|
ছবি : মমিনুল হক দুলু। সৌজন্য: ছায়ানট সংস্কৃতি সম্ভার |
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ [১৩৬৮ বঙ্গাব্দ] রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উৎযাপনের সূত্রে এই প্রতিষ্ঠানটি জন্মলাভ করেছিল। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তদানীন্তন পাকিস্তানে জারীকৃত সামরিক শাসনের কারণে সারা দেশে বিরাজ করছিল থমথমে পরিবেশ। বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন পাকিস্তান সরকারের কাছে, বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ছিল দেশদ্রোহিতার সমতুল্য। এই পরিবেশের ভিতরে রবীন্দ্র-জন্ম-শতবার্ষিকী উৎযাপন করেছিলেন, তাৎকালীন ঢাকার কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবী। এঁরা ছিলেন বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব , মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, খান সারওয়ার মুর্শেদ প্রমুখ।
|
|
![]() |
| সন্জীদা খাতুনন | ওয়াহিদুল হক |
|
ছায়ানটের সভাপতি
|
|
সাধারণ সম্পাদক
|
|
ছায়ানট বিদ্যায়তেনর অধ্যক্ষ
|
এরপর পাকিস্তান সরকারের বৈরী আচরণে কিছুটা
স্লথ হয়ে পড়ে ছায়ানটের কার্যক্রম।
১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে
কামাল লোহানী
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।
১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে প্রথম
বাংলা একাডেমি'র
( বর্ধমান
হাউস )বারান্দায় সঙ্গীত শেখার কার্যক্রম শুরু হয়। এই সময়
রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাতেন সনজীদা খাতুন ও ফরিদা মালিক, নজরুল সঙ্গীত শেখাতেন
সোহরাব
হোসেন, তবলা শেখাতেন বজলুল করিম, বেহালা ও সেতার শেখাতেন মতি মিয়া।
মূলত এই বৎসরের ছায়ানট
সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৩৭০ বঙ্গাব্দে ১লা বৈশাখ-এ (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) তৎকালীন ইংলিশ প্রিপারোটরি স্কুলে
ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। উদ্বোধন করেছিলেন ওস্তাদ আয়াত আলী
খান, আর বিদ্যায়তনের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন
শিল্পাচার্য
জয়নুল
আবেদীন। বিদ্যায়তনের প্রথম অধ্যক্ষ হয়েছিলেন ঢাকা বেতারের গুণী যন্ত্রী মতি মিঞা
(মতিয়র রহমান খান)।
১৩৭১
বঙ্গাব্দের [১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ] ১লা বৈশাখে ইংলিশ প্রিপারোটরি স্কুল (উদয়ন স্কুল)
প্রাঙ্গণের কৃষ্ণচূড়া গাছের তলে বিদ্যায়তনের প্রথম বার্ষিকী এবং নববর্ষ উদযাপন করে
ছায়ানট।
১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জুন পাকিস্তান সরকার তথ্যমাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নানা অজুহাতে তারা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকে ব্যাহত করার প্রয়াস চালাতে থাকে। বৈরি পরিবেশে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যায় ছায়ানট এবং ক্রমে আরো সংগঠিত হয়ে ওঠে।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি বাধার কারণে বিদ্যায়তনের কার্যক্রম অগ্রণী বালিকা
বিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়। এরপর সরকারি চাপের মুখে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয়
লেক সার্কাস গার্লস হাই স্কুলে। ওই বছরই ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে
প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৬৭ (১লা বৈশাখ ১৩৭৪
বঙ্গাব্দ) খ্রিষ্টাব্দে রমনা উদ্যানের অশ্বত্থতলায় নববর্ষ উদ্যাপন 'ছায়ানটের সকলাবেলার অপর অনুষ্ঠান 'পয়েলা বৈশাখ'। এ-উৎসবের
বাঁধা জায়গা রমনা। একটি পাকুড় গাছের নিচে মঞ্চ। পাকুর গাছ বট নাম দিয়ে বটমূলের
অনুষ্ঠান বলতে ভালোবাসতাম। এখানে মানুষের মেলা জমত প্রতি বছর। খোলা মাঠে গান হয়
না বলে বিজ্ঞ সঙ্গীজ্ঞরা আমাদের নিরুৎসাহিত ও নিরস্ত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু
আমরা জানতাম এ-দিনের গান কেবল গাইবার আনন্দে গাওয়া। কেউ শুনলো কি না তা আমাদের
গ্রাহ্য করবার দায় নেই। নববর্ষের জলযোগের দোকান বসেছে একদিক-লোকে
কিনছে-খাচ্ছে-গল্প
করছে-নববর্ষ-সম্মিলন
হচ্ছে সরবে। পাকুড় গাছের পাতা দুলিয়ে বইছে প্রভাতের ঝিরিঝিরি বাতাস।
তানপুরা নিয়ে শাহীক আকতার গাইছে 'ভোরের হাওয়ায় এলে ঘুম ভাঙাতে কি?' সমবেত কণ্ঠে
গাইছি 'আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে'-
মানবসমাজের
কাজে যাবার জন্য নতুন শপথ নিচ্ছি ভক্তিনত চিত্তে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বছর
১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ৭-১৩ নভেম্বর, হয় গ্রেড ভোলা
সাইক্লোন।
প্রাণহানি ঘটেছিল প্রায় ৫ লক্ষ।
চট্টগ্রাম, ভোলা, চরফ্যাসন, মনপুরা, সন্দ্বীপ, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী,
বোরহানুদ্দিন, চর তজুমদ্দিন, দক্ষিণ মাঈজদী, হারিয়াঘাটা এলাকার ওপর দিয়ে এ সময়
২০৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা বেগে ঝড় হয়েছিল। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল প্রায় ১০.৫ মিটার।
২০ হাজার জেলে নৌকা নিখোঁজ হয়েছিল। ১০ লক্ষাধিক গবাদিপশু মারা গিয়েছিল অথবা
হারিয়ে গিয়েছিল জলোচ্ছ্বাসে। বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল চার লাখের বেশি।
এই সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসক ছিলেন
ইয়াহিয়া
খান। তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের এই দুর্গের সময়- ইয়াহিয়া
সরকার দুর্গত মানুষের জন্য কোনো সাহায্য দেয় নি। এই সময় ক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ দুর্গত মানুষের
সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। সাহায্যের এই উদ্যোগে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিল ছায়ানট।
সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে
ওয়াহিদুল
হক, স্থপতি মাজাহারুল আনোয়ার, পটুয়া কামরুল হাসান, সৈয়দ
হাসান ইমাম প্রমুখের
প্রচেষ্টায় শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতারা সমাজ রাজপথে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া
হয়েছিল। এই সময়
আলতাফ
মাহমুদ হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে গান গেয়েছিলেন 'কাঁদো বাংলার
মানুষ আজিকে কাঁদো'। রাজপথের মিছিলের বাইরে অর্থ সংগ্রহের জন্য বেশ কিছু
অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। এরপর অর্থ ও ত্রাণ সমগ্রী নিয়ে উড়ির চর ও কুকর মিকরিতে
গিয়েছিলেন
ওয়াহিদুল
হক, আতিকুল ইসলাম, সৈয়দ হাসান ইমাম. কামরুল হাসান।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লেক সার্কাস গার্লস হাই স্কুলেই ছায়ানট
সঙ্গীতবিদ্যায়তনের কার্যক্রম চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বিদ্যায়তন বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছায়ানটের কর্মীদের অনেকেই ভারতে আশ্রয় নেন এবং মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষে কাজ করেন। আগ্রহী সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা গড়ে
তাঁরা স্বাধীনতার পক্ষে গান গেয়ে প্রচারণা চালান এবং যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ
করেন।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে আবার কাজ শুরু করে ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন।
ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ ড. নূরুন নাহার ফয়জুন্নেসা তাঁর স্কুলে
ছায়ানটকে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী বিষয়টি অনুমোদন করেন।
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ছায়ানট বিদ্যায়তনের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ঢাকার
বেইলি সড়কস্থ মহিলা সমিতি মঞ্চে পরিবেশিত হয়েছিল- রবীন্দ্রনাথের 'মায়ার খেলা'
গীতিনাট্য'।
১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি
সময় পর্যন্ত গবেষণা কর্মের জন্য ভারতের শান্তিনিকেতনে কাটান। তাঁর গবেষণার বিষয়
ছিল- 'ধ্বনি থেকে কবিতা'। এই সময় ছায়ানটের তৎকালীন
অধ্যক্ষ সনজীদা খাতুনের অনুপস্থিতে, বিদ্যায়তনের
নজরুলসঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক
অঞ্জলি রায়
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে
ছায়ানট বিদ্যায়তনের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ঢাকার বেইলি সড়কস্থ মহিলা সমিতি মঞ্চে
পরিবেশিত হয়েছিল- রবীন্দ্রনাথের 'শ্যামা' নৃত্যনাট্য'।
১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর ঢাকা শহরের উপর
দিয়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। এই রাত পৌণে আটটার দিকে জগন্নাথ হলের ছাদ ধ্বসে পড়ে
৫০ জনের মত- ছাত্র-কর্মী নিহত হন। মর্মান্তিক ওই ঘটনার পরের দিন ছায়ানট ও সম্মিলিত
সাংস্কৃতিক জোট শোক মিছিল করে। এই শোক মিছিলে ছায়ানটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও
স্বেচ্ছাকর্মীরা 'দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল আলোক' গানটি শোক মিছিলে
গেয়েছিলেন।
১৯৮৬-৮৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি,
প্রধানমন্ত্রী এবং ছায়ানটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী), ছায়ানটের রমনা বটমূলের আয়োজিত
নববর্ষের অনুষ্ঠানে আসেন। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে- বিএনপির সমর্থকরা হট্টগোল তৈরি
করে। ছায়ানটের স্বেচ্ছাকর্মীরা মানববন্ধন সৃষ্টি করে তাঁকে রক্ষা করেন। এক সময় তিনি
মঞ্চে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। পরে কোনো অঘটন ছাড়াই তিনি নিরাপতে ফিরে যেতে পেরেছিলেন।
১৯৯০ বা ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে চারুকলা ইন্স্টিটিউটের বকুল তলায় প্রথম শরৎ-উৎসব
অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন ছায়ানটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি
ক্ষমতায় আসার পর, মহসিন হলের ছাত্রদলের একাংশ ছায়ানটের স্বাভাবিক কার্যক্রমের
ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। এই সময়ে এরা ছায়ানটের তবলার শিক্ষার্থী এবং
স্বচ্ছাকর্মী মোহমদ আলীর মাথায় পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেছিল। পরে তৎকালীন
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য এবং সানজিদা খাতুনের প্রচেষ্টায় এই উপদ্রবকে কমিয়ে আনা
সম্ভব হয়েছিল।
ছায়ানটের স্থায়ী নতুন ভবন
ছায়ানটের সাড়ে চার দশকের
সংস্কৃতিসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানকে স্বীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯৯৯
খ্রিষ্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেন ধানমণ্ডিতে। এই
জমিতে সংস্কৃতি-ভবন নির্মাণ করে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে ব্যাপকতর অবদান রাখার
লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে ছায়ানট। ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের নক্শা প্রণয়ন করেছেন প্রখ্যাত
স্থপতি বশিরুল হক। এর জন্য তিনি কোনো সম্মানি নেন নি।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩মে প্রতীকী মূল্যে
(১০০১ টাকা) এক বিঘা জমিসহ ধানমণ্ডি ১৫/এ সড়কের ৭২
নম্বর বাড়িটি ছায়ানটকে সরকার দান করে।
২০০২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে রাজউক ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের নকশা অনুমোদন করে। ২০০২
খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই মে থেকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। নানা জটিলতায় ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের
সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ভবন-নির্মাণ কাজ স্থগিত হয়ে যায়। নতুন করে নির্মাণ কাজ শুরু
হয় ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে। ২০০৬ সালের জুনে সংস্কৃতি-ভবনে শুরু হয়েছে
নিয়মিত কার্যক্রম। ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের
নভেম্বর মাসে ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী আসমা কিবরিয়া।
২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়- শুদ্ধ সঙ্গীতের তিন দিন ব্যাপী উৎসব।
এই উৎসবের উদ্বোধন করেছিলেন- প্রখ্যাত সরোদ শিল্পী বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত।
২০২৫ খ্রিষ্ঠাব্দের ছায়ানট ভবনে
হামলা
২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত (অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর রাত ১টার দিকে) ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে একদল
দুর্বৃত্ত হামলাকারী আক্রমণ চালায়।
হামলাকারীরা ভবনের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করে। এতে ভবনের সিসি ক্যামেরা, কম্পিউটার, আসবাবপত্র এবং বহু মূল্যবান বাদ্যযন্ত্র,
গ্রন্থাদি বিনষ্ট হয়।
উল্লেখ্য, গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতার
অজুহাতে নিয়ে এই হামলা চালানো হয় ।
একই রাতে দুর্বৃত্তরা বাংলাদেশের দুটি জাতীয় পত্রিকা- প্রথমআলো, ডেইলি স্টার অফিসে আক্রমণ করে ধ্বংস
করে। পরের দিন আক্রমণ করে অপর সাংস্কৃতিক সংগঠন 'উদীচী'।
ক্ষতিগ্রস্থ
ভবনের ছবি
১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার ১৯ ডিসেম্বর সকাল থেকেই বিক্ষুব্ধ শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা ছায়ানট ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকেন।
বিকেলে তারা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে
প্রতিবাদে গান পরিবেশন করেন "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়"—এই গানগুলোর মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়।
এই প্রতিবাদে ভবনের সামনে অনেককে প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতির ওপর আঘাত বন্ধের দাবি
জানায়।
[ নিচতলায়
ভাঙচুর] [রাস্তায় ছায়ানটের আসবাবপত্র পুড়ানোর দৃশ্য [১]
[ ২]
[হারমোনিয়াম ভাঙার উদ্যোগ]
[ধ্বংসপ্রাপ্ত বাদ্যযন্ত্রের নমুনা ১.
২],
ছায়ানট গ্রন্থাগার
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনে ক্ষতিগ্রস্ত ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন পরিদর্শনে আসেন।
তিনি দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।
এই হামলার পর, ছায়ানটের প্রধান ব্যবস্থাপক
দুলাল ঘোষ, মামলায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাতনামা
ব্যক্তিকে আসামি করে ঢাকার
ধানমন্ডি মডেল থানায় মামলা দায়ের করে।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে
বলেন- সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ইতিমধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে।
এই সূত্রে পুলিশ সূত্র থেকে প্রাধমিকভাবে যে সকল আসামীর নাম যাদের নাম জানানো হয়,
তাঁরা হলেন-
মো. কাশেম ফারুকি
মো. সাইদুর রহমান
রাকিব হোসেন
মো. নাইম
ফয়সাল আহমেদ প্রান্ত
মো. সোহেল রানা
মো. শফিকুল ইসলাম
জাকির হোসেন শান্ত,
মো. স্বপন মণ্ডল,
নিয়াজ মাহমুদ ফারহান।
এই হামলায় প্রায় ২.২ কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছিল। হামলার পর থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সংস্কার কাজের জন্য 'ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তন'-এর ক্লাসসহ সব ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।
২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ডিসেম্বর (৮ পৌষ ১৪৩২, মঙ্গলবার) বিকাল ৪টায় ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের সামনে
এই আক্রমণের প্রতিবাদে- 'গানে গানে সংহতি-সমাবেশ' শিরোনামে সাবইকে শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ সংস্কৃতিসেবী এবং প্রগতিশীল মানসের সকলকে সমাবেশে যোগ
দেওয়ার আহ্বান করা হয়।
এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে, ২৩ ডিসেম্বর 'গানে গানে সংহতি-সম্পন্ন হয়।
[চিত্র:
সমাবেশে অংশগ্রহণকারী শিল্পীতের একাংশ ]
এই সমাবেশে গাওয়া হয়- মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, চল্ চল্ চল্ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, ও আমার দেশের মাটি, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মানুষ ছেড়ে খ্যাপা রে তুই, মানুষ হ' মানুষ
হ' আবার তোরা মানুষ হ', তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর' হিমালয় থেকে সুন্দরবন', আমার প্রতিবাদের ভাষা,
গানগুলো।
ছায়ানটের নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম
ছায়ানটের নববর্ষ
উদ্যাপন
১৩৭১
বঙ্গাব্দের [১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ] ১লা বৈশাখে ইংলিশ প্রিপারোটরি স্কুল
(উদয়ন স্কুল)
প্রাঙ্গণের কৃষ্ণচূড়া গাছের তলে ছায়ানট প্রথম নববর্ষ
উদ্যাপন করে। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দেও এই স্কুল প্রাঙ্গণে ছায়ানটের নববর্ষ উদ্যাপিত
হয়েছিল।
১৯৬৭ (১লা বৈশাখ ১৩৭৪
বঙ্গাব্দ) খ্রিষ্টাব্দে রমনা উদ্যানের অশ্বত্থতলায়
নববর্ষ উদ্যাপন শুরু করে ছায়ানট। গাছটি অশত্থ হলেও-
বটমূল নামে পরিচয় দিয়ে থাকে ছায়ানট। কারণ পঞ্চবটীর
একটি হলো- অশত্থবৃক্ষ। অপর বটগুলো হলো- বট, বিল্ব, আমলকি ও অশোক।
ছায়ানট প্রতীকী নাম হিসেব তখন থেকেই বটমূল
নামে ব্যবহার করে আসছে। মূলত বটমূল শব্দটা এক্ষেত্রে অনেকটা প্রতীকী।
এই নাম এবং এই সময়ে রমনার পরিবেশের চিত্র পাওয়া যায়, সন্জীদা
খাতুনের রচিত 'ছায়ানট' প্রবন্ধে (গ্রন্থ: 'স্থির প্রত্যয়ে যাত্রা'। ছায়ানট। দ্বিতীয়
প্রকাশ ২০১১)। তিনি লিখেছেন-

২০০১ খ্রিষ্ঠাব্দের বোমা হামলা
২০০১ খ্রিষ্ঠাব্দে (১৪০৮বঙ্গাব্দ) রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজিত নববর্ষের
অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। ওই হামলায় ১০ জন নিহত হন এবং বেশকিছু দর্শক আহত হন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত হানা এবং বাঙালি সংস্কৃতি
বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য সন্ত্রাসী ধর্মীয় গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছিল। এই
আক্রমণে নিহতদের যে পরিচয় জানা গেছে- এঁরা হলেন
চট্টগ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৩৫),
বরগুনার মোঃ জসীম (২৩),
ঢাকার হাজারীবাগের এমরান (৩২),
পটুয়াখালীর অসীম চন্দ্র সরকার (২৫),
পটুয়াখালীর মোঃ মামুন,
ঢাকার দোহারের আফসার (৩৪),
নোয়াখালীর ইসমাইল হোসেন ওরফে স্বপন (২৭),
পটুয়াখালীর শিল্পী (২০) ও
অজ্ঞাত একজন।
এই হামলার পর, ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন।
দুই মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করা হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ২০০৮
খ্রিষ্টাব্দে ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
এই মামলা দুটি বিচারের জন্য ২০০৯
খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায় এবং ১৬ এপ্রিল মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
এরপর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ পাঠানো হয়।
২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে নিম্ন আদালত
এটি রায় ঘোষণা করে।
মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মুফতি হান্নানের সঙ্গে শফিকুর ছিলেন।
অন্যরা হলেন- আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর
ভাই মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম
হাওলাদার ও আবদুল হাই।
দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে তাজউদ্দিন, বদর, হাফেজ জাহাঙ্গীর, শফিকুর ও আব্দুল
হাই পলাতক ছিলেন।
এরপর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। একইসঙ্গে কারাবন্দি আসামিরা আপিল করে। উভয় আবেদনের ওপর ২০১৭
খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়।
এই অনুষ্ঠান শুরু ভোরে। অনুষ্ঠানে নানাবিধ বাংলা গান, যন্ত্রসঙ্গীত আবৃত্তি
পরিবেশিত হয়। সঙ্গীত পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন, প্রধানত ছায়ানট সঙ্গীতবিদ্যায়তনের
ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকবৃন্দ। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবিতা আবৃত্তি
এবং সঙ্গীত শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেন।