প্রিক্যাম্বরিয়ান পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়
দ্বিতীয় ভাগ
প্যালেয়োর্কিয়ান যুগের কথা
৩৬০-৩২০ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ
আর্কিয়ান কালের দ্বিতীয় যুগ। Palaios শব্দের অর্থ প্রাচীন। এই শব্দ থেকে এই যুগের নামকরণ করা হয়েছে। এই যুগকে বলা যায় ক্র্যাটনের সুস্থির যুগ। পূর্বর্তী ইয়ো-আর্কিয়ান যুগের অধিকাংশ ক্র্যাটনের আদি ভিত্তিভূমি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই ক্র্যাটনগুলোই জোড়া লেগে তৈরি হয়েছিল বৃহদাকারের মহাদেশীয় ভূ-পাত। এই কারণে মহাদেশ সৃষ্টির প্রাথমিক যুগ হিসেবেও একে চিহ্নিত করা যায়। কারণ এই যুগেই সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম মহামহাদেশ ভাল্বারা। এছাড়া নতুন কিছু ক্র্যাটন সৃষ্টি হয়েছিল এই যুগে। এই যুগে জীবজগতে ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার ক্রমবিবর্তনের ধারায় জীবজগতে নতুন নতুন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছিল।
জড়
জগতের কথা
গত যুগে
ক্র্যাটন তৈরি শুরু হয়েছিল। এই ধারা এই যুগেও সচল ছিল। একালের পৃথিবীর মহাদেশীয়
অবস্থান অনুসারে যদি ক্র্যাটনগুলোকে সাজানো যায়, তাহলে দেখা যায়, এসকল ক্র্যাটনসমূহ
সব সময় একই জায়গায় ছিল না। পরিচয়ের সুবিধার জন্য যদি একালের মহাদেশীয় বা উপমহাদেশীয়
অবস্থানের বিচারে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
৩৬০-৩৪০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ: গত
ইয়ো-আর্কিয়ান যুগে
সৃষ্ট ক্র্যাটনগুলো সুস্থির দশায় পৌঁছেছিল। বিশেষ করে
কঙ্গো ক্র্যাটন,
পশ্চিম আফ্রিকান ক্র্যাটন,
জিম্বাবুয়ে
ক্র্যাটন
বৃহদাকার ভূখণ্ড সৃষ্টির পথে সচল হয়ে উঠেছিল। এর ভিতরে
৩৪৬
কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে
জিম্বাবুয়ে ক্র্যাটনের
ভিত্তিভূমি দুটি পৃথ্ক অংশের উপর গড়ে উঠেছিল।
এই অংশ দুটি ছিল টোকুয়ে এবং ক্ষুদ্রাকার র্হডেস্ডালে ভূখণ্ড।
![]() |
|
ভাল্বারা মহাদেশ |
আগের ইয়ো-আর্কিয়ান যুগের ৩৭০-৩৬০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সৃষ্টি হয়েছিল কাপ্ভাল ক্র্যাটনের
এই যুগের কালানুক্রমিক জীবজগতের বিবর্তনসমূহ
ইয়ো-আর্কিয়ান কালে
প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক
কোষ ভিত্তিক ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার উদ্ভব হয়েছিল।
এই সূত্রে যুগের জীবজগতের প্রজাতিসমূহের যে বিবর্তন ঘটেছিল, তার ধারা অনুসরণ করার
চেষ্টা করবো।
![]() |
|
আর্কিব্যাক্টেরিয়ার (Pyrococcus Abyssi) প্রাচীনতম নমুনা পাওয়া গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Yellowstone National Park.-এ |
৩৬০-৩৫০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ:
আদিম ব্যাক্টেরিয়ার পাশপাশি
একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি হয়েছিল।
মূলত
প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ-ভিত্তিক
আদি জীবকণিকা থেকে উদ্ভব
হয়েছিল আর্কিয়া জীবস্বক্ষেত্রের প্রজাতিসমূহ। এই বিভাজনের মধ্য দিয়ে দুটি আদি
স্বক্ষেত্র পৃথক হয়ে গিয়েছিল। এই বিচারে জীবের শ্রেণিকরণের রূপটি দাঁড়ায়-
ব্যাক্টেরিয়া এবং
আর্কিয়া। জীববিজ্ঞানের শ্রেণিকরণে এই দুই জাতীয় জীবকে জীব-স্বক্ষেত্র (Domain)
বলা হয়। আদিম আর্কিয়া স্বক্ষেত্রভিত্তিক প্রজাতিগুলোর
বৈশিষ্ট্য ব্যাক্টেরিয়ার এত কাছাকাছি ছিল যে, এদেরকে একীভূত করে নাম দিয়েছিলেন
আর্কেব্যাক্টেরিয়া। মূলত
বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে
ব্যাক্টেরিয়া
এবং
আর্কেব্যাক্টেরিয়া
মধ্যে কোনো পার্থক্য স্পষ্ট
ছিল না। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে Carl Woese
এবং
George Fox
উভয় জীবকণিকার পার্থক্য নিরূপণ করে
আর্কেব্যাক্টেরিয়াকে পৃথকভাবে
চিহ্নিত করতে সমর্থ হন। উল্লেখ্য
আর্কেব্যাক্টেরিয়ার প্রাচীনতম নমুনা পাওয়া
গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Yellowstone National Park.-এ।
এই বিজ্ঞানীদ্বয় কিছু জীবকণিকা প্রাপ্তির সূত্রে
আর্কিয়া
এবং
ব্যাক্টেরিয়া ডোমেইন
হিসেবে ভাগ করেন।
আরকিয়ার প্রজাতিসমূহ নানা ধরনের পরিবেশে পাওয়া যায়। গভীর সমুদ্রের তলদেশে,
আগ্নেয়গিরির মুখে, ফুটন্ত ঝরণা, অতি অম্লীয় পরিবেশে এদের পাওয়া যায়। হোমো গণের
পরিপাকতন্ত্রে এমন কিছু আর্কিয়া আছে, যেগুলো মিথেন গ্যাস তৈরি করে। পরিবেশের উপর
ভিত্তিক করে বর্তমানে আর্কিয়াগুলো চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগগুলো হলো-
লবণাক্ত পরিবেশ (halophile): এরা লবণাক্ত পরিবেশে বাস করে। এদের পাওয়া যায় লবণাক্ত হ্রদে।
উচ্চতাপীয় পরিবেশ (thermophile): এর উচ্চ তাপমাত্রাযুক্ত স্থানে বাস করে। এরা ৪৫ °সে (১১৩ °ফা) এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। এদের কিছু প্রজাতি ৮০ °সে (১৭৬ °ফা) এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় বাস করে। এদের অবশ্য অতি-উচ্চতাপীয় (hyperthermophilic) শ্রেণিতে ফেলা হয়। এদের কিছু প্রজাতি ১২২ °সে (২৫২ °ফা) এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় বসবাস করতে পারে।
ক্ষারীয় পরিবেশ (alkaliphile): এরা ক্ষারীয় পরিবেশে বাস করে। সাধারণত যে কোনো ক্ষারীয় পরিবেশে এরা বাস করে।
অম্লীয় পরিবেশে (acidophile): এরা অম্লীয় পরিবেশে বাস করে। এরা উচ্চ অম্লীয় পরিবেশে থাকে। Picrophilus torridus প্রজাতিটি ১.২ মোলার সালফিউরিক এসিড এর সমতুল্য পরিবেশে বেশ স্বচ্ছন্দেই টিকে থাকে।
এদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের বিচারে কয়েকটিভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-
মিথেনোজেনাস (methanogens) : এই জাতীয় আর্কিব্যাক্টেরিয়া পাওয়া যায় জলাভূমিতে ও আর্দ্র স্থানে। এরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে কিন্তু মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে।
হ্যালো-ব্যাক্টেরিয়া (halobacteria) : এরা উচ্চ লবণাক্ত পরিবেশে বসবাস করে। এরা আলো থেকে শক্তিগ্রহণ করতে পারে। সাধারণ সবুজ উদ্ভিদ যেভাবে সালোকসংশ্লেষণ করে, এদের আলো থেকে শক্তিগ্রহণের প্রক্রিয়াটি তেমন নয়।
চরম থার্মোফিলিস (extreme thermophiles): এরা অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিবেশে বসবাস করে। এছাড়া এরা অতি অম্লীয় পরিবেশেও স্বচ্ছন্দে থাকতে পারে। এদের কোষ প্রাচীরে peptidoglycan থাকে না। অনেক আর্কিব্যাক্টেরিয়া গন্ধক সমৃদ্ধ এলাকায় থাকে। এই কারণে আগ্নেয়গিরির জ্বালমুখে এদের পাওয়া যায়। অনেক ব্যাক্টেরিয়া গন্ধককে শারীরিক বিপাকে ব্যবহার করে এবং সালফিউরিক এ্যাসিড উৎপন্ন করে।
এই যুগের জড়জগতের অন্যতম বিষয় ছিল পৃথিবীর প্রথম মহা-মহাদেশ 'ভাল্বারা'র উদ্ভব। পার্থিব বড় ধরনের আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। তা হলো পিল্বারা ক্র্যাটন অঞ্চলের এই রুক্ষ প্রান্তরে হঠাৎ আঘাত হেনেছিল ছিটকে পড়া অন্তত চারটি কার্বন-সমৃদ্ধ গ্রহাণু। আর জীবজগতে আবির্ভুত আর্কিয়া বা আর্কেব্যাক্টেরিয়া। বিবর্তনের এই ধারার ভিতরে দিয়ে এই যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। পরবর্তী অধ্যায়ে আমার এই বিবর্তনের নতুন ধারার সাথে পরিচিত হব।
সূত্র :