স্টার থিয়েটার
খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি নাট্যমঞ্চ

১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ এই মঞ্চটি তৈরি হয়েছিল কলকাতার ৬৮ নম্বর বিটন স্ট্রিটে। এই মঞ্চটি তৈরির পিছনে ছিল-  গিরিশচন্দ্র ঘোষের নতুন নাট্যমঞ্চ ও নাট্যদলের আকাঙ্ক্ষা এবং বিনোদিনী-কে রক্ষিতা হিসেবে পাওয়ার জন্য গুর্মুখ রায় মুসাদ্দির কামনা।

১৮৮৩ ফেব্রুয়ারিতে ন্যাশনাল থিয়েটারে রাবণবধ নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর, গিরিশচন্দ্র ঘোষ সদলবলে বেরিয়ে এসেছিলেন। এই দলে অন্যান্য যাঁরা ছিলেন তাঁরা হলেন- অমৃত মিত্র, অঘোরনাথ পাঠক, উপেন্দ্র মিত্র, বিনোদিনী, কাদম্বিনী, ক্ষেত্রমণি, নীলমাধব চক্রবর্তী প্রমুখ। গিরিশচন্দ্র এঁদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন 'ক্যালকাটা স্টার কোম্পানী'  নামে একটি দল। ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দের এঁরা ২৮ ও ৩১ মার্চ এবং ১৭ এপ্রিল বেঙ্গল থিয়েটার মঞ্চ ভাড়া নিয়ে তাঁদের নিজস্ব নাট্ক মঞ্চস্থ করেছিলেন। এঁরা তখন নিয়মিত নাট্যচর্চা করার জন্য একটি স্থায়ী মঞ্চের সন্ধানে ছিলেন। এই দলের বিনোদিনী ন্যাশনাল থিয়েটারে থাকাকালে অভিনয়ে, নাচে, গানে এবং রূপে কলকাতার নাট্য-অঙ্গনকে মোহিত করে রেখেছিলেন। এই সময় রাজস্থানের গুর্মুখ রায় মুসাদ্দি (পিতা ছিলেন গণেশদাস মুসাদ্দি) বিনোদিনী-কে রক্ষিতা হিসেবে পাওয়ার কামনায় অধীর হয়ে উঠেছিলেন। এই কামনা থেকে গুর্মুখ রায় গিরিশচন্দ্রের কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে আসেন। প্রস্তাবটি হলো- যদি বিনোদিনী তাঁর রক্ষিতা হতে রাজি থাকেন, তাহলে গিরিশচন্দ্র ঘোষের দলের জন্য একটি স্থায়ী নাট্যমঞ্চ তৈরি করে দেবেন। প্রথমে গুর্মুখ রায়ের প্রস্তাবে বিনোদিনী প্রথমে রাজি হন নি। কারণ তখন তিনি অন্য বাবুর কাছে বাঁধা ছিলেন। এ নিয়ে আগের বাবুর সাথে গুর্মুখ রায়ের বিবাদের বিষয় জানা যায় বিনোদিনীর 'আমার কথা' গ্রন্থ থেকে। গিরিশচন্দ্র অনুরোধে এবং মঞ্চের নেশায় তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন। তাছাড়া সবাই কথা দিয়েছিলেন যে, বিনোদিনীর নামানুসারে এই নাট্যশালার নাম হবে 'বি-থিয়েটার'।

এরপর কলকাতার ৬৮ নম্বর বিটন স্ট্রিটে গুর্মুখ রায় (গুর্মুখ রায় মুসদ্দি) একটি খালি জায়গা ইজারা নিয়ে এই মঞ্চটি তৈরি করেছিলেন। কাঠ-টিনের পরিবর্তে বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ইট দিয়ে। বিনোদিনীকে ছিলেন নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়ে। সে কারণ, নির্মাতার মনে করেছিলেন যে,  নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়ের নামে মঞ্চ তৈরি হলে, সেখানে দর্শকরা আসবেন না। তাছাড়া  গিরিশচন্দ্র তাঁর 'ক্যালকাটা স্টার কোম্পানী' নামকে পরিবর্তন করে স্টার থিয়েটার করার ক্ষেত্রে আগেই মনস্থির করে রেখেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রেজিস্ট্রি করার সময় এর নাম পাল্টে রাখা হয়েছিল- স্টার থিয়েটার। এই থিয়েটারের মালিক ছিলেন গুর্মুখ রায়, কিন্তু কার্যত এর সর্বেসর্বা ছিলেন গিরিশচন্দ্র

১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুলাই এই স্টার থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথম নাটক ছিল- গিরিশচন্দ্রের রচিত দক্ষযজ্ঞ। এই নাটকে যাঁরা অভিনয় করেছিলেন, তাঁরা হলেন- দক্ষ (গিরিশচন্দ্র), মহাদেব (অমৃতলাল মিত্র), দধীচি (অমৃতলাল বসু),  ব্রহ্মা (শীলমাধব চক্রবর্তী) বিষ্ণু (উপেন্দ্রনাথ মিত্র), সতী ( বিনোদিনী), তপস্বিনী (ক্ষেত্রমণি), প্রসৃতি (কাদস্বিনী)।

গুর্মুখ রায়ে মালিকাধীনে স্টারে অভিনীত হয়- দক্ষযজ্ঞ (২১ জুলাই), ধ্রুবচরিত (১১ আগস্ট), রামের বনবাস (২৯ আগস্ট), সীতার বনবাস (২৬ সেপ্টেম্বর), সীতাহরণ, চক্ষুদান (রামনারায়ণ রচিত ২৭ অক্টোবর), মেঘনাদবধ (নধুসূদনের ২১ নভেম্বর), সধবার একাদশী (৫ ডিসেম্বর), রাবণবধ (৮ ডিসেম্বর), নলদময়ন্তী (১৫ ডিসেম্বর), চোরের উপর বাটপাড়ি (অমৃতলালএর রচিত, ২৬ অক্টোবর)। এর ভিতরে দীনবন্ধু, রামনারায়ণ, অমৃতলালের একটি করে নাটক ছাড়া বাকি সবগুলোর রচয়িতা ছিলেন গিরিশচন্দ্র
এছাড়া মেঘনাদবধের নাট্যরূপও দিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্র। এগুলোর ভিতরে দর্শকসমাদর পেয়েছিল দক্ষযজ্ঞ, ধ্রুবচরিত্র ও নলদময়ন্তী। ধ্রুবচরিত্র নাটকেই গিরিশ প্রথম গিরিশচন্দ্র চরিত্র সৃষ্টি করেন এবং অমৃতলাল বসু সেই চরিত্রে অসামানা অভিনয় করে তাকে প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া এই নাটকে ধ্রুব চরিত্রে ভূষণকুমারী গানে ও অভিনয়ে মাতিয়ে দিয়েছিলেন।

১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে  গুর্মুখ রায় আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের লোকজনের পীড়নে এবং ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে স্টারের স্বত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিনোদিনীর জন্য তৈরি এই থিয়েটারের স্বত্ব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গিরিশচন্দ্র ও অন্যান্যদের প্রতিবন্ধকতায় তা বিনোদিনী কোনো স্বত্ব পান নি। গুর্মুখ রায় হতাশ হয়ে মাত্র এগারো হাজার টাকায় স্টার থিয়েটারের স্বত্ব বিক্রি করে দেন চারজনের নামে। এঁরা হলোন অমৃতলাল মিত্র. দাসচরণ নিয়োগী, হরিপ্রসাদ বস ও অমতলাল বসু।

চার জন নতুন মালিকের তত্ত্বাববধানে স্টার নতুনভাবে শুরু হলেই  গিরিশচন্দ্র সর্বের্বা হিসেবেই ছিলেন। তিনি ছিলেন ম্যানেজার, অভিনয় শিক্ষক, নাট্যকার। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পুরানো নাটকের সাথে নতুন যে সকল উল্লেখযোগ্য নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, সেগুলো হলো- অভিমন্যুবধ (১৬ মার্চ), কমলেকামিনী (২৯ মার্চ), বৃষকেতু, হীরার ফুল (২৬ এপ্রিল), চাটুজ্জে-বাঁডুজ্জে (অমৃতলালের রচিত, ২৬ এপ্রিল), আদর্শ সতী (অতুল মিত্রের রচিত, ২১ মে), শ্রীবৎসচিন্তা (৭ জুন), চৈতন্যলীলা (২ আগস্ট), প্রহ্লাদ চরিত্র (২২ নভেম্বর), বিবাহ বিভ্রাট (অমৃতলালের রচিত, ২২ নভেম্বর)। এই বছরেও অমৃতলাল বসু, অতুলকৃষ্ণ মিত্র ও দীনবন্ধুর একটি করে নাটক ছাড়া বাকি সব নাটকই গিরিশচন্দ্রে লেখা।

এই বছরে নতুন নাটকের মধ্যে গিরিশচন্দ্রের 'চৈতন্যলীলা'র অভিনয় নানা দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত পুরাণের বিষয় নিয়ে এতদিন গিরিশচন্দ্র  নাটক লিখেছেন। চৈতন্যলীলায় তিনি শ্রীচৈতন্যের জীবনাশ্রয়ী ধর্মকথা উপস্থাপন করেছিলেন। এই নাটকে  নিমাইয়ের ভূমিকায় বিনোদিনী এবং নিতাইয়ের ভূমিকায় বনবিহারিণী, নৃত্যে গীতে ও অভিনয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিলেন। এই নাটকে সুরকার ও নৃত্য শিক্ষক ছিলেন বেশীমাধব অধিকারী। চৈতন্যলীলার ২১ সেপ্টেম্বরে অভিনয় দেখতে এসেছিলেন পরমহংস রামকৃষ্ণদেব। তিনি এই নাটক দেখে অভিভূত হন এবং সবাইকে আশীর্বাদ করেন। বিশেষ করে চৈতন্যের চরিত্রে বিনোদিনী-কে বিশেষভাবে প্রশংসা ও আশীর্বাদ করেন।  এই সময় রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাথে গিরিশচন্দ্রের  পরিচয় ঘটে। ধীরে ধীরে তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসেরের প্রিয়পাত্র, ভক্ত, শিষ্যে পরিণত হন।

১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে এই থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা ছিল-  চৈতন্যলীলা, ২য় ভাগ (১০ জানুয়ারি), দোললীলা (১ মার্চ), মৃণালিনী (১ এপ্রিল), পলাশীর যুদ্ধ (২৬ এপ্রিল), প্রভাস যজ্ঞ (৩০ মে), বুদ্ধদেবচরিত (১৯ সেপ্টেম্বর)। এই বছরেও প্রায় সব নাটক গিরিশচন্দ্রের রচিত এবং সবগুলোই ছিল পৌরাণিক। ব্যতিক্রম ছিল বঙ্কিমের উপন্যাসের নাট্যরূপ, নবীনচন্দ্র সেনের কাব্যের নাট্যরূপ।  অবশ্য এই দুটিরই নাট্যরূপ দিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্রচৈতন্যলীলা প্রথম ভাগের অভিনয়ের সার্থকতায় উৎসাহিত হয়ে তিনি এর দ্বিতীর ভাগ নিয়ে রচনা করেন। তবে ততটা দর্শক সমাদর পায় নি। প্রভাস যজ্ঞ কিছুটা দর্শক টানতে পেরেছিল। 'বুদ্ধদেবচরিত'-এ দর্শক-সমাদর পেয়েছিল। স্যার এডুইন আর্নল্ডের কাব্য 'লাইট অফ এশিয়া* অবলম্বন করে গিরিশ এই নাটকটি লিখিছিলেন। এতে অভিনয় করেছিলেন- সিদ্ধার্থ-অমৃতলাল মিত্র, শুদ্ধোধন-উপেন্দরনাথ মিত্র, বিদূষক-শিবচন্দ্র ভট্রাচার্য, সুজাতা- প্রমদাসুন্দরী, গোপা- বিনোদিনী। সৌভাগ্যবশত স্যার আর্নল্ড সে সময়ে কলকাতায় ছিলেন। তিনি অভিনয় দেখে নাটকটির উচ্ছৃসিত প্রশংসা করে সংবাদপত্রে চিঠিপত্রে।

১৮৮৬  খ্রিষ্টাব্দে এই থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা ছিল- বিল্বমঙ্গল ঠাকুর (১২ জুন), বেল্লিকবাজার (২৬ ডিসেম্বর), কমলেকামিনী (২৬ ডিসেম্বর)। এছাড়া আগের নাটকগুলিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অভিনয় করা হয়েছিল।  এই বছরেও প্রায় সব নাটক ছিল গিরিশচন্দ্রের রচিত। এর ভিতরে তবে সবচেয়ে সফল প্রযোজনা ছিল বিল্বমঙ্গল ঠাকুর। এই নাটকের গানগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এতে অভিনয়ে করেছিলেন- অমৃতলাল মিত্র (বিল্বমঙ্গল), অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় (সাধক), অঘোরনাথ পাঠক ভিক্ষুক), বিনোদিনী (চিন্তামণি), গঙ্গামণি (পাগলিনী)।

১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি  বিনোদিনী আনুষ্ঠানিকভাবে স্টার থিয়েটার ত্যাগ করেন। ২১ মে গিরিশচন্দ্রের  রূপসনাতন (২১ মে)অভিনীত হয়। এরপর ৩১ জুলাই অভিনীত হয় বুদ্ধদেবচরিত ও বেল্লিককবাজার। বেল্লিককবাজার অভিনয় শেষে আনুষ্ঠিকাভাবে বিদায় ভাষণ দিয়ে অমৃতলাল বসু স্টার ত্যাগ করেন। এই বছরে ধনকুবের মতিলাল শীলের নাতি গোপাল লাল শীল থিয়েটার করার সখে কৌশলে স্টার থিয়েটারের জমি কিনে নেন এবং স্টারের স্বত্বাধিকারীদের উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া দেন। ফলে বাধ্য হয়ে ত্রিশ হাজার টাকায় এই থিয়েটার বাড়ি গোপাল শীলের কাছে হস্তান্তর করেন। এই বাড়িতে বাড়িতে গোপাল লাল শীল খুললেন এমারেন্ড থিয়েটার।

স্টার থিয়েটারের নাট্যদল বাড়িটি ছেড়ে দিলেও, নামের অধিকার ছাড়েন নি। তাঁরা নতুন করে অভিনয় শুরু করেন হাতী বাগান থেকে।

স্টার থিয়েটার (হাতীবাগান)
স্টার থিয়েটারের মালিক অমৃতলাল বসু, দাসুচরণ নিয়োগী, অমৃতলাল মিত্র এবং হরিপ্রসাদ বসু, নতুন থিয়েটারের জায়গা খোঁজা শুরু করেন। অবশেষে হাতিবাগানের রণেশকৃষ্ণ দেবের ত্রিশ কাঠা জমি ক্রয় করতে সক্ষম হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ৬৮ নম্বর বিডন স্ট্রিটের স্টার থিয়েটার-বাড়ি ত্যাগ করা সময় দায়ে পড়ে  গিরিশচন্দ্র এমারেল্ড থিয়েটারের সাথে নাটক রচনার চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু স্টারের টানে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এমারেল্ড থিয়েটারের সাথে চুক্তির সময় গিরিশচন্দ্র ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। স্টারের মালিকরা যখন হাতিবাগানের জমি ক্রয় করার পর, তখন এঁদেরকে বিনাশর্তে ১৬ হাজার টাকা থিয়েটার বাড়ি বানানোর জন্য দান করেছিলেন। থিয়েটার বাড়ি তৈরি হওয়ার পর, গিরিশচন্দ্র গোপনে এদেরর জন্য নাটক লিখেছিলেন।

হাতিবাগানের স্টারের বাড়ি তৈরির জন্য, এঁদের নাট্যদল বিভিন্ন স্থানে অভিনয়ের মাধ্যমে অর্থোপার্জনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এঁদের সমবেত চেষ্টায় পাঁচ মাসের চেষ্টায় নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছিল। এই সময় অন্যান্য যাঁরা সাহায্য করেছিলেন, তাঁরা হলেন- ইন্জিনিয়ার য়ার যোগেন্দরনাথ মিত্র এবং মঞ্চ অভিজ্ঞ ধর্মদাস সুর। এঁদের তত্ত্ববধানে থিয়েটারের নকশা ও অলঙ্করণ সুষ্ঠু ও সুদৃশ্যভাবে সম্পন্ন হয়ে। গ্যাসবাতি দিয়ে উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা করেছিলেন পি. সি. মিত্র এণ্ড কোম্পানী। দৃশ্য সজ্জাকরণে ছিলেন দাসুচরণ নিয়োগী, সঙ্গীতে ছিলেন রামতারণ সান্যাল এবং নৃত্যে ছিলেন কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায়। নতুন থিয়েটারের ম্যানেজার ছিলেন অমৃতলাল বসু। এই থিয়েটারের মোট দর্শকাসন ছিল দেড় হাজার। প্রবেশমূল্য ছিল- রয়েল বক্স পৌঁচ জন) একশো টাকা, বক্স (চোর জন) চোদ্দ টাকা। বক্স (দুই জন) আট টাকা, ড্রেস সার্কেল চার টাকা। অর্কেস্ট্রা স্টল তিন টাকা, স্টল- দুই টাকা। পিট সিট এক টাকা। গ্যালারি আট আনা। পৃথক জেনানা বক্স (চোর জন) দশ টাকা। জেনানা সিট (দুই টাকা)। উদ্বোধনের দিনে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়েছিল, অভিনয় শেষে হাতীবাগান থেকে বউবাজার পর্যন্ত ছয় পয়সা ভাড়ায় দর্শকদের জন্য স্পেশাল ট্রামগাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে শুক্রবার ফুলদোলের দিন (১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৫) মহাসমারোহে হাতীবাগানের নবনির্মিত দ্বিতীয় স্টার থিয়েটার উদ্বোধন হয়। প্রথম নাটক ছিল নাটক গিরিশচন্দ্রের লেখা 'নসীরাম'। উল্লেখ্য এমারেন্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকায় গিরিশচন্দ্র লুকিয়ে খালপারে বসে এই নাটকটি লিখে দিয়েছিলেন। এই কারণে এই নতুন নাটকের রচয়িতা নাম দেওয়া হয়েছিল ‌'নসীরাম'। এতে অভিনয় করেছিলেন- নসীরাম (অমৃতলাল বসু), অনাথনাথ (অমৃতলাল মিত্র), শম্ভুনাথ (অমৃতলাল মুখোপাধ্যায়), কাপালিক (অঘোর পাঠক), বিরজা (কাদম্বিনী), সোনা (গঙ্গামণি), পাহাড়িয়া বালকের ভূমিকায় (তারাসুন্দরী)। এটিন ছিল তারাসুন্দরীর  প্রথম মঞ্চাভিনয়। উদ্বোধনকালে অমৃতলাল বসু গিরিশচন্দ্র লেখা কবিতা পাঠ করেন।

প্রথম বছর গিরিশ স্টারে ছিলেন না, কিন্তু তাঁর রচিত পুরনো নাটকগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এখানে অভিনীত হয়েছিল। এগুলোর ভিতরে ছিল চৈতন্যলীলা, বিল্বমঙ্গল ঠাকুর, সীতার বনবাস, নলদময়ন্তী, রাবণবধ। গিরিশচন্দ্র ছাড়া এই মঞ্চে অভিনীত 'সরলা' অভাবনীয় সাড়া জাগিয়েছিল। 'সরলা' ছিল তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বর্ণলতা' উপন্যাসের অমৃতলাল বসু-কৃত নাট্যরূপ। নাটকটি অভিনীত হয়েছিল ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর। এই নাটকে অসামান্য অভিনয় করেছিলেন- বিধুভূষণ (অমৃতলাল মিত্র), গদাধর (অমৃতলাল মুখোপাধ্যায়), শশিভৃষণ (নীলমাধব চত্রবর্তী), সরলা (কিরণবালা), গোপাল (তারাসুন্দরী), শ্যামা (গঙ্গামণি), প্রমদা (কাদম্বিনী)। এমারেল্ড ছেড়ে দিয়ে গিরিশচন্দ্র স্টারে চলে আসেন ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি। আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেছিলেন ২৭ এপ্রিল। এই দিনই অভিনীত হয়েছিল- তাঁর রচিত 'প্রফুল্ল'। পৌরাণিক কাহিনি ভিত্তিক নাটকের বেড়াজাল ভেঙে এই নাটক লিখেছিলেন 'সরলা' নাটকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে। এই নাটকটির জনপ্রিয়তা 'সরলা' নাটকের রেকর্ডকে অতিক্রম করেছিল। এই নাটকে  গিরিশচন্দ্র অভিনয় করেন নি। অন্যান্য যাঁরা এতে অভিনয় করেছিলেন, তাঁরা হলেন- অমৃতলাল মিত্র (যোগেশ), অমৃতলাল বসু (রমেশ), কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায় (সুরেশ), অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় (ভজহরি), মহেন্দ্রনাথ চৌধুরী (পীতাম্বর), শ্যামাচরণ কুণ্ড (কাঙালিচরণ), নীলমাধব চক্রবর্তী (মদন ঘোষ), ভূষণকুমারী (প্রফুল্প), গঙ্গামণি (উমাসুন্দরী), কিরণবালা (জ্ঞানদা), টুম্পামণি (জগমণি)।

১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রফুল্ল ছাড়া আর অভিনীত হয়েছিল গিরিশচন্দ্রের প্রায় সব পুরনো নাটক এবং অমৃতলালের 'তাজ্জব ব্যাপার‌'। গিরিশচন্দ্রের নতুন সামাজিক নাটক 'হারানিধি' অভিনীত হয়েছিল ৭ সেপ্টেম্বর। কিন্তু সেরকম দর্শকনন্দিত হয় নি।

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের অধিকাংশ নাটকই ছিল গিরিশচন্দ্রের রচিত পুরনো নাটক। জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে গিরিশচন্দ্র মলিনাবিকাশ (গীতিনাট্য) এবং মহাপুজা  মঞ্চস্থ হয়েছিল। 'মলিনাবিকাশ' গীতিনাট্যে বাংলা মঞ্চে প্রথম দ্বৈত-নৃত্যগীতের প্রচলন হয়। এই নাচে অংশগ্রহণ করেছিলেন বিকাশ (সুকুমারী) এবং মলিনা (মানদাসুন্দরী)। এর সুরকার ছিলেন রামতারণ সান্যাল এবং নৃত্যশিক্ষায় ছিলেন কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায়। এই বছরে  গিরিশচন্দ্রের পুত্র সুরেন্দ্রনাথ (দানী) চণ্ড নাটকের রঘুদেবজীর চরিত্রে প্রথম অভিনয় শুরু করেন। এই বছরের ১১ মার্চ স্টারের বিখ্যাত অভিনেতা অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় এবং এপ্রিল মাসে অভিনেত্রী কিরণবালার মৃত্যু হয়। এই দু‌জনের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তিন মাস স্টারে অভিনয় বন্ধ ছিল।

অমৃতলাল বসুর নতুন নাটক 'তরুবালা' সাফল্য লাভ পেয়েছিল। ঠাকুরদা চরিত্রে নীলমাধব চক্রবর্তী এবং ঠানদিদি‌র ভূমিকায় গঙ্গামণি এবং তরুবালার ভূমিকায় প্রমদাসুন্দরী খ্যাতি অর্জন করেন।

১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের শুরু থেকে  গিরিশচন্দ্রের সাথে স্টারের কর্তৃপক্ষের মনোমালিন্য শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ম্যানেজার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। এই সময় গিরিশচন্দ্রের সাথ অন্যান্য যাঁরা স্টার ত্যাগ করেছিলেন, তাঁরা হলেন- নীলমাধব চক্রবর্তী, অঘোরনাথ পাঠক, প্রবোধচন্দ্র ঘোষ, দানীবাবু, শরৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানদাসুন্দরী প্রমুখ। স্টার ত্যাগের পর নীলমাধব চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সিটি থিয়েটার খোলা হয়। এই সময় গিরিশচন্দ্র অন্তরাল থেকে এঁদের সাহায্য করেছিলেন। এই বছরে সিটি থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রের নাটকগুলো অভিনীত হতে থাকলে স্টার কর্তৃপক্ষ মামলা করে। মামলায় স্টার হেরে যায়। এই সময় বিচারপতি উইলসন তাঁর রয়ে উল্লেখ জরেন যে,- কোনো মুদ্রিত নাটক বিক্রয় করা শুরু হলে, তা বিনা বাধায় সকল থিয়েটারই মঞ্চস্থ করতে পারবে। গিরিশচন্দ্র চলে যাওয়ার পর ম্যানেজার হন অমৃতলাল বসু। মাসিক একশো টাকা বেতনে ১৫ ফেব্রুয়ারি নাট্যকার হিসেবে যোগ দেন রাজকৃষ্ণ রায়। তাই ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে গিরিশচন্দ্রের নাটকের পরিবর্তে রাজকৃষ্ণ রায়ের নাটকগুলো অভিনীত হতে থাকে। তাঁর রচিত 'সম্মতি সঙ্কট', 'নরমেধ যজ্ঞ', 'লায়লা-মজনু' প্রভৃতি নাটকগুলো বেশ ভালোই সমাদৃত হয়েছিল।

১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে অমৃতলাল বসু রচিত ‌'বিলাপ বা বিদ্যাসাগরের স্বর্গে আবাহন' অভিনীত হয়েছিল ২২ আগস্ট।

১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে রাজকৃষ্ণের প্রায় সব নাটকই অভিনীত হয়েছিল। এগুলোর ভিতরে উল্লেখযোগ্য ছিল বনবীর, ঋষ্যশূঙ্গ এবং রাজাবাহাদুর। এর বাইরে অমৃতলাল বসুর 'কালাপানি' অভিনীত হয়েছিল। এছাড়া স্টারের মঞ্চ 'কৃষ্ণবিলাস' নামে একটি হিন্দি ভাষায় অপেরা অভিনীত হয়েছিল ৬ আগস্ট। বাংলা মঞ্চে হিন্দি ভাষায় রচিত এটাই ছিল প্রথম নাটক। 'কৃষ্ণবিলাস' দর্শকসমাদর লাভ করেছিল।

১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে 'কৃষ্ণবিলাস' এর সাফল্যে উৎসাহিত গিরিশচন্দ্রের 'সীতার বনবাস নাটকের হিন্দিরূপ 'রামাশ্বমেধ' মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নাটকটি অভিনীত হয়েছিল ২৭ মে। এই নাটকে কৃষ্ণবিলাসে রাধিকা চরিত্রে তারাসুন্দরী সচ্ছন্দ ও প্রাণবন্ত অভিনয় করেছিলেন। এই বছরে রাজকৃষ্ণের 'বেনুজীর বদরেমুনীর' এবং অমৃতলালের '‌বিমাতা' বা 'বিজয়বসম্ত' অভিনীত হয়েছিল।

১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখর উপন্যাসকে নাট্যরূপ দেন  অমৃতলাল বসু। এই নাটকে অভিনয় করেছিলে অমৃত মিত্র (চন্দ্রশেখর), তারাসুন্দরী (শৈবলিনী), অক্ষয় কোঁঙার (প্রতাপ) এবং নরীসুন্দরী (দলনী) ভালো অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া এই বছরে অমৃতলাল বসুর 'বাবু' অভিনীত হয়েছিল। 

১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ মার্চ, নাট্যকার রাজকৃষ্ণ রায়ের মৃত্যু হয়।  ৮ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্ের মৃত্যু  হয়। এঁদের মৃত্যুতে স্টারের অভিনয় বন্ধ থাকে ১৪ মার্চ ও ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত।

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ জুলাই গিরিশচন্দ্রের প্রফুল্ল অভিনীত হয়। উল্লেখ্য একই দিনে মিনার্ভা থিয়েটার 'প্রফুল্ল' অভিনীত হয়েছিল মিনার্ভা থিয়েটারে যোগেশের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন গিরিশচন্দ্র। অন্যদিকে স্টারে যোগেশের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অমৃতলাল মিত্র। এই বছরে পুরানো নাটক মঞ্চস্থ করেই স্টার টিকেছিল।

১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি অমৃতলাল বসুর নাট্যরূ্প দেওয়া রাজসিংহ অভিনীত হয়।  এই বছরে ১৫ এপ্রিল গিরিশচন্দ্র মিনার্ভা থিয়েটার থেকে আবার স্টার থিয়েটারে ফিরে আসেন এবং ড্রামাটিক ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর গিরিশচন্দ্রের রচিত নতুন নাটক 'কালাপাহাড়' মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন গিরিশ (চিন্তামণি), অমৃত মিত্র (কালাপাহাড়), নগেন্দ্রবালা (ইমান)। নরীসুন্দরী (দোলনা), প্রমদাসুন্দরী (চঞ্চলা)। এই বছরে উল্লেখ্যযোগ্য অপর নাটকটি ছিল অমৃতলালের 'বৌমা'।
 
২৪শে ফেব্রুয়ারি বিলিতি মঞ্চের অভিনেতা দেব কার্সনের মৃত্যু হয়। এই কারণে স্টার অভিনয় বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি তাঁর স্ত্রীর সাহায্যার্থে অভিনয় করা হয়েছিল। ৮ জুলাই ঔপন্যাসিক তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতির সম্মানে স্টার তার পরিবারের সাহায্যে 'সবলা' নাটক অভিনয় করে।

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এদের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য নতুন নাটক মঞ্চস্থ হয় নি। কোনো নাটকের অভিনয় হয় নি। ২১ জুন রানী ভিক্টোরিয়া রাজ্যশাসনের অষ্টম বর্ষপূর্তি স্মরণে পালিত হয় হীরকজুবিলী। এই নাটকে নট চরিত্রে অমৃতলাল মিত্র এবং এক মাতালের ভূমিকায় দানীবাবু অসামান্য অভিনয় কবেন।

সেপ্টেম্বর মাসে গিরিশচন্দ্র নতুন নাটক পারস্যপ্রসূন অভিনীত হয়। ডিসেম্বর মাসে অভিনীত হয় তাঁর 'মায়াবসান' নামক  নতুন সামাজিক নাটক। এতে অভিনয় করেছিলেন-  এতে গিরিশচন্দ্র (কালীকিঙ্কর), দানীবাবু (হলধর), অক্ষয় কোঁঙার (গণপতি), তারাসুন্দরী (অন্নপূর্ণা), নরীসুন্দরী (রঙ্গিনী) ও নগেন্দ্রবালা (বিন্দু)।

১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে শুধু অমৃতলালের 'গ্রাম্য-বিভ্রাট' এবং  নতুন নাটক 'হরিশচন্দ্র' অভিনীত হয়।
১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে এপ্রিল মাসে কলকাতায় প্লেগ রোগ দেখা দেয়। ১৭ এপ্রিল কাপালিটোলা লেনের এক বাসিন্দার দেহ ময়নাতদন্ত করে চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত দেন যে, এর মৃত্যু হয়েছে প্লেগে।

গ্রেগ মহামারী রূপে দেখা দেয়। মার্চ মাস থেকেই আতঙ্কে লোকজন কলকাতা ছেড়ে পালাতে থাকে। ১১ মের পরে গিরিশচন্দ্রস্টার ছেড়ে দেন। তিনি আর কখনো স্টার থিয়েটারে ফিরে আসেন নি। এরপর দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায় বেনিয়াপুকুর, বড়বাজার, কুমারটুলি, শ্যামপুকুরে। ৩০ এপ্রিল প্রশাসন জানিয়ে দেয় কলকাতায় প্লেগ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। মে মাসের প্রথম থেকে দলে দলে কলকাতা থেকে মানুষ পালাতে থাকে। এই কারণে ১৫ মে থেকে টানা চল্লিশ রাত স্টারে অভিনয় বন্ধ থাকে। আবার অভিনয় শুরু হয় ২৫ জুন থেকে।

এরই ভিতরে স্টার-কর্তৃপক্ষের মতান্তর  হওয়ায় ১১ই মে গিরিশচন্দ্রের এই থিয়েটার ছেড়ে চলে যান। গিরিশচন্দ্র চলে যাওয়ায় এবারে দারুন অসুবিধার মধ্যে পড়ে যায়। কারণ এই সময় স্টারে ভালো নাট্যকার, অভিনেতা এবং অভিনয় প্রশিক্ষক ছিল না। ফলে পুরানো নাটক দিয়ে দর্শক ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। এই দুর্দিনে থিয়েটার বাঁচানোর জন্য  স্টার নাট্যাভিনয়ের পূর্বে 'বায়স্কোপ'  দেখাবার ব্যবস্থা করে। স্টারে এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ অক্টোবর থেকে। প্রথম অধিবেশনে দেখানো হয়েছিল নেলসনের মৃত্যু, হীরকবিজুলীর শোভাযাত্রা এবং গ্ল্যাডস্টোনের শবানুগমন । এরপরে দেখানো হয়েছিল অমৃতলালের 'বাবু'। এরপর থেকে প্রতিটি নাট্যানুষ্ঠানের সাথে বায়স্কোপ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে পুরনো নাটকগুলির সঙ্গে নতুন নাটক অভিনীত হল মৃচ্ছকটিক, সাবাস আটাশ (অমৃতলাল), বিরহ (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)। এরপর নাটাকারের অভাবে অমৃতলাল পরপর নাটক লিখে চলেছেন। এই সময় পুরনো নাট্যকার মনোমোহনের নাটক অভিনয় করানো হয়েছিল।

এই বছরের ১৭ এপ্রিল থেকে কলকাতায় বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা চালু হয়। ২৮ এপ্রিল থেকে, 'আদর্শবন্ধু' অভিনয়ের সঙ্গে স্টারে গ্যাসের আলোর পরিবর্তে প্রথম বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা হয়। এই নতুন আলোর ব্যবস্থায় থিয়েটারে আলোক নিয়ন্ত্রণ অভিনব হয়ে উঠেছিল।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে অভিনীত হয়েছিল আদর্শবন্ধু (অমৃতলাল), কৃপণের ধন (অমৃতলাল), প্রণয়পরীক্ষা (মনোমোহন বসু), লীলাবতী (দীনবন্ধু), হরিশ্চন্দ্র (মনোমোহন), ত্র্যহস্পর্শ (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়), যাদুকরী (অমৃতলাল)।

১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে নবোদ্যোম স্টারের নাট্যাভিনয় শুরু হয়। এই বছরের উল্লেখোগ্য নাটকগুলো ছিল- এছাড়া অন্যান্য নাটক ঘুরেফিরে অন্যান্য পুরানো নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল।

১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে কিছু নতুন নাটক ছাড়া পুরনো প্রায় সব নাটক অভিনীত হয়েছে। নতুন নাটকগুলো ছিল
বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে স্টার থিয়েটার
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কার্জন বড় লাট নিযুক্ত হন। মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য― লর্ড কার্জন বাংলা প্রসিডেন্সি ভেঙে বাংলাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে বাংলার আন্দোলনরত জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ব্রিটিশ শক্তি হুমকি হিসাবে নিয়েছিল। এই প্রক্রিয়া ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে উড়িষ্যাকে পৃথক করার প্রস্তাব করা হয়। এই সময় লর্ড কার্জনের প্রধান সমর্থক ও উপদেষ্টা এ্যাণ্ডুজ ফ্রেজারকে বাংলার লেফটেনান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফ্রেজার বাংলা প্রেসিডেন্সির ক্ষমতা গ্রহণের পর, লর্ড কার্জনের কাছে বঙ্গবিভাগের পরিকল্পনা পেশ করেন। ১৯০৩ বঙ্গাব্দের ৩ ডিসেম্বর তারিখে লর্ড কার্জন এই পরিকল্পনা প্রায় অক্ষুণ্ণ রেখে সরকারিভাবে উত্থাপন করেন এবং তা  'ক্যালকাটা গেজেট'-এ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য এই সময় এই অঞ্চল শাসিত হতো একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনে।

মূলত লর্ড কার্জন সরকারিভাবে ঘোষণার আগে থেকেই এর বিরোধিতা শুরু করেছিলেন বাংলার জাতীয়তাবাদী দলগুলো। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল- সেকালের নাট্যশালগুলো। এরই ভিতরে ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনে বাংলা মঞ্চ থেকে জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশপ্রেমের নাটক দেখানো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ-রদ আন্দোলন-আন্দোলনের সূত্রে নাট্যশালাগুলো আবার স্বদেশী নাটক প্রচার করা শুরু করে। এই সময়ে গিরিশচন্দ্র মিনার্ভা থিয়েটার তাঁর 'সিরাজদ্দৌলা, মীরকাশিম,, 'ছত্রপতি শিবাজী' স্বদেশপ্রেমের নাটকগুলো মঞ্চস্থ করেছিল। এই সময় স্বদেশী নাটক মঞ্চায়নে স্টার এগিয়ে এসেছিল। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে অর্ধেন্দু মুস্তফী, স্টারে যোগদান করেন। ১৯০৩ বঙ্গাব্দের ৩ ডিসেম্বর তারিখে লর্ড কার্জন সরকারিভাবে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব দেন। এরই মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ-রদ আন্দোলন-আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে অর্ধেন্দু মুস্তফীঁর উদ্যোগেই স্টার থিয়েটারে নতুন করে স্বদেশী-ভাবধারায় পুষ্ট নাটকগুলো অভিনীত হয়েছিল। এই নাটকগুলো হলো-

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম কোলকাতা প্রেস- থেকে। আর ৬ই জুলাই (বৃহস্পতিবার ২২ আষাঢ় ১৩১২)আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই দিন বাং;লার নাট্যশালাগুলো অশোচ ব্রত পালন করেছিল। এই উপলক্ষে এই দিন স্টার বন্ধ রাখা হয়েছিল।
এরপর স্টার মঞ্চস্থ করেছিল- তিনটি নাটক এ্গুলো হলো

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের দিকে অপরেশ মুখোপাধ্যায় 'স্টার থিয়েটার-এ যোগ দেন। এখানে তিনি ক্ষীরোদ প্রসাদের 'পলাশীর প্রায়শিচত্ত' (৪ জুন ১৯০৬) নাটকে মোহনলালের চরিত্রে অভিনয় করে সুখ্যাতি লাভ করেন। এই নাটকটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে অমৃতলালের সাথে বনিবনা না হওয়ায় অপরেশ মুখোপাধ্যায় স্টার ত্যাগ করেন। ৪ মে স্টারে বৈদ্যুতিক পাখা যুক্ত হয়েছিল। এই দিন অভিনীত হয়েছিল ক্ষীরোদ প্রসাদের 'বক্ষ ও রমণী' এবং অমৃতলালের 'একাকার' নাটক। ১৪ আগষ্ট মঞ্চস্থ হয়েছিল ক্ষীরোদ প্রসাদের 'নন্দকুমার'। ১৯০৮  খ্রিষ্টাব্দের উল্লেখযোগ্য নাটক ছিল- ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে পুরানো নাটকের পাশাপাশি অভিনীত হয়েছিল ২টি নতুন নাটক। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে পুরানো নাটকের পাশাপাশি অভিনীত হয়েছিল ৪টি নতুন নাটক। এগুলো হলো- ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমার্থে পুরানো নাটকের পাশাপাশি অভিনীত হয়েছিল ২টি নতুন নাটক। এগুলো হলো- এরপর ২৭শে সেপ্টেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অভিনয় বন্ধ ছিল। এরপর আরও দুটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটক দুটি হলো- ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি গিরিশচন্দ্রের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন সময় স্টারের নাট্যকর্মীদর সাথে তিনি কাজ করেছেন। স্টারের হাতীবাগানের স্টারের প্রতিষ্ঠালগ্ন সাহায্য করেছিলেন। যদিও গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর সময় স্টারের সাথে সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু স্টারের নাট্যকরমীরা শোকাহত ছিলেন। এই বছরের পুরানো নাটকের পাশাপাশি নতুন ছিল ৫টি। এগুলো হলো- ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে বছরের শুরু থেকেই টাকার জন্য বায়োস্কোপ দেখানো হয়েছিল। এছাড়া কলকাতার বাইরে অভিনয় করেছিল স্টারের নাট্যকর্মীরা। ফলে ২৯শে মার্চের আগে কলকাতায় এদের কোনো নাটক মঞ্চস্থ হয় নি। এরপর যে সকল নতুন নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, সেগুলো হলো-

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে পুরানো নাটকের সাথে সে কয়েকেকটি নতুন নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। সেগুলো হলো-

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা জানুয়ারী স্টারের প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুশীলাবালা মৃত্যুবরণ করেন। তাই সেদিন স্টারে অভিনয়ের শুরতে  হরিসঙ্কীর্তন হয়েছিল। এই বছরে পুরানো নাটকের পাশাপাশি যে সকল নতুন নাটক অভিনীত হয়েছিল, সেগুলো হলো ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি অমরেন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর স্টারের ম্যানেজার হন অমৃতলাল বসু। এই বছরের নতুন নাটক ছিল- ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের নতুন নাটকগুলো ছিল- ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে স্টার মুমূর্ষু অবস্থায় কোনরকমে চলছিল।

২৮ এপ্রিলের অনুষ্ঠানের পর একেবারে ২৮ জুন পর্যন্ত স্টার একটানা বন্ধ থাকে। ২৯ জুন থেকে পুরনো নাটক এবং সঙ্গীত, নৃত্য, বায়োস্কোপ ইত্যাদির অনুষ্ঠান চালানো হয়।

এরপর গিরিমোহন মল্লিক স্টার থিয়েটারের ভাগ্য ফেরানোর উদ্যোগ নেন। ৩ আগস্ট শরৎচন্দ্রের 'বিরাজ বৌ' উপন্যাসের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করা হয়।  নাট্যরূপ দিয়েছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ। এটাই ছিল সাধারণ রঙ্গমঞ্চে শরৎচন্দ্রের গল্প বা উপন্যাস অবলম্বনে প্রথম নাট্যরূপের অভিনয়। অভিনয় করেছিলেন- অমৃতলাল বসু (যদু), মি. পালিত (নীলাম্বর), ক্ষেত্রমোহন মিত্র (পীতাম্বর), কাশীনাথ চট্টোপাধ্যায় (নিতাই), হীরালাল দত্ত (ভুলু), মনোমোহন গোস্বামী (নরহরি), কুসুমকুমারী (বিরাজ বৌ),  বসন্তকুমারী (সুন্দরী), নরীসুন্দরী (মোহিনী)। এই নাট্যকের সূত্রে আবার স্টারে দর্শক সমাগম শুরু হয়েছিল। এর ফাঁকে পুরনো নাটক চালানো হয়েছিল। নতুন নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ হয়েছিল- ২১শে সেপ্টেম্বর ভূপেন্দ্রনাথের প্রহসন 'বিদ্যাধরী" ২ নভেম্বর যতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়ের 'আরব অভিযান‌। ২৯ নভেম্বর ব্রিটেনের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয় উপলক্ষে মঞ্চস্থ হয়েছিল 'ভিক্টোরি সেলিব্রেশান পারফরমেন্স'। ব্রিটেনের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ উপলক্ষে স্টার বিশেষ অভিনয়। এছাড়া অভিনীত হয়েছিল খাসদখল' ও জয়দেব । উল্লেখ, এই দিন দরিদ্রের জন্য প্রবেশমূল্য ছিল না।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর গিরিমোহন মল্লিক স্টার থিয়েটারকে আরও ভালোভাবে চালানোর জন্য- মিনার্ভা থিয়েটার থিয়েটারের অপরেশ মুখোপাধ্যায়কে থিয়েটারের ম্যানেজার নিযুক্ত করেন। এই সময় অপরেশচন্দ্রের সঙ্গে মিনার্ভা থিয়েটার থেকে চলে এসেছিলেন তারাসুন্দরী ও নীরদাসুন্দরী। নতুন নাটক প্রস্তুতির জন্য কয়েকদিন অভিনয় বন্ধ থাকার পর, ১৪ ডিসেম্বর মঞ্চস্থ হয়েছিল ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের 'কিন্নরী'। উল্লেখ্য, এটি আগেই ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ আগষ্ট অপরেশচন্দ্র মিনার্ভায় অভিনয় করেছিলেন। স্টারে অভিনয় করেছিলেন- তারকনাথ পালিত (সুধন), তারাসুন্দরী (উৎপল), বসম্তকুমারী (মকরী), নীরদাসুন্দরী (চকুরিশ)। এই সময় স্টারের পাশাপাশি মিনার্ভা থিয়েটারের ‌'কিন্নরী' অভিনয় চলছিল। এবং একসঙ্গে দুই থিয়েটারে 'কিন্নরী' হাউসফুল হতে থাকল। মিনার্ভার মালিক উপেন্দ্রনাথ মিত্র স্টারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করলেও। কিন্তু স্টারেও 'কিন্নরী'র অভিনয় চলতে লাগল।

১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ স্টার শুরু হয়েছিল কিন্নরী' দিয়ে। ২ মার্চ আদলতের আপত্তিতে স্টার  'কিন্নরী'র অভিনয় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে গিরিমোহন স্টারের সত্ত্ব ত্যাগ করলে- অমৃতলাল বসু, হরিপ্রসাদ ও দাসুচরণ নিয়োগীর কাছ থেকে অপরেশচন্দ্র স্টারের লীজ নেন। বাংলা নববর্ষ থেকে মাসিক ১২০০ টাকায় ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া দিতে হয়েছিল সেলামিবাবদ গিরিমোহনকে ৯২৫০ টাকা, স্টারের মালিকদের ৯০০ টাকা এবং এক রাত্রির সম্মান-অভিনয় বাবদ ৭০০ টাকা।


সূত্র: