প্রিক্যাম্বরিয়ান পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়
প্রথম ভাগ
ইয়ো-আর্কিয়ান যুগের কথা
৪০০-৩৬০ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ

হেডিন কালের শেষে এই শুরু হয়েছিল আর্কিয়ান কাল। আর এই কালের প্রথম ভাগ হলো ইয়ো-আর্কিয়ান যুগ  গ্রিক  eos  অর্থ ঊষা আর archaios অর্থ প্রাচীন। দুইয়ে মিলে এর অর্থ দাঁড়ায় 'প্রাচীন যুগের ঊষাকাল'। এর পূর্ব্র্তী হেডিন কালে (৪৬০-৪০০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডল গঠনের কাজ শুরু হয়েছিল। এই যুগে এই গঠনের কাজ শেষ হয়েছিল। এই যুগের ভূত্বক জমাট বেধে তৈরি হয়েছিল আদিম ক্র্যাটন ও ঢালভূখণ্ড। যা পরব্র্তী সময়ে মহাদেশ ও মহামহাদেশ তৈরির পথকে সুগম করে তুলেছিল। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নানা ধরনের গ্যাসীয় উপকরণ যুক্ত হয়েছিল এই সময়ে। এই কালের আগে পৃথিবীর ভূত্বকের উপর দিয়ে যে উত্তপ্ত বায়ু প্রবাহ হতো, তার তাপমাত্রা ছিল বর্তমান পৃথিবীর তাপমাত্রার ৩ গুণেরও বেশি। এই যুগের শুরুর দিকে মহাসাগর-সাগরগুলোর তরল পদার্থের সিংহভাগ দখল করে নিয়েছিল নানা যৌগিক পদার্থ মিশ্রিত জলরাশি এবং এই সাগরের পানিতেই সূচনা ঘটেছিল আদি প্রাণের। ি হয়েছিল প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ, ভাইরাস এবং ব্যাক্টেরিয়া। সায়ানোব্যাক্টেরিয়ার সূত্রে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে গিয়ে পৃথিবী শীতল হয়ে উঠেছিল। এই সূত্রে পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল প্রথম বরফযুগ।

জড় জগতের কথা

৪০০ থেকে ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ: এই সময়ে ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীর উপরিতলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর ফলে ভূ-গোলকের উপরিতলের ম্যাগ্‌মা অপেক্ষাকৃত কম ঘন ছিল এবং ভূত্বকও বেশ পাতলা ছিল। এর ফলে সে সময়ের প্রায় অখণ্ড জলরাশির তলদেশের শীতলতা, তরল ম্যাগ্‌মাকে দ্রুত শীতল করে আগ্নেয়শিলাস্তরের পুরুত্ব বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু পৃথিবীজলাশয়ের বাইরের পাতলা ভূত্বকের উপরিতলের আবরণের নিচের ম্যাগ্‌মা যথেষ্ঠ কঠিন না হয়ে উঠায়, সেখান থেকে উৎপন্ন গ্যাস প্রবল ভাবে ভূত্বকে চাপের সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ বেলুনের মতো ফুলে উঠেছিল। আবার ভূত্বকের কোনো কোনো অংশ ফেটে গিয়ে লাভা স্রোত সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভূত্বকের কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছিল উঁচু-নিচু ভূখণ্ড। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয় দ্বীপ। সে সময়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আগ্নেয়-দ্বীপগুলো বার বার প্লাবিত হয়েছে লাভাস্রোতে অগ্ন্যুৎপাতঘটিত ছাই ভস্মের অধঃক্ষেপের কারণে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আগ্নেয়-দ্বীপগুলো জোড়া লেগে লেগে বড় বড় ভূখণ্ড তৈরি করেছিল।

তবে এর ভিতরেও চলছিল ভাঙাচোরার খেলা। নিচের তরল ম্যাগমার চাপে, উপরে ভাসমান ভূখণ্ডগুলো পরস্পরের ধাক্কায় ভেঙে পড়ছিল অবিরত। আবার নিচের তরল ম্যাগমার প্রবাহে ভূ-ভগ্নাংশগুলো ভাসতে ভাসতে যুক্ত হয়ে বড় ভূখণ্ডের ভিত্তি তৈরিও করছিল। প্রথম দিকের এই ভূখণ্ডগুলোর পুরুত্ব বেশি ছিল না। তবে এদের নিচের তরল পাথর ক্রমাগত তাপ হারিয়ে কঠিনতর হয়ে উঠছিল। এই সূত্রে ভূখণ্ডগুলো ভারি হয়ে উঠার পাশাপশি, নিচের তরল পাথরের সমুদ্রের প্রোথিত হচ্ছিল। এ সকল প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে নানাভাবে ভূখণ্ডগুলো সুদৃঢ় হয়ে উঠছিল। এরই মধ্য দিয়ে কিছু বড় বড় ভূখণ্ডের উদ্ভব হয়েছিল। ভূবিজ্ঞানীরা এই সুদৃঢ় বিশাল ভূখণ্ডগুলোকে ক্র্যাটন নামে অভিহিত করে থাকেন।

এই পরিবেশে সে সময়ের ক্র্যাটনগুলো আদিম দশায় ছিল। পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে এদের ভিতর ক্রমাগত ঠোকাঠুকি চলছিল। পরস্পরের দিকে অবিরাম ধাক্কা এবং চাপ সৃষ্টির কারণে, ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ক্র্যাটনগুলোর সীমানা বরাবর উঁচু উঁচু টিলা তৈরি হওয়া শুরু হয়েছিল।  ৩৯৬-৩৯৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ছোটো ছোটো টিলাগুলো বিশাল পর্বতমালায় রূপ লাভ করেছিল। ধারণা করা হয়, এগুলোর কোনো কোনোটির উচ্চতা বর্তমান পৃথিবীর যে কোনো পর্বতশৃঙ্গের চেয়ে উঁচু ছিল। কালক্রমে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, বরফযুগের প্রভাবে এ সকল উচ্চতর শৃঙ্গ ভেঙে পড়েছিল।  ভূবিজ্ঞানীর এই জাতীয় পর্বতমালাগুলোকে বলে থাকেন গিরিজনি। এ সময়ে ক্র্যাটনের চলমান দশায় অনেক পাহাড় ভূগর্ভে প্রোথিত হয়ে উচ্চতা হারিয়েছিল।

ভূত্বকে যখন এই ভাঙা-গড়ার খেলা চলছিল, তখন বায়ুমণ্ডলে সঞ্চিত হচ্ছিল গ্যাসীয় নানা উপকরণ। এই সময়ের বাতাসে যুক্ত হয়েছিল জলীয় বাস্প (H2O), হাইড্রোক্লোরিক এ্যাসিড (HCl), কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2), কার্বন মনো-অক্সাইড (CO), নাইট্রোজেন (N2) ইত্যাদির মতো গ্যাসীয় উপকরণ। পরবর্তী সময়ে এদের ভিতর রাসায়নিক বিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল মিথেন (CH4) এ্যামোনিয়া (NH3) এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইড (HCN) জাতীয় যৌগ পদার্থ। এই সময় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম ছিল।

৩৯৬-৩৯৩ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ: এই গ্যাসীয় উপকরণের প্রাবল্যে ৩৯৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ঘন মেঘের সৃষ্টি হয়েছিল। একে বলা যায় অন্তঃহীন মেঘ। এই মেঘ পৃথিবীকে এতটা নিবিড়ভাবে ঢেকে ফেলেছিল যে, সে মেঘকে ভেদ করে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছাত না। এরপর এলো মহাবর্ষণ। এর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম মহাপ্লাবন। বিপুল পরিমাণ জলের চাপ, এবং ভূত্বকে সৃষ্ট বিশাল কঠিন অংশের চাপ সহ্য করতে না পেরে, পৃথিবীর কোনো কোনো অংশের উপরিতল গভীরভাবে বসে গিয়েছিল। আর এ সকল গভীর খাদের শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছিল বৃষ্টিজাত শীতল তরল পদার্থ। এই তরল পদার্থের প্রধান উপাদান পানি হলেও- এতে মিশেছিল নানা পদার্থ। এই মিশ্র জলরাশি যখন প্রবল বেগে ভূভাগের উপরিতলের খাদের দিকে প্রবাহিত হয়েছিল- তখন তার সাথে যুক্ত হয়েছিল আরও বহু পদার্থ। এই জলপ্রবাহের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল অসংখ্য নদী। যদিও সে কালের আদিম নদীগুলো পরবর্তী সময়ে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এই সব নদীর দ্বারা প্রবাহিত জলরাশি খাদগুলোতে জমে তৈরি করেছিল অসংখ্য হ্রদ। ধীরে ধীরে এই হ্রদগুলো যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পৃথিবীর আদি সমুদ্র।

কানাডিয়ান ঢাল-ভূখণ্ডের আদি ক্র্যাটনসমূহ

৩৯৫-৩৯৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে ভূত্বকের ক্রমবিবর্তনর ধারায় কানাডিয়ান ঢাল-ভূখণ্ডের সৃষটি হয়েছিল। ক্রমে ক্রমে এই ঢাল-ভূখণ্ড কিছুটা সুস্থির এবং সুদৃঢ় দশায় পৌঁছেছিল এবং একই সাথে এর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াও সক্রিয় ছিল। এই সময়ের ভিতরে এর বিস্তার ঘটেছিল কুইবেকের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্ব প্রান্তের হাডসন উপসাগর পর্যন্ত। আবার দক্ষিণ দিকে অন্টারিও-এর উত্তরাঞ্চল থেকে হুরোন হ্রদের উত্তর তীরবর্তী অঞ্চল থেকে সুপিরিয়র হ্রদ পর্যন্ত। আবার অন্টারিও-এর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে মানিটিবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছিল। এছাড়া মিন্নেসোটার পশ্চিমাঞ্চল থেকে ডাকোটার উত্তর দক্ষিণ বরাবর এর বিস্তার ঘটেছিল। উল্লেখ্য, কানাডিয়ান ঢালভূখণ্ড গঠিত হয়েছিল ছয়টি ক্র্যাটন  ক্র্যাটন নিয়ে। এই ক্র্যাটনগুলো হলো- ওয়াইয়োমিং, নাইন, রেই সুপিরিয়র, স্ল্যাভ হেয়ার্ন।

জড় থেকে জীবনের প্রকাশ
আগের হেডিনকালের শেষে অর্থাৎ ৪০০ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে সাগরজলে তৈরি হয়েছিল, রাইবোজ, ডিঅক্সিরাইবোজ, নাইট্রোজেন ক্ষার, ফসফরিক এ্যাসিড ও এ্যামিনো‌ এ্যাসিড। এই সূত্রে এই যুগে তৈরি হয়েছিল
, নানা ধরনের প্রোটিন, উৎসেচক আরএনএ, ডিএনএ।

হেডিন কালের শেষের দিকে আদিম সাগরজলে প্রাথমিক পর্যায়ে নাইট্রোজেন ক্ষারর (এ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, উরাসিল বা থাইমিন) সাথে পেন্টোজ কার্বোহাইড্রেড- (রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ) সৃষ্টি হয়েছিল বিচ্ছিন্নভাবে। এই যুগের প্রথম দিকে রাইবোজ বা ডিঅক্সিরাইবোজ যুক্ত হয়ে তৈরি হয় নিউক্লিওসাইড তৈরি হয়েছিল। এদের ভিতরে রাইবোজের সাথে এই ক্ষারগুলো যুক্ত হয়ে তৈরি করেছিল রাইবোনিউক্লিওসাইড। পক্ষান্তরে ডিঅক্সিরাইবোজের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছিল ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওসাইড। নিচের ছকে  নিউক্লিওসাইডগুলোর পরিচয় তুলে ধরা হলো।
 

নাইট্রোজেন ক্ষার

রাইবোনিউক্লোসাইড

ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওসাইড


এ্যাডেনিন


এ্যাডেনোসাইন


ডিঅক্সিয়াডেনোসাইন


গুয়ানিন


গুয়ানিসাইন


ডিঅক্সিগুয়ানোসাইন


থাইমিন


রাইবোথাইমিডিন


থাইমিডিন


ইউরাসিল


ইউরিডিন


ডিঅক্সিইউরিডিন


সাইটোসিন


সাইটোডিন


ডিঅক্সিসাইটিডিন


নিউক্লিওসাইডগুলো তৈরি হওয়ার পর, এর সাথে ফসফরিক এ্যাসিড যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছিল নিউক্লিওটাইড। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিউক্লিক এ্যাসিড গঠনের একটি দশা সম্পন্ন হয়েছিল। নিউক্লিক এ্যাসিডের বিদ্যমান পেন্টোজ কার্বোহাইড্রেডের সদস্য এবং এর সাথে যুক্ত নাইট্রোজেন ক্ষারের সদস্যদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল আরএনএ এবং ডিএনএ।  যেমন-

হেডিন কালের শেষের দিকে এই জাতীয় সরল এ্যামিনো এ্যাসিড তৈরি হয়েছিল প্রচুর  পরিমাণে। কিন্তু এই এ্যাসিডগুলো দীর্ঘ দিন স্বাধীনভাবে থাকতে পারে নি। সে সময়ের সমুদ্রজলের তাপ, অতি-বেগুনি রশ্মি ছাড়াও নানা ধরনের মহাজাগতিক রশ্মি, উপযুক্ত তাপ, বায়ুমণ্ডলের চাপ ইত্যাদি মিলে এ্যাসিডগুলোর ভিতরে নতুন রাসায়নিক আসক্তির জন্ম দিয়েছিল। এর ফলে এ্যামিনো এ্যাসিডগুলো পরস্পরের সাথে মিলিত হওয়া শুরু করেছিল। প্রাথমিকভাবে দুটি এ্যামিনো এ্যাসিডের মিলনে তৈরি হয়েছিল যে দীর্ঘ অণু, বিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন ডিপেপটাইড। যেমন গ্লাইসিন নামক এমিনো এ্যাসিড মিলিত হয়ে তৈরি হয়েছিল গ্লাইসিলগ্লাসিন (Glycylglycine)। এরূপ নানা ধরনের পেপটাইড তৈরি হয়েছিল সে সময়ে। যেমন-

R যুক্ত উপাদান সংকেত নাম
H-  হাইড্রোজেন গ্লাইসিন
CH3- মিথাইল এ্যালানিন
(CH3)2-CH আইসোপ্রপাইল ভ্যালিন
HO-CH2 হাইড্রোক্সি মিথাইল সেরাইন


সাধারণত ৫০টিরও বেশি এ্যামিনো এ্যাসিড আব্দ্ধ হয়ে যে পলিপেপটাইড অণু তৈরি হয়, তাকে জৈব রসায়নে প্রোটিন নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত এ্যামিনো এ্যাসিড সরল শৃঙ্খল হিসেবে বিরাজ করে। কিন্তু প্রোটিনে একাধিক পলি-এ্যামিনো এ্যাসিড শিকল একটি বিশেষবন্ধনের দ্বারা সমান্তরালভাবে বিরাজ করে। ফলে শৃঙ্খলাবদ্ধ এ্যামিনো এ্যাসিডগুলো কিছু বিশেষ গুণের অধিকারী হয়ে যায়। এই কারণে প্রোটিনের ধর্ম এ্যামিনো এ্যাসিডের সাধারণ ধর্মকে অতিক্রম করে। এই কারণে প্রোটিনকে একটি পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৩৯৬ কোটি খ্রিষ্টপূর্বাব্দের প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে পৃথিবীর আদিম সাগর ভরে উঠেছিল। এই সময়ে উৎপন্ন নিউক্লেইক এ্যাসিড এবং প্রোটিনের সম্মিলনে সৃষ্টি হয়েছিল নিউক্লিয়োপ্রোটিন (Nucleoprotein)। এই নিউক্লিয়োপ্রোটিন গঠনের মধ্য দিয়ে জীবজগত সৃষ্টির পথে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। এই সময় নিউক্লিয়োপ্রোটিনের অন্যতম অংশ নিউক্লিক এ্যাসিড বংশগতির ধারকের ভূমিকা গ্রহণ করলে- জৈব-অণু হয়ে উঠলো জীবের আদি সদস্য। এক্ষেত্রে বিশেষ ধরেনের কিছু প্রোটিন আদি জীবকোষে গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এই বিশেষ ধরনের প্রোটিনকে বলা হয় উৎসেচক (Enzyme)

এই জটিল অণুগুলোর ভিতর ছিল বংশগত তথ্য সংরক্ষণ করা ও সুনির্দিষ্ট প্রোটিন অণু তৈরি করার ক্ষমতা। রাসায়নিক আসক্তির সূত্রে এই এ্যাসিডগুলো গড়ে তুলেছিল আরএনএ [ribonucleic acid (RNA)]

বিজ্ঞানীরা মনে করেন আরএনএ জগতের সূচনার ভিতর দিয়ে শুরু হয়েছিল জীবজগতের প্রকৃত যাত্রাপথ। এই ধারণা অবলম্বন করে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন জীববিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার রিখ (Alexander Rich (November 15, 1924 – April 27, 2015) প্রথম একটি কল্প-প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে অপর মার্কিন জীববিজ্ঞানী ওয়াল্টার গিলবার্ট (Walter Gilbert) এই ধারণার সাথে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করেন। যদিও অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন যে, আরএনএ-ভিত্তিক জীব সৃষ্টির আগেও অন্য ধরনের জীব সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ ও ব্যাখ্যার সূত্রে 'আরএনএ জগৎ' ধারণা অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত।

আরএনএ মূলত
জীবের বংশগতি নির্ধারক জটিল অনুর দ্বারা গঠিত দীর্ঘ পলিমার বিশেষ। এর মূল উপাদান নিউক্লেইক এ্যাসিডPhoebus Levene নামক একজন রাশিয়ান বায়োকেমিষ্ট ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে একটি ইস্ট থেকে পাঁচ কার্বন বিশিষ্ট একটি শর্করা অনু নিষ্কাষণ করেন এবং এর নাম দেন রাইবোজ (Ribose) সেখান থেকে এই নিউক্লিক এসিডের নামকরণ করা হয়েছে।

জীবের বংশগতি নির্ধারক আরও একটি উপকরণ সৃষ্টি হয়েছিল এই সময়। একে বলা হয় ডিএনএ
[deoxyribonucleic acid (DNA)]  ডিএনএ-কে সাধারণভাবে বলা যায়- জীবের বংশগতি নির্ধারক জটিল অনুর দ্বারা গঠিত দীর্ঘ পলিমার বিশেষ। সু-প্রাণকেন্দ্রিক  কোষ (Eukaryotic cell)-এর নিউক্লিয়াসে ডিএনএ থাকে। পক্ষান্তরে প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ ( Prokaryotes) ডিএনএ কোষে সাইটোপ্লাজমে থাকে। যেমন ব্যাকটেরিয়া। উৎসেচকের (enzyme) মত ডিএনএ অধিকাংশ জৈবরসায়ন বিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয় না। মূলত, বিভিন্ন উৎসেচক ডিএন-তে কার্যকরী ভূমিকা রেখে তথ্য নকল করে এবং  আরো বহু ডিএনএ তৈরি করে। প্রাথমিক বিশ্লেষণ ডিএনএ-কে দুটি প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই উপাদান দুটি হলো

একটি শিকলের ভিত্তি বা (Base)- এর নির্দিষ্ট অবস্থানের হাইড্রোজেন পরমাণুটি পজিটিভ চার্জ ধারণ করে। আবার অন্য শিকলের নির্দিষ্ট অবস্থানের অক্সিজেন অথবা নাইট্রোজেন পরমাণুটি নিগেটিভ চার্জ ধারণ করে থাকে। তখন এই দুই বিপরীত মুখী চার্জের মধ্যে আকর্ষণের ফলে উভয় শিকল বাধা পড়ে যায়। এক্ষেত্রে দুর্বল হাইড্রোজেন-বন্ধন কাজ করে। এই কারণে কোষ বিভাজনের সময় সহজেই দুটি শিকল পৃথক হতে পারে।

ডিএনএ-র মেরুদণ্ড এবং ভিত্তিসমূহ নিয়ে তৈরি হয়ে একটি দ্বৈত এবং দীর্ঘ পলিমার তৈরি হয়। এই পলিমার প্যাঁচানো অবস্থায় থাকে। এর এক প্যাচ থেকে অন্য প্যাচের মধ্যকার দূরত্ব ৩.৪ ন্যানোমিটার আর ব্যাস ১ ন্যানোমিটার। মানুষের ক্রোমোজোমে এই দূরত্ব প্রায় ৮৫ মিলিমিটার হয়ে থাকে। এউ দুটি প্যাচানো পলিমার দুটি পরস্পরের সম্পূরক হিসেবে কাজ করে। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক জীব বিজ্ঞানী জেমস ডি ওয়াটসন এবং তাঁর দুজন সহকারী ফ্রান্সিস ক্রিক ওয়াটসন ও মরিস ভিকিনস ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ডিএনএর কিছু উপাদান আবিষ্কার করেন। এই সময় তাঁরা প্রথম প্যাচানো দীর্ঘ পলিমারের সন্ধান পান। ।

ভিত্তি হিসেবে অবস্থিত ক্ষারগুলোর সংযোগের ভিত্তি হিসেবে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগ দুটি  হলো

  • নিউক্লিওসাইড: কোনো ক্ষার যখন ডিএনএ সূত্রের কার্বোহাইড্রেড অণুর সাথে যুক্ত থাকে, তখন তাকে বলা হয় নিউক্লিওসাইড।

  • নিউক্লিওটাইড : কোনো ক্ষার যখন ডিএনএ সূত্রের একটি কার্বোহাইড্রেডে ও এক বা একাধিক ফসফেট অণুর সাথে যুক্ত থাকে, তখন তাকে বলে নিউক্লিওটাইড।

ডিঅক্সিরাইবোজ ফসফেট গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে পাশাপাশি ডিঅক্সিরাইবোজ -এর মধ্যে তৃতীয় ও পঞ্চম কার্বন পরমাণুর স্থানে ফসফোডিয়েসটার বন্ধন গঠন করে। এই অপ্রতিসম বন্ধন বোঝায় যে ডিএনএ অণুর মেরু বা দিক আছে। দ্বৈত হেলিক্সে এক সূত্রের নিউক্লিওটাইডের দিক অন্য সূত্রের ঠিক বিপরীত দিকে থাকে। ডিএনএ সূত্রের এই ধরনের বিন্যাসকে প্রতিসমান্তরাল বলে। ডিএনএর অপ্রতিসম প্রান্তকে বলে ৫’ (ফাইভ প্রাইম) এবং ৩’ (থ্রি প্রাইম) প্রান্ত। ডিএনএ ও আরএনএর মধ্যকার একটি প্রধান পার্থক্য হলো- ডিএনএতে ২-ডিঅক্সিরাইবোজ ব্যবহৃত হয়, সেখানে আরএনএতে একটি রাইবোজ ব্যবহৃত হয়।

পূর্বেই বলেছি বিভিন্ন উৎসেচক ডিএন-তে কার্যকরী ভূমিকা রেখে তথ্য নকল করে এবং  আরো বহু ডিএনএ তৈরি করে। তার অর্থ হলো- এই সময়ের ভিতরে সৃষ্টি হয়েছিল উৎসেচক।

তিনটি ভিত্তি মিলে তৈরি হয় একটি ক্ষুদ্র একক। একে বলা হয় কোডন। যেমন একটি
ATG (adenine, thymine, cytosine) কোডন হতে পারে। প্রতিটি কোডন মূলত একটি এ্যামিনো এ্যাসিড তৈরি করে। আর প্রায় হাজার খানেক কোডন মিলে তৈরি হয় একটি একটি দীর্ঘ এ্যামিনো এ্যাসিড পলিমার। সাধারণভাবে এদেরকে বলা হয় প্রোটিন। জিনবিদ্যায় এই হাজার খানেক কোডনের পলিমারের সংকলন হলো জিন  (GENE)। সংকলন বলছি এ জন্য যে, হাজার খানেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে জীবের অঙ্গানুসমূহের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। ধরা যাক, মানুষের চুলের কথা। চুলের রং, ব্যাস, দৈর্ঘ্য ইত্যাদির বৈশিষ্ট্য বহন করবে হাজার খানেক কোডন। এই কারণেই বলা হয়-  জিনই প্রজাতির মৌলিক গুণাগুণ ধারণ করে।

এর বাকি অংশ বংশগতির সংকেতকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির বংশগতির সংকেত একটি সুদৃঢ় প্যাকেটের মতো থাকে। একে জীববিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ক্রোমোজোম (
Chromosome)। এই প্যাকেট সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে হিস্টোন (Histone) নামক এক ধরনের বিশেষ প্রোটিন। প্রতিটি প্রজাতির ক্রোমোজোম নির্দিষ্ট সংখ্যায় থাকে। যেমন হোমো স্যাপিয়েন্স তথা মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৩ জোড়া। মানুষের শরীরের প্রত্যেকটি কোষের প্রাণকেন্দ্রের ভিতর প্রায় ৩০০ কোটি বেজ পেয়ারযুক্ত ডিএনএ কুণ্ডলিত আকারে সংরক্ষিত রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিটার।

ডিএন-এর মধ্যে রক্ষিত বংশগতির সঙ্কেত অনুসারে প্রতিটি প্রজাতি প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে টিকে থাকার পথ খুঁজে পায়। এক্ষেত্রে এই সঙ্কেত যথাসম্ভব পরিবেশ উপযোগী শারীরীক পরিবর্তন ঘটায়। দীর্ঘদিন ধরে এই শারীরীক পরিবর্তন যদি ধরে রাখতে হয়, তাহলে প্রজাতির ডিএন-এর ভিতর তা লিখিত হয়ে যায়। প্রজাতির এই সূক্ষ্ম শারীরীক পরিবর্তনের সূত্রে আরও কিছু পরিবর্তন ঘটে। বিষয়টি বংশ পরম্পরায় চলতে চলতে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। প্রথমদিকের প্রজন্মের সাথে আদি প্রজন্মের এই পার্থক্য ধরা পড়ে না। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে দুটি পৃথক প্রজাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কোনো প্রজাতি যদি এই বংশগতির সংকেত বংশধরদের পাঠাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নবজাতক মৃত্যুবরণ করে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে, এক সময় পুরো প্রজাতিটিই বিলুপ্ত হয়ে যায়। 

এই যুগের শেষে এসে পৃথিবীর জড়জগতে জমা হয়েছিল বহু ক্র্যাটন আর জীবজগতে আবির্ভুত হয়েছিল প্রাক্-প্রাণকেন্দ্রিক কোষ এবং সেই সূত্রে ভাইরাস ও নানা ধরনের ব্যাক্টেরিয়া। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখবো- পৃথিবীর জড়জগত ও জীবজগতের ক্রমবিবর্তনের পরবর্তী ধারা।


সূত্র :