বৈষ্ণব-সঙ্গীত
ধর্মসঙ্গীতের একটি ধারা বিশেষ। সনাতন ধর্মের অন্যতম দেবতা বিষ্ণু,
বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ ও
গোলকধামের রাসমণ্ডলে বিষ্ণুর
বাম অংশ থেকে উৎপন্ন
রাধার সাথে সম্পর্কিত সঙ্গীত।
বৈদিক যুগের শেষের দিকে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে রচিত বৈদিক সাহিত্যে বিষ্ণুর
উল্লেখ থাকলেও একান্ত বিষ্ণুর অনুগত ভক্ত বা বিষ্ণু-ভাবনার বিকাশ ঘটে নি।
খ্রিষ্টপূর্ব
৬০০-৩০০ অব্দের ভিতরে রচিত রামায়ণের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিষ্ণুর অবতার রাম প্রথম ধীরে
ধীরে উপাস্য হয়ে উঠছিল। এই
কাব্যের রামভক্তের বিকাশ ঘটলেও, ক্ষত্রিয় রামের ভিতরে অহিংস বৈষ্ণব দর্শন পাওয়া যায়
না। ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে রচিত মহাভারতে বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ একটি
গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও, কৃষ্ণকে ক্ষত্রিয় হিসেবেই দেখানো হয়েছে। মহাভারতোত্তর
পৌরাণিক যুগে, অরথাৎ ৩০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত বিষ্ণু অন্যতম দেবতা
হয়ে উঠেছিল প্রজা-রক্ষাকারী দেবতা হিসেবে। এই সময়ের ভিতরে বিষ্ণুর ক্ষত্রিয়-রূপটি বিশেষভাবে
উপস্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু কোনো পুরাণে রাধাকৃষ্ণের লীলা-ভিত্তিক কাহিনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে
উঠেছিল।
পৌরাণক যুগে পৌরাণিক দেবতা
বিষ্ণু'র অবতার
কৃষ্ণ
এবং
রাধার
প্রেম-লীলাভিত্তিক উপখ্যান বিকাশ লাভ করেছিল। উল্লেখ্য,
কৃষ্ণ ছিলেন
বিষ্ণুর
দ্বাপর
যুগের প্রথম অবতার এবং তাঁর দশম অবতারের অষ্টম অবতার।
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে-
ভোজবংশীয়
কংস
নামক এক
অত্যাচারী রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা
ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে,
ব্রহ্মা
সকল দেবতাদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে
বিষ্ণু'র
আরাধনা শুরু করেন।
বিষ্ণু
সে আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সাদা ও কালো রঙের দুটি চুল দিয়ে বললেন যে,
তিনি
বসুদেবের ঔরসে
দেবকীর
গর্ভে জন্মগ্রহণ করবেন।
কৃষ্ণের প্রতীক হলো কালো চুল।
তাঁর সহযোগী হলেন
বলরাম, তাঁর প্রতীক হলো সাদা চুল। এই সূত্রে
ববসুদেবের ঔরসে
দেবকীর
অষ্টম গর্ভে
কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল।
পদ্মপুরাণ ও ভাগবতের মতে,
গোলকধামে কৃষ্ণের বামপাশ থেকে
রাধার উৎপত্তি হয়েছিল।
জন্মের পর পরই তিনি
কৃষ্ণের আরাধনা শুরু করেন।
তিনি উৎপত্তিকালে ১৬ বৎসরের নব-যৌবনারূপে কৃষ্ণের সিংহাসনের বামপাশে অবস্থান নেন।
এই সময় রাধার লোমকূপ হতে লক্ষকোটি গোপিকা ও কৃষ্ণের লোমকূপ থেকে লক্ষকোটি
গোপের জন্ম হয়।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের মতে- একবার
বিষ্ণু
রম্যবনে প্রবেশ করে রমণ ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ফলে তাঁর ডান অংশ থেকে কৃষ্ণমূর্তি ও বাম অংশ থেকে রাধা মূর্তি প্রকাশ পায়।
রাধা
কৃষ্ণকে কামাতুর দেখে তাঁর দিকে অগ্রসর হন।
রা অর্থ লাভ এবং ধা অর্থ ধাবমান।
তিনি অগ্রসর হয়ে কৃষ্ণকে লাভ করেছিলেন বলে- এঁর নাম হয়েছিল রাধা।
পুরাণের বাইরে এই জাতীয় রচনায় উৎকৃষ্ট নমুনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কবি জয়দেবের
রচিত 'গীতগোবিন্দম্'।
যতদূর জানা যায়,
জয়দেব ছিলেন
বাংলা রাজা
লক্ষণসেন (১১৭৯-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ) রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম। উল্লেখ্য অপর
চারজন রত্ন ছিলেন−
গোবর্ধন আচার্য,
শরণ,
ধোয়ী ও
উমাপতি ধর।
কারও কারও মতে তিনি কিছুকাল উৎকলরাজেরও সভাপণ্ডিত ছিলেন।
এই গীতগোবিন্দের
পদগুলোর
সাথে পাওয়া যায়, রাগ-তালের নাম পাওয়া যায়। তবে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ
রচিত এই গ্রন্থের পদগুলোর গীতরীতি কেমন ছিল, তা জানা যায় না।
১২০৪-১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে সংঘটিত 'বাংলা
গানের অন্ধকারযুগ'-এই কাব্যের খ্যাতি বঙ্গদেশের বাইরে
ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ধারায় মৈথিলী-বাংলার কবি
বিদ্যাপতি পদাবলী রচনা করেছিলেন। মূলত বাংলা বৈষ্ণব
সঙ্গীতের পদাবলীর ধারার সূত্রপাত হয়েছিল।
বাংলা
সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ধারায়,
বিদ্যাপতি'র
পরবর্তী কবি হিসেবে
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন -এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাসকে ধরা হয়।
আনুমানিক ১৩৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি
জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভবত ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা
হয়, তাঁর আসল নাম ছিল অনন্ত এবং কৌলিক উপাধি বড়ু, গুরুপ্রদত্ত নাম চণ্ডীদাস।
চণ্ডীদাস নামে একাধিক কবির নাম পাওয়া যায়। বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন
চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস। তবে বিভিন্ন গবেষকদের মতে বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণচরিতের
রচয়িতা।
বড়ুচণ্ডীদাসের
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
-এর সূত্রে বঙ্গদেশের পরবর্তী
বৈষ্ণব কবিরা সৃষ্টি করেছিলেন রাধাকৃষ্ণের লীলাভিত্তিক এক ধরনের গান। কালক্রমে এই
গানের সাধারণ নাম হয়ে ছিল কীর্তন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ বিংশ
শতাব্দীর প্রথমার্থের শুরুর দিকে বৈষ্ণবসঙ্গীতের মূল ধারা ছিল কীর্তন। বাংলা এবং
বাংলার বাইরে ছিল- কীর্তনের পাশাপাশি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক হোরি এবং কাজরী গানের বিকাশ
ঘটেছিল। বাংলাতে নানা ধরনের বৈষ্ণব সঙ্গীতকে উৎকীর্ষ্ট পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কাজী
নজরুল ইসলাম।
এই গানের চর্চা বৈষ্ণবদের
অদ্বৈতাচার্য,
যবন হরিদাস এবং শ্রীবাস পণ্ডিতদের প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব গোষ্ঠীর ভিতরে প্রচলিত ছিল। সে
সময় বৈষ্ণবগোষ্ঠী ক্ষুদ্রাকার একটি গোষ্ঠী হিসেবে নদীয়ায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এঁরা
মূলত রাধাকৃষ্ণের লীলা বিষয়ক কীর্তন গান করতে
[বিস্তারিত:
কীর্তন]
বাংলা বৈষ্ণবসঙ্গীতের
চরম বিকাশ ঘটিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ঐতিহযগতভাবে কীর্তন গান রচনার পাশাপাশি,
বৈষ্ণব সঙ্গীতের
শ্রেণিকরণ