আমড়া
Hog Plum, Wild Mango, Indian Hog Plum
জীববিজ্ঞানের ভিরিডিপ্ল্যান্টে
রাজ্যের
এ্যানাকার্ডিয়াসি
গোত্রের স্পন্ডিয়াস গণের
উদ্ভিদ বিশেষ। এই গাছ আধা-
চিরহরিৎ
বা পর্ণমোচী বৃক্ষ। শুষ্ক ঋতুতে পাতা ঝরিয়ে নতুন পাতা গজায়, যা তাদের ছায়া প্রদানকারী বৈশিষ্ট্যকে আরও আকর্ষণীয় করে।
এই গাছ ওপরের দিকে বেশ বড় ছাতার মতো আকার ধারণ করে। এদের শাখা-প্রশাখাগুলো
বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, যা গাছটিকে একটি বিশাল ও ছায়াযুক্ত অবয়ব দেয়।
- আকার: মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের হয়ে থাকে। প্রজাতিভেদে
এরা প্রায় ১০ - ২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
- কাণ্ড : সাধারণত বেশ শক্ত এবং মোটা হয়।
- বাকল: প্রজাতির কাণ্ডের ছাল
অমসৃণ এবং ধূসর বর্ণের এবং ফাটল ।
- বাট্রেস রুট : প্রজাতি
ভেদে কাণ্ডের গোড়ায় থাকে ,
যা যা গাছকে স্থিতিশীলতা দেয়।
- আঠালো রস: এদের কাণ্ড, পাতা এবং ফলের খোসায় বিশেষ ধরনের রস থাকে।
আমড়া গাছের কাণ্ড কাটলে বের হওয়া স্বচ্ছ আঠালো রস। এই
রস শুকিয়ে কালচে হয়ে যায়।
এই রস সাধারণত স্বচ্ছ এবং আঠালো
হয় এই রসে টারপেনটাইনের মতো গন্ধযুক্ত হয়। এটি অক্সিডাইজ হয়ে কালো হয়ে যেতে পারে। এর রস আঠালো হলেও অধিকাংশ মানুষের ত্বকে অ্যালার্জি বা চুলকানি সৃষ্টি করে না।
এই আঠালো রস বা গাম ঐতিহ্যবাহী ঔষধে ব্যবহৃত হয়- অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণের জন্য।
কোথাও কোথাও আঠা হিসেবে বা বার্নিশ তৈরিতে ব্যবহার হয়।
-
পাতা:
- সজ্জা: একান্তর বা সর্পিলাকারে শাখায় সজ্জিত, প্রায়শই শাখার ডগায় জমায়েত।
আকার: একটি সম্পূর্ণ পাতার দৈর্ঘ্য ২০-৬০ সেমি পর্যন্ত হতে পারে।
- পত্রক সংখ্যা: ৫-১৩ জোড়া (মোট ১১-২৭টি পত্রক), বিপরীত বা উপ-বিপরীত সজ্জিত।
পত্রকের আকৃতি: ডিম্বাকার-আয়তাকার থেকে উপবৃত্তাকার,
- দৈর্ঘ্য : ৫-১৫ সেমি, প্রস্থ ৩-৬ সেমি।
- কিনারা: করাতযুক্ত বা কখনো প্রায় পুরো।
- রঙ ও টেক্সচার: উপরের পৃষ্ঠ গাঢ় সবুজ ও চকচকে, নিচের পৃষ্ঠ হালকা সবুজ। নতুন পাতা লালচে-ব্রোঞ্জ রঙের হয়।
- অন্যান্য: পত্রকে একটি ইন্ট্রামার্জিনাল শিরা থাকে, যা গণের শনাক্তকরণে সাহায্য করে। চূর্ণ করলে হালকা আম-সদৃশ গন্ধ বের হয়।
-
ফুল:
- আকার: আমড়া গাছের ফুল আকারে খুব ছোট (৩-৫ মিমি ব্যাস)
- রঙ: সাদা বা হালকা সবুজাভ-সাদা রঙের।
- সজ্জা: ফুলগুলো প্যানিকল আকারের বড়
গুচ্ছে (২০-৪০ সেমি লম্বা) সজ্জিত থাকে । ফুলগুলো শাখার ডগায় বা অ্যাক্সিলারি অবস্থানে ফোটে।
সাধারণ বাংলাদেশ ও ভারতে ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল মাসে
প্রধানত ফুল ফোটে।
- প্রস্ফুটনের সময়: সাধারণত পাতা ঝরার পর বা নতুন পাতার সাথে (শীতের শেষে বা বসন্তে) ফুল ফোটে।
- বিন্যাস: ক্যালিক্স ৪-৫ লোবযুক্ত, পেটাল ৪-৫টি (সাদা, ডিম্বাকার), স্টেমেন ৮-১০টি, ওভারি ৪-৫ সেলযুক্ত।
- বহুযৌন: একই গাছে বা একই গুচ্ছে পুরুষ
এবং স্ত্রী ফুল মিশ্রিত থাকে।
- গন্ধ ও পরাগায়ন: সাধারণত সুগন্ধহীন বা হালকা গন্ধযুক্ত ।
মৌমাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় দ্বারা পরাগায়িত হয়।
-
ফল:
আমড়া ফল মূলত 'ডুপ' বা অশ্মল ধরনের
হয় ।
গাছে গুচ্ছাকারে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।
- আকার ও আকৃতি: ৪-৮ সেমি লম্বা, ডিম্বাকার বা আয়তাকার, আমের মতো দেখতে কিন্তু ছোট।
- রঙ: কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে হলুদ বা হলুদাভ-কমলা। কিছু জাতে হালকা লালচে আভা।
- বাইরের
অংশ: পাতলা, মসৃণ বা সামান্য রুক্ষ, সবুজ থেকে হলুদ/কমলা/লাল/বেগুনি
রঙের হয়ে পাকে।
- মাঝের অংশ: রসালো, মাংসল, ফাইব্রাস (তন্তুযুক্ত), টক থেকে মিষ্টি-টক স্বাদযুক্ত, খাওয়ার যোগ্য অংশ।
- ভিতরের অংশ: শক্ত, কাঠের মতো বড় অশ্ম বা স্টোন যার ভেতরে ১-৫টি বীজ থাকে। এই শক্ত অশ্মটি ফাইব্রাস বা কাঁটাযুক্ত হতে পারে (প্রজাতিভেদে)।
পুষ্টিগুণ: এদের পাকলে সুগন্ধযুক্ত, ভিটামিন
সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবারে সমৃদ্ধ।
স্বাদ: কাঁচা অবস্থায় টক, পাকলে মিষ্টি হয়।
ব্যবহার: আচার, জুস, জ্যাম বা কাঁচা খাওয়া হয়।
-
বীজ ও বীজাধার:
- ফলের বহিরাবরণ: কাঠের মতো শক্ত, যাকে সাধারণত স্টোন বা পিট বলা হয়। এটি বীজকে পুরোপুরি ঘিরে রক্ষা করে।
- বীজাধার: সাধারণত ১-৫টি (প্রজাতিভেদে), প্রতিটি বীজাধারে একটি করে বীজ থাকে।
- অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য: বহিরাবরণের বাইরের পৃষ্ঠে জটিল তন্তুময় জালিকা থাকে, যা রসালো মেসোকার্পের সাথে আঁটকে থাকে। এটি বীজের সুরক্ষায় সাহায্য করে।
- অঙ্কুরোদগম: অঙ্কুরোদগমের সময় বহিরাবরণ খুলে যায় এবং মূলাঙ্কুর বের হয়ে
আসে।
ক্রমবিবর্তন
এ্যানাকার্ডিয়াস:
গোত্র টি
আবির্ভুত হয়েছিল ৯ থেকে
৮ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। ৭ থেকে ৬.৫ কোটি
খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে এই গোত্রটি দুটি উপগোত্রে বিভাজিত হয়ে যায়। এই উপগোত্র হলো-
-
এ্যানাকার্ডিওয়াইডিয়াইডি। আবির্ভাবকাল ৭ থেকে ৬.৫ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আম, কাজুবাদাম ও পেস্তা বাদাম এই উপ-গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।
-
স্পন্ডিওয়াইডি।
আবির্ভাবকাল ৬ থেকে ৫.৫ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আমড়া জাতীয় উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত উপগোত্র ।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে এই উপগোত্রের প্রাচীন জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হয় যে ইওসিন যুগে এরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই গোত্রের স্পন্ডিয়াস গণের
আবির্ভাব হয় ৪.৫ থেকে ৪ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে। এই
স্পন্ডিয়াস
গণ থেকেই উদ্ভব হয়েছে আমড়া গাছ।