মেল বা ঠাটের ইতিহাস

সঙ্গীতের ক্রমবিকাশের প্রাক্‌কথন
সঙ্গীত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। আদিম মানবগোষ্ঠীর ভিতরে ভাষা এবং সঙ্গীতের বিকাশ শুরু হয়েছিল একই সময়। পৃথিবীর আদি মানবগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল আফ্রিকা ইথিওপিয়া এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। কালক্রমে এই অঞ্চল থেকে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণ করা হয়, ভারতবর্ষে প্রথম নেগ্রিট জাতির মানুষ। এরা খ্রিষ্টপূর্ব ৪০-২০ হাজার বৎসরের মধ্যে এরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এদের দ্বারাই সূচিত হয়েছিল ভারতের প্রাচীন প্রস্তরযুগ। ধারণা করা এই সময় সঙ্গীত এবং ভাষা উভয়ই প্রাথমিক স্তরে ছিল।

এরপর ভারতবর্ষে প্রবেশ করে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডরা। ধারণা করা হয়, এরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২০-৬ হাজার বৎসর পূর্বে। এদের আগমনের ফলে আদি  নেগ্রিটো-রা অপ্রধান হয়ে পড়েছিল। হয়তো  নেগ্রিটোরা আত্মরক্ষায় অপারগ হয়ে ক্রমে ক্রমে উত্তর ভারতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। কিম্বা এরা দক্ষিণের দিকে সরে গিয়েছিল। কিম্বা এদের সাথে প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের সংমিশ্রণের ফলে নিজেদের জাতিগত স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য হারিয়েছিল। এই বিচারে ভারতের মধ্য-প্রস্তরযুগের সভ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল নেগ্রিটো আর প্রোটো-অস্ট্রালয়েডদের সংমিশ্রণে। এদের ভাষা অনেকটাই মনের ভাব প্রকাশের উপযোগী হয়ে উঠেছিল। এদের দ্বারা ভারতের আদি  লোকসঙ্গীতের সূচনা হয়েছিল।

এরপর ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল দ্রাবিড় এবং মোঙ্গলীয়'রা। আর্যদের আসার আগে নেগ্রিটো, প্রোটো-অস্ট্রালয়েড, দ্রাবিড় এবং মোঙ্গলীয়'রা ভারতবর্ষে একটি মিশ্র জাতিসত্তার সৃষ্টি করেছিল। এদেরকে মোটা দাগে অনার্য বা প্রাকৃতজনগোষ্ঠী বলা হয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারীদের বলা যেতে পারে পূর্ব-ভারতীয় প্রাকৃত জন। এদের ভিতর নেগ্রিটো, প্রোটো-অস্ট্রালয়েড-দের প্রভাব বেশি। ধারণা করা যায়, রক্তের মিশ্রণের পাশাপাশি এদের ভাষা ও সঙ্গীত নতুন রূপ লাভ করেছিল।  

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ অব্দের দিকে বিদ্যমান সিন্ধু সভ্যতায় গড়ে ওঠা সভ্যতা-সংস্কৃতির কতটা নির্ভেজাল দ্রাবিড়দের নিজস্ব ছিল, আর কতটা মিশ্র জনগোষ্ঠীর ছিল, তা নিরূপণ করাটা সত্যিই মুশকিল। সাধারণীকরণের বিচারে একে সিন্ধু-সভ্যতা বললে, দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। সিন্ধু উপত্যাকা খননের সূত্রে আমরা, তৎকালীন মানুষের যে সকল ব্যবহারিক উপকরণ পাই, তার ভিতরে রয়েছে বেশ কিছু সঙ্গীতের সাথে সম্পর্কিত নমুনা। এর ভিতরে রয়েছে নৃত্যরতা নারী, দু'তিনটি তন্ত্রীযুক্ত হার্পের মতো বীণা, চামড়া আচ্ছাদিত মৃদঙ্গ, করতাল ইত্যাদি। এই সকল নমুনা দেখে ধারণা করা যায়, সিন্ধু সভ্যতায় সঙ্গীতের চর্চা ছিল। সে সময়ে নগরকেন্দ্রিক সঙ্গীত চর্চার ভিতরে হয়তো সাঙ্গীতিক শৃঙ্খলা কিছু ছিল, কিন্তু এর পাশাপাশি গ্রাম্যজীবনে প্রাকৃতজনদের ভিতরে ছিল সঙ্গীতের চর্চা। নগরকেন্দ্রিক সিন্ধুসভ্যতায় বিশিষ্ট সঙ্গীত-শিল্পীরা সঙ্গীতের চর্চা করতেন এবং তাতে রাজা এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। এর বাইরে গ্রাম্য সাধারণ মানুষের ভিতরে সঙ্গীতের চর্চা ছিল নিজেদের আনন্দে। এরা নিজেদের পৃষ্ঠপোষক নিজেরা ছিল। এদেরকে ভারতের প্রাচীন প্রাকৃতজন হিসেবে চিহ্নিত করলে, সে সকল মানুষের ভাষাকে বলতে হয় প্রাচীন প্রাকৃতজনের ভাষা এবং এদের সঙ্গীতকেও বলা যেতে পারে প্রাচীন প্রাকৃতজনের লোকসংগীত।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ অব্দের দিকে বিদ্যমান সিন্ধু সভ্যতায় সঙ্গীতের যে ধরনের চর্চা ছিল, তা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের ধারা আর্যদেরদের ভারতবর্ষে আগমনের পূর্ব-কাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরা ইরান থেকে যে ভাষা ও ধর্মবিশ্বাস সাথে নিয়ে এসেছিল, পরবর্তী ৩০০ বৎসরের ভিতরে তার পরিবর্তন ঘটলো। খ্রিষ্ট-পূর্ব ১০০০ বৎসরের ভিতরে ভারতীয় ইন্দো-ইরানিয়ান ভাষার পরিবর্তন ঘটে, তার নমুনা পাওয়া যায় ঋগ্বেদ। ধারণা করা হয়, ঋগ্বেদের শ্লোকগুলো রচিত হয়েছিল খ্রিষ্ট-পূর্ব ১২০০-১০০০ বৎসরের ভিতরে। এও ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ অব্দের ভিতরে বেদের সকল শ্লোক রচিত হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সকল শ্লোককে চারটিভাগে ভাগ করে নাম দিলেন ঋক্, সাম, যজু, অথর্ব। বেদের এই ভাষাকে ভাষাবিজ্ঞানীর নাম দিয়েছেন বৈদিক ভাষা।

বৈদিক যুগের গান
:
বৈদিকভাষার আচার্যরা জ্ঞানের চর্চা করতেন। তাঁর ঋক্-মন্ত্রগুলো সুরসহযোগে পরিবেশন করতেন। তাতে সুরগুলো উচ্চারিত হতো বিশেষ ভঙ্গীতে বা সুরশৈলীতে। একে বলা যায় সুরে সুরে আবৃত্তি। বৈদিক ঋষিরা মন্ত্রপাঠ করতেন কাব্যের ছন্দে। পরে তাতে সুর যুক্ত করা হয়।তারপরেও ছন্দের চাল রক্ষিত হতো কাব্যের মাত্রার বিচারে। তাতে সঙ্গীতোপযোগী সুরের কদর ছিল, কিন্তু আলাদা করে সুরের আদর ছিল না। ঋকবেদের মন্ত্রে ঋষিরা মূলত মানবকণ্ঠের অবিভাজ্য সঙ্গীতোপযোগী ধ্বনি ব্যবহার করেছিলেন।

বৈদিক যুগের মধ্যপর্বে গ্রামগেয়, অরণ্যগেয়, ঊহ ও ঊহ্য গানের কথা জানা যায়। এই বিচারে বলা যায়, রাগের শ্রেণিকরণ না হলেও সে সময়ে গানের শ্রেণিকরণ হয়েছিল।

বৈদিক-কালের এসব গানে বাণীর বিচারে ভাগ করা হতো। সুরে বিচারে বিশেষ পার্থক্য না থাকায়, ধারণা করা যায়, সেকালে ঋষিদের মন্ত্রের সুরটা মূখ্য ছিল না। গোড়ার দিকে সেকালের এসব সুরেলা আবৃত্তির সুর ছিল একঘেঁয়ে। সে সুরকে স্বরের বিচারে বলতে গেলে বলতে হয় এক স্বরস্থানের সুর। যে সকল গানের বাণী বেদের ঋক্ মন্ত্র থাকতো, সেগুলোকে বলা হতো আর্চিক। ঋকের প্রকৃতি অনুসারে একে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই ভাগ দুটি হলো–

সাধারণত ৩টি পদ নিয়ে গঠিত হতো ত্রিঋচ। অবশ্য কখনো কখনো দুটি বা তিনের অধিক পদকেও ত্রিঋচ বলা হয়ে থাকে। প্রতিটি ত্রিঋচ-এর প্রথম পদকে বলা হতো 'যোনি'। এর বাইরে অন্যান্য পদগুলোকে বলা হতো 'উত্তরা'। পূর্বার্চিকে যোনিমন্ত্রগুলোকে পৃথকভাবে সংগৃহীত বলে, এর অপর নাম যোনিগ্রন্থ।

সুর করে গীত ঋকগুলোর একঘেঁয়েমি দূর করার জন্য কণ্ঠস্বরকে উপর-নিচ করা হতো।  স্বরস্থানের এই পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল  তিনটি ধাপে। ধাপ তিনটি হলো—

স্বরস্থানের ভিতরে ধীরে ধীরে একটি একটি করে সঙ্গীতোপযোগী শব্দ স্থান পেতো থাকলো। এইভাবে একটি সঙ্গীতোপযোগী ধ্বনিকে ভারতীয় ঋষিরা নাম দিলেন স্বর। সঙ্গীতরত্নাকরের মতে― 'শ্রুতিসমূহের অনন্তর অনুরণনাত্মক যে স্নিগ্ধ ধ্বনি উৎপন্ন হয়, যে ধ্বনির অপর কোনও সহকারী কারণের অপেক্ষা না করিয়া স্বতই শ্রোতার চিত্তরঞ্জন করে তাহাকেই স্বর বলে।' ঋষিরা এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ষড়্‌জকে আদর্শমান ধরেছিলেন। এক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট স্বরসপ্তকের প্রতিটি স্বরের ভিতর ধ্বনিগত ব্যবধান সৃষ্টি হবে এবং ওই ব্যবধান শ্রুতির ব্যবধানকে অনুসরণ করবে।  সামবেদে স্বরের অপর নাম 'যম'। সাম-এর বাণী অংশ ছিলো মন্ত্র বা মন্ত্রের অংশ। একে বলা হতো 'যোনি', এর অর্থ হলো — কারণ। ঋকপ্রাতিশাখ্যে শৌণিক সাম-এর স্বরগুলিকে 'যম' উল্লেখ করছেন। মূলত 'যম' দ্বারা গানের সুর নির্ধারিত হতো। সামবেদের অপর নাম আর্চিক। ৫৮৫টি যোনি নিয়ে আর্চিক গঠিত। সামগানে ব্যবহৃত তিন স্বরস্থান থেকে বাকি সাতটি শুদ্ধ স্বর সৃষ্টি হয়েছে। সামগানে এই সাতটি স্বরের নাম ছিল ―ক্রুষ্ট, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, মন্দ্র ও অতিস্বার্য। সেকালের লৌকিক গানে এই স্বরগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রকাশ পেয়েছিল। এই লৌকিক স্বরগুলো হলো― ষড়্‌জ,  ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম পঞ্চম, ধৈবত ও নিষাদ। যাজ্ঞবল্ক্য ও অন্যান্য ঋষিদের মতে ―
        অনুদাত্ত থেকে ঋষভ ও ধৈবত
        উদাত্ত থেকে নিষাদ ও গান্ধার
        স্বরিত থেকে ষড়্‌জ, মধ্যম ও পঞ্চমের সৃষ্টি হয়েছিল।
সামগানের স্বরের সাথে লৌকিকগানের স্বর সমন্বয়ের সময়, নারদ এই সাতটি স্বরকে যেভাবে সাজিয়েছিলেন তা হলো-

সামগানের স্বর ও লৌকিক স্বরের তুলনামূলক অবস্থান

সামগানের স্বর

লৌকিক স্বর

প্রথম মধ্যম
দ্বিতীয় গান্ধার
তৃতীয় ঋষভ
চতুর্থ ষড়্‌জ
মঞ্চম (মন্দ্র) ধৈবত
ষষ্ঠ (অতিস্বার্য) নিষাদ
সপ্তম (ক্রুষ্ট) পঞ্চম
আধুনিককালের স্বরবিন্যাস হলো ‒ ষড়্‌জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত ও নিষাদ। এর সংক্ষেপে এগুলো উচ্চারণ করা হয়‒ সা, রে, গা, মা, পা, ধা এবং নি। শাস্ত্রমতে এগুলিকে শুদ্ধস্বর বলা হয়। এর ভিতর সা এবং পা -এর স্থান সুনির্দিষ্ট। এই কারণে এই দুটি স্বরকে অচলস্বর  বলা হয়। বাকি ৫টি শুদ্ধস্বর মূর্ছনা বা শ্রুতিবিন্যাসের তারতম্যে বিকৃত হয়। এই বিকৃত স্বরগুলি হলো ― কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, কড়ি মধ্যম, কোমল ধৈবত, কোমল নিষাদ। ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে এই স্বরগুলো ২২টি শ্রুতির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো বিশেষ স্বরের একটি উপরে বা নিচের অবস্থানে গেলে এই শ্রুতি অনুভব করা যায়। প্রাচীন ভারতের সঙ্গীত তত্ত্বে স্বরগুলোকে শ্রুতি অনুসারে বিভাজিত করা হয়েছিল, আধুনিককালে তার কিছুটা অবস্থানগত পরিবর্তন ঘটেছে।

বৈদিকভাষার যুগে আর্য ঋষিদের সাথে সাধারণ আর্যদের যতটা যোগাযোগ ছিল, কালক্রমে তা অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছিল। বৈদিক ভাষা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা না হয়ে সাহিত্যের ভাষা হয়ে উঠেছিল। এর ফলে বৈদিক ভাষার নানা ধরনের কথ্যরূপ তৈরি হয়েছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০-৫০০ অব্দের ভিতরে বৈদিক ভাষা থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল। ব্যাকরণ দিয়ে এই ভাষার রীতি নীতি অনেকে বাঁধার চেষ্টাও করেছিলেন অনেকে। এক্ষেত্রে পাণিনি সফল হয়েছিলেন। তাঁর সাফল্য সাময়িকভাবে বৈদিক ভাষাকে জীবন্ত করেছিল বটে, দীর্ঘজীবী করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আর্যদের গবেষণার সূত্রে, সঙ্গীত একটি শাস্ত্রীয় কাঠামো লাভ করেছিল। একথা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, আর্যসমাজের সাধারণ মানুষ তাঁদের সামাজিক জীবনে অন্য কোন গান গাইতেন না। মনুষ্য সমাজের প্রকৃতি অনুসারে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা যায় যে, আর্য সমাজের সাধারণ গৃহীদের  ভিতরও লোকগান ছিল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আচার্যরা সে সব সুরের কোনো কোনোটিকে শাস্ত্রীয় বিধিতে বেঁধে রাগে পরিণত করেছিলেন। কালক্রমে আর্য অনার্যের সংমিশ্রণে ভাষার যেমন পরিবর্তন ঘটেছিল, সঙ্গীতেও তেমনি অনার্য সুরকেও হয়তো তাঁরা রাগে পরিণত করেছিলেন। শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে রাগাশ্রয়ী গান সেকালেও তৈরি হতো। বাংলা গানের আদি নমুনা হিসেবে প্রাপ্ত চর্যাগানই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
অন্যদিকে ভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীর ভিতর নাচগানের চর্চা ছিল জীবনমুখী। প্রত্যাহিক জীবনযাত্রায় আনন্দ-বেদনার ভিতর দিয়ে সঙ্গীতকে লালন করেছিল। আর্যঋষিদের মতো শ্রুতি ও স্বরে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম বিচার ছিল না। কিন্তু সুরের যাদু ছিল। যে যাদুতে তাঁর নিজের মোহিত হতেন এবং শ্রোতাকে মুগ্ধ করতেন। দুর্ভাগ্য সে গান হারিয়ে গেছে। কিন্তু রেশ রয়ে গেছে একালের লোক সঙ্গীতের ভিতর।

আর্যদের সাথে প্রাকৃতজনের সংমিশ্রণে ভারতীয় প্রাদেশিক ভাষার জন্ম হয়েছিল। তেমনি সঙ্গীতের আঞ্চলিক লোকগানের বিকাশ ঘটেছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। এই মেলোমেশায় লোকসঙ্গীতকে আর্যসঙ্গীতের দ্বারস্থ হতে হয় নি কখনো। ঋষিরা নিজেদেরকে যে উচ্চাসনে বসিয়েছিল, লোকসঙ্গীতকে সে আসনের দিকে ফিরেও তাকায় নি। বরং ঋষিদেরকে প্রাকৃতজনের কাছে আসতে হয়েছে। লোকসুরকে তাঁরা গ্রহণ করেছেন। আর স্বভাবগুণে তাঁর সেগুলোক রাগে পরিণত করেছেন। গবেষণালব্ধ স্বর ও মাত্রা বিন্যাসে ঋষিরা বিজ্ঞানী, কিন্তু রাগের সূতিকার হলো লোকসঙ্গীত।

রাগ -এর উৎপত্তি ও তার শ্রেণিকরণ
বৈদিক যুগের শেষে পৌরাণিকযুগে ভারতীয় সঙ্গীতধারায় সঙ্গীতের 'জাতি রাগ'-এর সূচনা হয় । খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে রচিত রামায়ণ সাতটি শুদ্ধজাতির রাগের কথা জানা যায়। একালের রাগের জাতি যে অর্থে মান্য করা হয়, সে অর্থে রামায়ণের জাতি একই কিনা তা জানা যায় না। প্রাথমিকভাবে আমরা ধরে নিতে পারি খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দের দিকে জাতি রাগের সূত্রে রাগের বর্গীয়করণের সূত্রপাত ঘটেছিল। রাগ ও রাগের বর্গীকরণের কালানুক্রমি ধারা নিচে তুলে ধরা হলো।
'"কোন একটি স্থায়ী নিয়ম অবলম্বন করিয়া রাগ-রাগিণীগুলি শ্রেণীবদ্ধ হয় নাই। উহা গ্রন্থাকারগণের স্বেচ্ছাধীন কল্পনা মাত্র। তাঁহারা সুরের মধ্যে প্রবেশ না করিয়া যাহা পাইয়াছেন সমস্ত ষড়ে-সাপ্টায় সংগ্রহ করিয়া গ্রন্থীকৃত করিয়াছেন। স্বরবিন্যাসের প্রকৃতিগত সাদৃশ্যানুসারে রাগ-রাগিনী শ্রেণীবদ্ধ করিয়া যাইলে হিন্দুসঙ্গীতের আরো গৌরব হইত, তাহাতে সন্দেহ নাই।'
রাগ-রাগিণীর শ্রেণি-বিভাজনে নানা মতও ছিল। তবে সকল মতেই রাগের শ্রেণীকরণ করা হয়েছিল পরিবারের আদলে। এত রাগ ছিল গৃহস্বামীর মতো। এর সংখ্যা ছিল ছয়টি। প্রতিটি রাগের ছয়টি করে স্ত্রী ছিল। এদেরকে বলা হতো রাগিণী। সব মিলিয়ে ছয় রাগের স্ত্রী (রাগিণী) সংখ্যা ছিল ৩৬টি। হনুমন্ত মতে অবশ্য রাগের সংখ্যা ছিল ৫টি। এছাড়াও কেউ কেউ এই রাগ-রাগিণীদের পুত্র ও পুত্রবধুদের নিয়ে বিশাল সংসার কল্পনা করেছেন। এই সব রাগ এবং এর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত ছিল। এর ভিতরে চারটি মত অধিক প্রচলিত। এই মতগুলো হলো−  

উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারত মিলে ঠাট বা রাগের যে তালিকা পাওয়া যায়, তার তালিকা দেখুন।
        [দক্ষিণ ভারতীয়: মেল তালিকা (সঙ্গীতকোষ)]
        [ভাতখণ্ডে প্রণীত উত্তরভারতীয় ঠাট: ঠাট (সঙ্গীত কোষ)]


তথ্যসূত্র: