প্রিক্যাম্বরিয়ান পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম ভাগ
ইয়ো-আর্কিয়ান যুগের
কথা
৪০০-৩৬০ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ
হেডিন কালের শেষে এই শুরু হয়েছিল আর্কিয়ান কাল। আর এই কালের প্রথম ভাগ হলো ইয়ো-আর্কিয়ান যুগ। গ্রিক eos অর্থ ঊষা আর archaios অর্থ প্রাচীন। দুইয়ে মিলে এর অর্থ দাঁড়ায় 'প্রাচীন যুগের ঊষাকাল'। এর পূর্ব্র্তী হেডিন কালে (৪৬০-৪০০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডল গঠনের কাজ শুরু হয়েছিল। এই যুগে এই গঠনের কাজ শেষ হয়েছিল। এই যুগের ভূত্বক জমাট বেধে তৈরি হয়েছিল আদিম ক্র্যাটন ও ঢালভূখণ্ড। যা পরব্র্তী সময়ে মহাদেশ ও মহামহাদেশ তৈরির পথকে সুগম করে তুলেছিল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নানা ধরনের গ্যাসীয় উপকরণ যুক্ত হয়েছিল এই সময়ে। এই কালের আগে পৃথিবীর ভূত্বকের উপর দিয়ে যে উত্তপ্ত বায়ু প্রবাহ হতো, তার তাপমাত্রা ছিল বর্তমান পৃথিবীর তাপমাত্রার ৩ গুণেরও বেশি। এই যুগের শুরুর দিকে মহাসাগর-সাগরগুলোর তরল পদার্থের সিংহভাগ দখল করে নিয়েছিল নানা যৌগিক পদার্থ মিশ্রিত জলরাশি এবং এই সাগরের পানিতেই সূচনা ঘটেছিল আদি প্রাণের। তৈরি হয়েছিল প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ, ভাইরাস এবং ব্যাক্টেরিয়া। সায়ানোব্যাক্টেরিয়ার সূত্রে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে গিয়ে পৃথিবী শীতল হয়ে উঠেছিল। এই সূত্রে পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল প্রথম বরফযুগ।
জড় জগতের কথা
৪০০ থেকে ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ: এই সময়ে ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীর উপরিতলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর ফলে ভূ-গোলকের উপরিতলের ম্যাগ্মা অপেক্ষাকৃত কম ঘন ছিল এবং ভূত্বকও বেশ পাতলা ছিল। এর ফলে সে সময়ের প্রায় অখণ্ড জলরাশির তলদেশের শীতলতা, তরল ম্যাগ্মাকে দ্রুত শীতল করে আগ্নেয়শিলাস্তরের পুরুত্ব বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু পৃথিবীর জলাশয়ের বাইরের পাতলা ভূত্বকের উপরিতলের আবরণের নিচের ম্যাগ্মা যথেষ্ঠ কঠিন না হয়ে উঠায়, সেখান থেকে উৎপন্ন গ্যাস প্রবল ভাবে ভূত্বকে চাপের সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ বেলুনের মতো ফুলে উঠেছিল। আবার ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ ফেটে গিয়ে লাভা স্রোত সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভূত্বকের কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছিল উঁচু-নিচু ভূখণ্ড। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয় দ্বীপ। সে সময়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আগ্নেয়-দ্বীপগুলো বার বার প্লাবিত হয়েছে লাভাস্রোতে। অগ্ন্যুৎপাতঘটিত ছাই ভস্মের অধঃক্ষেপের কারণে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আগ্নেয়-দ্বীপগুলো জোড়া লেগে লেগে বড় বড় ভূখণ্ড তৈরি করেছিল।
তবে এর ভিতরেও চলছিল ভাঙাচোরার খেলা। নিচের তরল ম্যাগমার চাপে, উপরে ভাসমান ভূখণ্ডগুলো পরস্পরের ধাক্কায় ভেঙে পড়ছিল অবিরত। আবার নিচের তরল ম্যাগমার প্রবাহে ভূ-ভগ্নাংশগুলো ভাসতে ভাসতে যুক্ত হয়ে বড় ভূখণ্ডের ভিত্তি তৈরিও করছিল। প্রথম দিকের এই ভূখণ্ডগুলোর পুরুত্ব বেশি ছিল না। তবে এদের নিচের তরল পাথর ক্রমাগত তাপ হারিয়ে কঠিনতর হয়ে উঠছিল। এই সূত্রে ভূখণ্ডগুলো ভারি হয়ে উঠার পাশাপশি, নিচের তরল পাথরের সমুদ্রের প্রোথিত হচ্ছিল। এ সকল প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে নানাভাবে ভূখণ্ডগুলো সুদৃঢ় হয়ে উঠছিল। এরই মধ্য দিয়ে কিছু বড় বড় ভূখণ্ডের উদ্ভব হয়েছিল। ভূবিজ্ঞানীরা এই সুদৃঢ় বিশাল ভূখণ্ডগুলোকে ক্র্যাটন নামে অভিহিত করে থাকেন।
এই পরিবেশে সে সময়ের ক্র্যাটনগুলো আদিম দশায় ছিল। পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে এদের ভিতর ক্রমাগত ঠোকাঠুকি চলছিল। পরস্পরের দিকে অবিরাম ধাক্কা এবং চাপ সৃষ্টির কারণে, ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ক্র্যাটনগুলোর সীমানা বরাবর উঁচু উঁচু টিলা তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল। ৩৯৬-৩৯৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ছোটো ছোটো টিলাগুলো বিশাল পর্বতমালায় রূপ লাভ করেছিল। ধারণা করা হয়, এগুলোর কোনো কোনোটির উচ্চতা বর্তমান পৃথিবীর যে কোনো পর্বতশৃঙ্গের চেয়ে উঁচু ছিল। কালক্রমে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, বরফযুগের প্রভাবে এ সকল উচ্চতর শৃঙ্গ ভেঙে পড়েছিল। ভূবিজ্ঞানীর এই জাতীয় পর্বতমালাগুলোকে বলে থাকেন গিরিজনি। এ সময়ে ক্র্যাটনের চলমান দশায় অনেক পাহাড় ভূগর্ভে প্রোথিত হয়ে উচ্চতা হারিয়েছিল।
ভূত্বকে যখন এই ভাঙা-গড়ার খেলা চলছিল, তখন বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত হচ্ছিল গ্যাসীয় নানা উপকরণ। এই সময়ের বাতাসে যুক্ত হয়েছিল জলীয় বাস্প (H2O), হাইড্রোক্লোরিক এ্যাসিড (HCl), কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2), কার্বন মনো-অক্সাইড (CO), নাইট্রোজেন (N2) ইত্যাদির মতো গ্যাসীয় উপকরণ। পরবর্তী সময়ে এদের ভিতর রাসায়নিক বিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল মিথেন (CH4) এ্যামোনিয়া (NH3) এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইড (HCN) জাতীয় যৌগ পদার্থ। এই সময় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম ছিল।৩৯৬-৩৯৩ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ: এই গ্যাসীয় উপকরণের প্রাবল্যে ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ঘন মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল। একে বলা যায় অন্তঃহীন মেঘ। এই মেঘ পৃথিবীকে এতটা নিবিড়ভাবে ঢেকে ফেলেছিল যে, সে মেঘকে ভেদ করে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছাত না। এরপর এলো মহাবর্ষণ। এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম মহাপ্লাবন। বিপুল পরিমাণ জলের চাপ, এবং ভূত্বকে সৃষ্ট বিশাল কঠিন অংশের চাপ সহ্য করতে না পেরে, পৃথিবীর কোনো কোনো অংশের উপরিতল গভীরভাবে বসে গিয়েছিল। আর এ সকল গভীর খাদের শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছিল বৃষ্টিজাত শীতল তরল পদার্থ। এই তরল পদার্থের প্রধান উপাদান পানি হলেও- এতে মিশেছিল নানা পদার্থ। এই মিশ্র জলরাশি যখন প্রবল বেগে ভূভাগের উপরিতলের খাদের দিকে প্রবাহিত হয়েছিল- তখন তার সাথে যুক্ত হয়েছিল আরও বহু পদার্থ। এই জলপ্রবাহের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল অসংখ্য নদী। যদিও সে কালের আদিম নদীগুলো পরবর্তী সময়ে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এই সব নদীর দ্বারা প্রবাহিত জলরাশি খাদগুলোতে জমে তৈরি করেছিল অসংখ্য হ্রদ। ধীরে ধীরে এই হ্রদগুলো যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর আদি সমুদ্র।
কানাডিয়ান ঢাল-ভূখণ্ডের আদি ক্র্যাটনসমূহ
৩৯৫-৩৯৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ভূত্বকের ক্রমবিবর্তনর ধারায় কানাডিয়ান ঢাল-ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে এই ঢাল-ভূখণ্ড কিছুটা সুস্থির এবং সুদৃঢ় দশায় পৌঁছেছিল এবং একই সাথে এর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াও সক্রিয় ছিল। এই সময়ের ভিতরে এর বিস্তার ঘটেছিল কুইবেকের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্ব প্রান্তের হাডসন উপসাগর পর্যন্ত। আবার দক্ষিণ দিকে অন্টারিও-এর উত্তরাঞ্চল থেকে হুরোন হ্রদের উত্তর তীরবর্তী অঞ্চল থেকে সুপিরিয়র হ্রদ পর্যন্ত। আবার অন্টারিও-এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে মানিটিবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছিল। এছাড়া মিন্নেসোটার পশ্চিমাঞ্চল থেকে ডাকোটার উত্তর দক্ষিণ বরাবর এর বিস্তার ঘটেছিল। উল্লেখ্য, কানাডিয়ান ঢালভূখণ্ড গঠিত হয়েছিল ছয়টি ক্র্যাটন ক্র্যাটন নিয়ে। এই ক্র্যাটনগুলো হলো- ওয়াইয়োমিং, নাইন, রেই, সুপিরিয়র, স্ল্যাভ ও হেয়ার্ন।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ফেন্নোস্ক্যান্ডিয়া (Fennoscandia): ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ফিনল্যাণ্ডের বিজ্ঞানী এর নামকরণ করেন। তিনি ল্যাটিন Fennia (Finland) এবং Scandia (Scandinavia) নিয়ে এই নামটি গ্রহণ করেছিলেন। এই অঞ্চলের ভিতরে রয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপসাগর, ফিনল্যান্ড, কারেলিয়া এবং কোলা পেনিনসুলা। এছাড়া ফিনল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেন এই অঞ্চলের ভিতরে ধরা হয়। এই ভূসংগঠনের মধ্য দিয়ে ফেন্নোস্ক্যান্ডিয়ান পাত হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং এক সময় তা পূর্ব ইউরোপীয় ক্র্যাটনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
৩৮০-৩৭০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ: এই সময়ের
ভিতরে ছোটো ছোটো ক্র্যাটন ও ঢাল-ভূখণ্ড মিলিত হয়ে প্রথম মহাদেশীয় ক্র্যাটনের
সৃষ্টির প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল । এই সময়ের ভিতরে ইউক্রেইন
ঢাল-ভূখণ্ড এবং
ভোরোনেঝ মাসিফ সংযুক্ত অবস্থায়
পূর্ব ইউরোপীয় ক্র্যাটনের আদি রূপ লাভ করেছিল। এই নতুন রূপ লাভের সূত্রে
ইউক্রেইন ঢাল-ভূখণ্ড এবং
ভোরোনেঝ মাসিফের প্রাচীন পাথরগুলো
ভূত্বকের আরো গভীরে প্রবেশ করেছিল।
পশ্চিম গ্রিনল্যাণ্ডের আদি পাললিক শিলা
উৎপন্ন হয়েছিল এই সময়। এছাড়া ভাল্বারা মহা-মহাদেশের
কাপ্ভাল ক্র্যাটন উৎপন্নও হয়েছিল এই
সময়। উল্লেখ্য, এর আয়তন ছিল প্রায় ১২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এই ক্র্যাটন
দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত।
জড় থেকে
জীবনের প্রকাশ
আগের হেডিনকালের শেষে অর্থাৎ ৪০০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে
সাগরজলে তৈরি হয়েছিল, রাইবোজ, ডিঅক্সিরাইবোজ, নাইট্রোজেন ক্ষার, ফসফরিক এ্যাসিড ও
এ্যামিনো এ্যাসিড। এই সূত্রে এই যুগে তৈরি হয়েছিল,
নানা ধরনের প্রোটিন,
উৎসেচক
আরএনএ, ডিএনএ।
|
নাইট্রোজেন ক্ষার |
রাইবোনিউক্লোসাইড |
ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওসাইড |
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
নিউক্লিওসাইডগুলো তৈরি হওয়ার পর, এর সাথে
ফসফরিক এ্যাসিড যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছিল নিউক্লিওটাইড।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিউক্লিক এ্যাসিড গঠনের একটি দশা সম্পন্ন হয়েছিল।
নিউক্লিক এ্যাসিডের বিদ্যমান
পেন্টোজ
কার্বোহাইড্রেডের সদস্য এবং এর সাথে যুক্ত নাইট্রোজেন ক্ষারের সদস্যদের
অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল আরএনএ এবং ডিএনএ। যেমন-
আরএনএ-এর ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে থাকে পেন্টোজ কার্বোহাইড্রেড-এর রাইবোজ। আর নাইট্রোজেন ক্ষার হিসেবে থাকে এ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও ইউরাসিল।
ডিএনএ-র ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে থাকে পেন্টোজ কার্বোহাইড্রেড-এর ডিঅক্সিরাইবোজ। আর নাইট্রোজেন ক্ষার হিসেবে থাকে এ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন ও থাইমিন।
হেডিন কালের শেষের দিকে এই জাতীয় সরল এ্যামিনো এ্যাসিড তৈরি হয়েছিল প্রচুর পরিমাণে। কিন্তু এই এ্যাসিডগুলো দীর্ঘ দিন স্বাধীনভাবে থাকতে পারে নি। সে সময়ের সমুদ্রজলের তাপ, অতি-বেগুনি রশ্মি ছাড়াও নানা ধরনের মহাজাগতিক রশ্মি, উপযুক্ত তাপ, বায়ুমণ্ডলের চাপ ইত্যাদি মিলে এ্যাসিডগুলোর ভিতরে নতুন রাসায়নিক আসক্তির জন্ম দিয়েছিল। এর ফলে এ্যামিনো এ্যাসিডগুলো পরস্পরের সাথে মিলিত হওয়া শুরু করেছিল। প্রাথমিকভাবে দুটি এ্যামিনো এ্যাসিডের মিলনে তৈরি হয়েছিল যে দীর্ঘ অণু, বিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন ডিপেপটাইড। যেমন গ্লাইসিন নামক এমিনো এ্যাসিড মিলিত হয়ে তৈরি হয়েছিল গ্লাইসিলগ্লাসিন (Glycylglycine)। এরূপ নানা ধরনের পেপটাইড তৈরি হয়েছিল সে সময়ে। যেমন-
| R | যুক্ত উপাদান | সংকেত | নাম |
| H- | হাইড্রোজেন |
![]() |
গ্লাইসিন |
| CH3- | মিথাইল |
![]() |
এ্যালানিন |
| (CH3)2-CH | আইসোপ্রপাইল |
![]() |
ভ্যালিন |
| HO-CH2 | হাইড্রোক্সি মিথাইল |
![]() |
সেরাইন |
সাধারণত ৫০টিরও বেশি
এ্যামিনো এ্যাসিড আব্দ্ধ হয়ে যে পলিপেপটাইড অণু তৈরি হয়, তাকে জৈব রসায়নে
প্রোটিন নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত এ্যামিনো এ্যাসিড সরল শৃঙ্খল হিসেবে
বিরাজ করে। কিন্তু প্রোটিনে একাধিক পলি-এ্যামিনো
এ্যাসিড শিকল একটি বিশেষবন্ধনের দ্বারা সমান্তরালভাবে বিরাজ করে। ফলে
শৃঙ্খলাবদ্ধ এ্যামিনো এ্যাসিডগুলো কিছু বিশেষ গুণের অধিকারী হয়ে যায়। এই কারণে
প্রোটিনের ধর্ম এ্যামিনো এ্যাসিডের সাধারণ ধর্মকে অতিক্রম করে। এই কারণে
প্রোটিনকে একটি পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই জটিল অণুগুলোর ভিতর ছিল
বংশগত তথ্য সংরক্ষণ করা ও সুনির্দিষ্ট প্রোটিন অণু তৈরি করার ক্ষমতা। রাসায়নিক আসক্তির সূত্রে এই এ্যাসিডগুলো গড়ে তুলেছিল
আরএনএ
[ribonucleic acid (RNA)]
।
ডিএনএ
মেরুদণ্ড:
এই অংশটি ডিএনএর দুটি প্রান্তে সুতার মতো থাকে। এর মূল উপাদান হলো চিনি এবং
ফসফেট ভিত্তিক দীর্ঘ অণু। একে অনেক সময় ডিএনএ সূত্র বলা হয়। এর মূল উপাদান হলো
চিনি
ডিঅক্সিরাইবোজ (C5H10O4)।
ভিত্তি: দুটি ক্ষারের সমন্বয়ে গঠিত দীর্ঘাকার অণু ডিএন-এর ভিত্তি। এই কারণে একে বলা হয় জোড়া ভিত্তি
A= adenine (এডেনিন, C5H5N5)
G =guanine (গুয়ানিন
C=cytosine (সাইটোসিন
T=thymine (থাইমিন
একটি শিকলের ভিত্তি বা
(Base)- এর নির্দিষ্ট অবস্থানের হাইড্রোজেন পরমাণুটি পজিটিভ চার্জ ধারণ করে। আবার অন্য শিকলের নির্দিষ্ট অবস্থানের অক্সিজেন অথবা নাইট্রোজেন পরমাণুটি নিগেটিভ চার্জ ধারণ করে থাকে। তখন এই দুই বিপরীত মুখী চার্জের মধ্যে আকর্ষণের ফলে উভয় শিকল বাধা পড়ে যায়। এক্ষেত্রে দুর্বল হাইড্রোজেন-বন্ধন কাজ করে। এই কারণে কোষ বিভাজনের সময় সহজেই দুটি শিকল পৃথক হতে পারে।নিউক্লিওসাইড: কোনো ক্ষার যখন
নিউক্লিওটাইড : কোনো ক্ষার যখন ডিএনএ সূত্রের একটি কার্বোহাইড্রেডে ও এক বা একাধিক ফসফেট অণুর সাথে যুক্ত থাকে, তখন তাকে বলে নিউক্লিওটাইড।
ডিঅক্সিরাইবোজ ফসফেট
গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে পাশাপাশি
ডিঅক্সিরাইবোজ -এর মধ্যে
তৃতীয় ও পঞ্চম কার্বন পরমাণুর স্থানে ফসফোডিয়েসটার বন্ধন গঠন করে। এই অপ্রতিসম
বন্ধন বোঝায় যে ডিএনএ অণুর মেরু বা দিক আছে। দ্বৈত হেলিক্সে এক সূত্রের
নিউক্লিওটাইডের দিক অন্য সূত্রের ঠিক বিপরীত দিকে থাকে। ডিএনএ সূত্রের এই ধরনের
বিন্যাসকে প্রতিসমান্তরাল বলে। ডিএনএর অপ্রতিসম প্রান্তকে বলে ৫’ (ফাইভ প্রাইম) এবং
৩’ (থ্রি প্রাইম) প্রান্ত। ডিএনএ ও আরএনএর মধ্যকার একটি প্রধান পার্থক্য হলো- ডিএনএতে ২-ডিঅক্সিরাইবোজ ব্যবহৃত হয়, সেখানে আরএনএতে
একটি রাইবোজ ব্যবহৃত হয়।
পূর্বেই বলেছি বিভিন্ন উৎসেচক ডিএন-তে কার্যকরী ভূমিকা রেখে তথ্য নকল করে এবং
আরো বহু ডিএনএ তৈরি করে। তার অর্থ হলো- এই সময়ের ভিতরে সৃষ্টি হয়েছিল উৎসেচক।
তিনটি ভিত্তি মিলে তৈরি হয় একটি ক্ষুদ্র একক। একে বলা হয় কোডন। যেমন একটি
ATG
(adenine,
thymine,
cytosine)
কোডন হতে পারে। প্রতিটি কোডন মূলত একটি
এ্যামিনো এ্যাসিড তৈরি করে। আর প্রায় হাজার খানেক কোডন মিলে তৈরি হয় একটি একটি
দীর্ঘ
এ্যামিনো এ্যাসিডের পলিমার।
সাধারণভাবে এদেরকে বলা হয়
প্রোটিন। জিনবিদ্যায় এই হাজার খানেক কোডনের পলিমারের সংকলন হলো জিন
(GENE)।
সংকলন বলছি এ জন্য যে, হাজার খানেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে জীবের
অঙ্গানুসমূহের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। ধরা যাক, মানুষের চুলের কথা। চুলের রং, ব্যাস,
দৈর্ঘ্য ইত্যাদির বৈশিষ্ট্য বহন করবে হাজার খানেক কোডন। এই কারণেই বলা হয়-
জিনই প্রজাতির মৌলিক গুণাগুণ ধারণ করে।
এর বাকি অংশ বংশগতির সংকেতকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির বংশগতির সংকেত একটি
সুদৃঢ় প্যাকেটের মতো থাকে। একে জীববিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ক্রোমোজোম (Chromosome)।
এই প্যাকেট সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে হিস্টোন
(Histone) নামক
এক ধরনের বিশেষ প্রোটিন। প্রতিটি প্রজাতির ক্রোমোজোম নির্দিষ্ট
সংখ্যায় থাকে। যেমন হোমো স্যাপিয়েন্স তথা মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৩ জোড়া।
মানুষের শরীরের প্রত্যেকটি কোষের প্রাণকেন্দ্রের ভিতর প্রায় ৩০০ কোটি বেজ
পেয়ারযুক্ত ডিএনএ কুণ্ডলিত আকারে সংরক্ষিত রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিটার।
ডিএন-এর মধ্যে রক্ষিত বংশগতির সঙ্কেত অনুসারে প্রতিটি প্রজাতি প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে টিকে থাকার পথ খুঁজে পায়। এক্ষেত্রে এই সঙ্কেত যথাসম্ভব পরিবেশ উপযোগী শারীরীক পরিবর্তন ঘটায়। দীর্ঘদিন ধরে এই শারীরীক পরিবর্তন যদি ধরে রাখতে হয়, তাহলে প্রজাতির ডিএন-এর ভিতর তা লিখিত হয়ে যায়। প্রজাতির এই সূক্ষ্ম শারীরীক পরিবর্তনের সূত্রে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটে। বিষয়টি বংশ পরম্পরায় চলতে চলতে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। প্রথমদিকের প্রজন্মের সাথে আদি প্রজন্মের এই পার্থক্য ধরা পড়ে না। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে দুটি পৃথক প্রজাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কোনো প্রজাতি যদি এই বংশগতির সংকেত বংশধরদের পাঠাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নবজাতক মৃত্যুবরণ করে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে, এক সময় পুরো প্রজাতিটিই বিলুপ্ত হয়ে যায়।
![]() |
|
এ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) |
এই কারণে এই সময়ে বাতাসে অক্সিজেন পরিমাণ বৃদ্ধি
পায় নি। কিন্তু উৎপন্ন শর্করাকে শক্তিতে পরিণত করার জন্য জীবদেহে শ্বসন
প্রক্রিয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে এই যুগে
জীবদেহে ঘটেছিল অবাত শ্বসন। মূলত এই অবাত শ্বসনের
দ্বারাই ব্যাক্টেরিয়া শর্করা থেকে শক্তি অর্জন করতো। জীববিজ্ঞানীরা এই অবাত
শ্বসনের প্রক্রিয়াকে বলে থাকেন গ্লাইকোলাইসিস
(Glycolysis)। এই
প্রক্রিয়াটি ঘটতো কয়েকটি ধাপে। এদের দেহের
Adenosine triphosphate (ATP)
হয়ে উঠেছিল জীবদেহের শক্তির উৎস।
ধাপগুলো হলো-
এই ধাপে ব্যাক্টেরিয়া তার কোষস্থ হেক্সোকাইনেজ উৎসেচকের মাধ্যমে
ATP
থেকে ফসফেট
গ্রহণ করে গ্লুকোজ-৬-ফসফেট তৈরি করতো।
উল্লিখিত
প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মূলত
গ্লাইকোলাইসিস সম্পন্ন হতো। এর ভিতর দিয়ে ব্যাক্টেরিয়া লাভ করতো- ২টি
ATP,
২টি NADH+H+, এবং দুটি
পাইভিরুক
এ্যাসিড।
এই পাইভিরুক এ্যাসিড অসম্পূর্ণভাবে জারিত হয়ে তৈরি হতো কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও
এ্যাসিটাল্ডিহাইড।
CH3-CO-COOH (পাইভিরুক
এ্যাসিড)ÞCO2
+
CH3-CHO
এরপর CH3-CHO (এ্যাসিটাল্ডিহাইড) জারিত হয়ে তৈরি হতো- ইথাইল এ্যালকোহল (CH3-CH2OH)। এই প্রক্রিয়া শেষে মূলত ২টি ATP থেকে উৎপন্ন হতো প্রায় ২০ ক্যালোরি শক্তি।
৩৮০-৩৬০ কোটি খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে ব্যাক্টেরিয়াকুলে বিবর্তন চলছিল। এদের কিছু কিছু প্রজাতির দেহে আলোক-শোষণ ক্ষমতার উদ্ভব হয়েছিল। এ সকল উপকরণ দ্বারা শোষিত আলো এবং ব্যাক্টেরিয়ার দেহগত উপকরণ দ্বারা প্রক্রিয়াজাত হয়ে শক্তিতে পরিণত হতো। এই সময়ের ভিতরে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি ব্যাক্টেরিয়ার জৈবিক কার্যক্রমের সূত্রে গন্ধকের আধিক্য ঘটেছিল সাগরের জলে। কোনো ব্যাক্টেরিয়ার সূত্রে লৌহঘটিত উপাদানও সাগরের তলদেশে জমা হয়েছিল। এরই ভিতরে ব্যাক্টেরিয়া জগতে নতুন দিগন্ত খুলে দিল সায়ানোব্যাক্টেরিয়া। এদের দেহে কার্বন , হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও ম্যাগনেশিয়াম-এর একটি যৌগিক অণুর সাথে- হাইড্রোকার্বন যৌগ যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছিল ক্লোরোফিল। সায়ানোব্যাক্টেরিয়াগুলোতে দুই ধরনের ক্লোরোফিলে যুক্ত হয়েছিল। ধরন দুটি হলো−
প্রতিটি বিভাগের সাথে যুক্ত থাকে পর্ফাইরিন (porphyrin) বলয়। এর কেন্দ্রে থাকে ম্যাগনেসিয়াম Mg++) আয়ন। এই আয়নগুলো ছিল -CHO, -CH=CH2, CH3, -CH2CH3, -CH2CH2COO। এর ভিতরে Chlorophyll f -এর আদি নমুনা পাওয়া গেছে পশ্চিম অষ্ট্রেলিয়ার শার্ক উপসাগরীয় অঞ্চলের পাথরে।
মূলত ক্লোরোফিল সাধারণ ব্যাক্টেরিয়াকে আলোক-শোষণের ক্ষমতাধর ব্যাক্টেরিয়ারতে পরিণত করেছিল। এদেরকে বিশেষভাবে সালোকসংশ্লেষণী ব্যাক্টেরিয়া (photosynthetic bacteria) বলা হয় । সালোকসংশ্লেষণের পর এ সকল ব্যাক্টেরিয়া বিভিন্ন ধরনের পদার্থ তৈরি করেছিল। সালোকসংশ্লেষণী ব্যাক্টেরিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-
১. অক্সিজেন-উৎপাদক সালোকসংশ্লেষণী ব্যাক্টেরিয়া (Oxygenic photosynthetic bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া সবুজ উদ্ভিদের মতই, শোষিত আলো এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড সংগ্রহের পর সালোকসংশ্লেষণের দ্বারা শক্তি উৎপাদন করে এবং পরে অক্সিজেন ত্যাগ করতো। এই পদ্ধতিতে এরা শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপাদন করতে পারতো।
২. অক্সিজেন-অনুৎপাদক সালোকসংশ্লেষণী ব্যাক্টেরিয়া (Anoxygenic photosynthetic bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া সালোকসংশ্লেষণের পর অক্সিজেন ত্যাগ করে না। বিষয়টি নির্ভর করে ব্যাক্টেরিয়ার শোষিত উপাদানের উপর। এখন পর্যন্ত অক্সিজেন-অনুৎপাদক সালোকসংশ্লেনী ব্যাক্টেরিয়াকে ৭টি ভাগ ভাগ করা হয়েছে। এই ভাগগুলো হলো-
২.১. পার্পেল ব্যাক্টেরিয়া (Purple bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া হাইড্রোজেন সালফাইড গ্রহণ করে এবং গন্ধক ত্যাগ করে। এই কারণে এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া পাওয়া যায় গন্ধকসমৃদ্ধ জলাশয় বা ঝর্নায়। গন্ধক উৎপাদনের প্রক্রিয়ার বিচারে এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়াকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
২.১.১. ক্রোমাটিয়াসি (Chromatiaceae): এই জাতীয় ভাইরাসের গন্ধক উৎপন্ন হয়, কোষের অভ্যন্তরে।
২.২.১. এক্টোথিয়োরোডোস্পিয়ারাসি (Ectothiorhodospiraceae): এই জাতীয় ভাইরাসের গন্ধক উৎপন্ন হয় কোষের বাইরে।২.২. পার্পেল গন্ধকহীন ব্যাক্টেরিয়া (Purple non-sulphur bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া অল্প পরিমাণ সালফাইড শোষণ করে। হাইড্রোজেন গ্রহণ করে। ফলে এরা গন্ধক ত্যাগ করার পরিবর্তে পানি ত্যাগ করে।
৩. সবুজ ব্যাক্টেরিয়া (Green bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া গন্ধক বা হাইড্রোজেন ত্যাগ করে। এই বিচারে এদেরকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগ দুটি হলো-
৩.১. সবুজ গন্ধক ব্যাক্টেরিয়া (Green sulphur bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্রহণ করে এবং পানি ও সালফার ত্যাগ করে।
৩.২. সবুজ গন্ধকহীন ব্যাক্টেরিয়া (Green non-sulphur bacteria): এই জাতীয় ব্যাক্টেরিয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানি গ্রহণ করে এবং হাইড্রোজেন ত্যাগ করে।
এতসব ব্যাক্টেরিয়ার ভিতরে জড় ও জীবজগতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিল অক্সিজেনত্যাগী ব্যাক্টেরিয়াগুলো। এদের কারণে এই যুগের পরবর্তী সময়ে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড কমে গিয়েছিল এবং পৃথিবীতে প্রথম বরফ যুগের আবির্ভাব হয়েছিল। অক্সিজেনত্যাগী ব্যাক্টেরিয়াগুলোর ভিতরে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় 'সায়ানোব্যাক্টেরিয়া' পর্বের জীবসত্তাগুলোকে।
সায়ানোব্যাক্টেরিয়া
পর্বের
ব্যাক্টেরিয়াগুলো দেহে সি-ফাইকোসায়ানিন নামক নীল কণিকা এবং সবুজ বর্ণের
ক্লোরোফিল
থাকায় এদের দেহের রঙ দেখায় নীলাভসবুজ। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার কারণে এরা হয়ে
উঠেছিল অক্সিজেনত্যাগী স্বভোজী। এদের দেহে কোনো ফ্লাজেলা (চাবুকের মতো সরু
অঙ্গ) না থাকায় চলাচলে অক্ষম ছিল। এদের বংশবিস্তার হতো অযৌন প্রক্রিয়ায়।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল ডিএনএ বা আরএন সমৃদ্ধ সেন্ট্রোজোম। সবুজ কণিকা
সৃষ্টির কারণে এদের দেহে সৃষ্টি হয়েছিল ক্রোমোপ্লাজম। দেহে সৃষ্টি হয়েছিল ছোটো
ছোটো গ্যাসপূর্ণ কোষগহ্বর। এদেরকে বলা হয় সিউডুভ্যাকুওল।
ধারণা করা হয় এই পর্বের
ব্যাক্টেরিয়াই প্রথমবারের জৈবিক প্রক্রিয়ায় মুক্ত
অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে
দিতে সক্ষম হয়েছিল।
এই
অক্সিজেন
লৌহের সাথে বিক্রিয়া করে আয়রন অক্সাইড (Fe3O4)
বা ম্যাগনেটাইট উৎপন্ন করতে থাকে এবং তা সাগরতলের মাটিতে জমা হয়।
একে বিজ্ঞানীরা
স্ট্রোমাটোলাইটস
নামে চিহ্নিত করে থাকেন। এদের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে অস্ট্রেলিয়ার
পশ্চিমাঞ্চলের পিলবারা অঞ্চলে। এছাড়া এদের নোস্টোক গণের প্রজাতিগুলো বাতাসের মুক্ত
নাইট্রোজেন গ্রহণ করে, বাতাসের নাইট্রোজেনের আধিক্য কমিয়ে দিয়েছিল।
এই যুগের শেষে এসে পৃথিবীর জড়জগতে জমা হয়েছিল বহু ক্র্যাটন আর জীবজগতে আবির্ভুত হয়েছিল প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ এবং সেই সূত্রে ভাইরাস ও নানা ধরনের ব্যাক্টেরিয়া। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখবো- পৃথিবীর জড়জগত ও জীবজগতের ক্রমবিবর্তনের পরবর্তী ধারা।
সূত্র :