার সাথে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে যেতেন এবং শিখদের ভজন শুনতেন। এছাড়া গুরুদরবারের একজন গায়ক মাঝে মাঝে দেবেন্দ্রনাথের বাসস্থানে এসে গান শুনাতেন। সম্ভবত স্বর্ণমন্দিরে বা শিখ ভজন-গায়কের কাছ থেকে, রবীন্দ্রনাথের এই ভজনটি-সহ অন্যান্য গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১১ বৎসর ১০-১১ মাস বয়স।

এই বয়সেই তিনি এই ভজনটির চমৎকার পদ্যানুবাদ করেন। এই পদ্যানুবাদে সুরারোপের ভিতর দিয়ে- রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচী গ্রন্থে [বৈশাখ ১৩৯৯ মুদ্রণ] গানটির রচনাকাল হিসাবে উল্লেখ করেছন- 'বয়স ১৩। ১২৮১। ১৮৭৫'। কিন্তু এই গ্রন্থের ডিসেম্বর ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের মুদ্রণে লিখা হয়েছে- 'বয়স ।১১। ১২৭৯। ১৮৭৩'। আবার প্রশান্তকুমার পাল তাঁর রবিজীবনী প্রথম খণ্ডে লিখেছেন -
"তবে আমাদের মত গ্রাহ্য হলে সেখানে বয়স ও সালটি সংশোধনের প্রয়োজন হবে, লিখতে হবে- 'বয়স ১১। ১২৭৯। ১৮৭৩।' প্রকৃতপক্ষে গানটি রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছিলেন ১১ বৎসর বয়সে। কিন্তু প্রকাশকাল এবং পঞ্চচত্বারিংশ সংবাৎসরিক মাঘোৎসবের সূত্রে আমরা এই গানটিকে ১২৮১ বঙ্গাব্দের উল্লেখ পাই। আবার স্বরবিতান ৬৪'র রচনাকাল/প্রকাশকাল পত্রে দেখতে পাই রচনাকাল- ১১ মাঘ ১২৮১। গানটির সুর সংযোজনের সময়কে ১২৮১ বঙ্গাব্দ ধরা হলে, বলা যায় গানটির সুরারোপের সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১৩ বৎসর।
এই গানটি কোনো গ্রন্থভুক্তির আগে, প্রথম পরিবেশিত হয়েছিল ব্রাহ্মসমাজের পঞ্চচত্বারিংশ সাংবাৎসরিক মাঘোৎসবের (১১ মাঘ ১২৮১ বঙ্গাব্দ) সায়ংকালীন উপাসনায়। পরে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার ফাল্গুন ১২৮১ সংখ্যার ২০৯ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছিল। [নমুনা]
এই সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১৩ বৎসর ১০ মাস।

এরপর ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি দ্বিতীয় ভাগ-এ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৩১২ বঙ্গাব্দের ১১ মাঘ। এই সময় গানটির সাথে রাগ তালের উল্লেখ ছিল- ' 'জয়জয়ন্তী ঝাঁপতাল''। উল্লেখ্য, এই সময় গানটির রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

মূল ভজনটির বেশ কয়েকটি পাঠ পাওয়া যায়। স্বরবিতান ৬৪ (আশ্বিন ১৪১৩) -এর ৪১ পৃষ্ঠায় মূল গানের স্বরলিপিসহ একটি পাঠ রয়েছে। স্বরবিতানে এই গান এবং স্বরলিপি সম্পর্কে জানা যায়- গানটির মূল পাঠ সংগ্রহ করেছিলেন ইন্দিরাদেবী চৌধুরাণী এবং স্বরলিপি করেছিলেন সরলা দেবী। এই স্বরলিপিটি ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত চতুর্থভাগে স্বরলিপিটি মুদ্রিত হয়েছিল। [নমুনা]

১৩০৭ বঙ্গাব্দে সরলা দেবীর এই স্বরলিপি গৃহীত হয়েছিল, তাঁর 'শতগান' গ্রন্থে। স্বরবিতান ৬৪-তে মুদ্রিতপাঠটি হলো-

                                               জয়জয়ন্তী ঝাঁপতাল
                                       গগনোমে থাল, রবি চন্দ্র দীপক বনি,
                                       তারকা-মণ্ডল জনক মোতি রে।
                                       ধূপ মলয়ানিল পবন চঙর করে,
                                       সগল বনরাজি ফুলন্ত জ্যোতি রে॥
                                       ক্যায়সি আরতি হুয়ি হো ভবখণ্ডন তেরী আরতি,
                                       অনাহত শবদ বাজন্ত ভেরী রে ॥

কিন্তু সরলাদেবীকৃত শতগানের সুবর্ণসংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৪১৮। এই গ্রন্থের ২৫৯-২৬০ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত এই গানটির সাথে রাগের নামের পরিবর্তে আছে শিখ্‌ভজন। এছাড়া গানের পাঠ্যাংশে কিছু হেরফের লক্ষ্য করা যায়। এই গ্রন্থে মুদ্রিত পাঠটি নিচে দেওয়া হলো।
                                            শিখ্‌ভজন-ঝাঁপতাল
                                       গগনোমে থাল, রবিচন্দ্র দীপক বনি,
                                       তারকামণ্ডল জনক মোতি রে!
                                       ধূপ মলয়ানিল পবন চঙর করে,
                                       সগল বনরাজি ফুলন্ত জ্যোতিরে!
                                       ক্যায়সি আরতি হরি হো ভবখণ্ডম
                                                      তেরি আরতি!
                                       অনাহত শবদ বাজন্ত ভেরীরে!                                        গগন মৈ থালু, রবি চন্দু দীপক বনে,
                                       তারিকামণ্ডল জনক মোতী ॥

                                       ধূপু মলআনলো, পৱণু চৱরো করে,
                                       সগল বনরাই ফুলন্ত জ্যোতী॥
                                       কৈসী তেরী আরতী।                                      
                                       অনাহত সবদ বাজন্ত
ভেরী ॥
                                                            -নানক : গুরুগ্রন্থসাহেব


এই গানটির রচয়িতা নিয়ে প্রথম সংশয় উপস্থিত হয়- আদি ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি-র দ্বিতীয় ভাগের সূত্রে। এই গ্রন্থে গানটির রচয়িতা হিসাবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম উল্লেখ ছিল। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত গ্রন্থের সূচীপত্রেও এই গানটির রচয়িতা হিসাবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় শনিবারের চিঠি পত্রিকার মাঘ ১৩৪৬ সংখ্যায় [পৃষ্ঠা ৫৯০] লিখিত হয়েছে-

 "আদি ব্রাহ্মসমাজ হইতে প্রকাশিত 'ব্রহ্মসঙ্গীত-স্বরলিপি (দ্বিতীয় ভাগ) পুস্তকে ইহা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নামে বাহির হইয়াছে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন এটি তাঁহার রচনা।'

ইন্দিরাদেবী চৌধুরানী'র রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম নামক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় 'বিশ্বভারতী পত্রিকা'র ৮ম বর্ষ ৩য় সংখ্যায় [মাঘ-চৈত্র ১৩৫৬]। এই প্রবন্ধে ইন্দিরা দেবী লিখেছেন-

'এই শিখ-ভজনেরই আর-একটি বহুকাল আগে আমাদের কাছে এসেছিল, কী সূত্রে তা জনি নে; এবং আশ্চর্যের বিষয়, সেটিও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একেবারে অক্ষরে-অক্ষরে অনুবাদ করেছেন।.... কেউ কেউ ভুল করে ভাবেন এটি রবীন্দ্রনাথের।' ইন্দিরাদেবীর এই প্রবন্ধটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৩৬১ বঙ্গাব্দে। এই সময় এই মন্তব্য বর্জিত হয় এবং পাদটীকায় লিখিত হয়- ' কে রচয়িতা, এ বিষয়ে বিতর্ক আছে'। উল্লেখ্য, এই গানটিসহ গীতবিতান তৃতীয় খণ্ড যখন প্রকাশিত হয় এবং তখন এই গ্রন্থের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন ইন্দিরাদেবী।
আদি ব্রাহ্মসমাজের পঞ্চচত্বারিংশ (৪৫) সাংবৎসরিক মাঘোৎসব (মঙ্গলবার, ১১মাঘ ১২৮১ বঙ্গাব্দ, ২৫ জানুয়ারি ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবের সন্ধ্যাবেলার উপাসনায় এই গানটি প্রথম অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়েছিল। এরপর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার ফাল্গুন ১২৮১ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় গানটি প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি দ্বিতীয় ভাগ-এ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ১৩১২ বঙ্গাব্দের ১১ মাঘ। এই সময় গানটির সাথে রাগ তালের উল্লেখ ছিল- 'জয়জয়ন্তী-ঝাঁপতাল'। উল্লেখ্য, এই সময় গানটির রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর । এরপর ১৩৮০ বঙ্গাব্দ প্রকাশিত প্রথম অখণ্ড গীতবিতানের তৃতীয় সংস্করণে গানটি  'পূজা ও প্রার্থনা' পর্যায়ের প্রথম গান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

স্বরলিপি-সহ ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি চতুর্থ ভাগ চতুর্থ খণ্ড, পুনর্মুদ্রণ ১১ মাঘ ১৪০৭) গানটি পুনর্মুদ্রিত হয়। এবার স্বরলিপি করেছিলেন কাঙ্গালীচরণ সেন। বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত স্বরবিতান নামক ক্রমিক পুস্তকমালায় এই গানটি ৬৪ খণ্ডের ৬ সংখ্যক গান হিসেবে স্বরলিপি-সহ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৪১০ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে। [পৃষ্ঠা: ২০-২১]। গানটির শিরোদেশে রাগতালের নাম পাওয়া যায় 'জয়জয়ন্তী ঝাঁপতাল'।

মূল গানের অনুসরণের অনূদিত গানের সুরটি করা হয়েছিল 'জয়জয়ন্তী রাগে।  তাল ব্যবহার করা হয়েছিল '। ঝাঁপতাল''। তবে এই গানের সুর রবীন্দ্র দিয়েছিলেন কিনা তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। এর গ্রহস্বর গান্ধার। তালের প্রথম মাত্রা থেকে গানটি শুরু হয়। সুরের চলনের বিচারে গানটি ধ্রুপদাঙ্গের, আর বিষয়াঙ্গের বিচারে ভক্তিগীতি।