ষড়জগ্রাম, পঞ্চম, কৈশিক, কৈশিকমধ্যম, মধ্যমগ্রাম, সাধারিত ও ষাড়ব।
খ্রিষ্টীয়
দ্বিতীয় শতাব্দী
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়
শতাব্দীর ভিতরে গ্রামরাগভিত্তিক জাতি গানের উদ্ভব হয়েছিল। এর প্রভাব ছড়িয়ে
পড়েছিল অন্যান্য দেশী গীতসমূহে। তবে শাস্ত্রীয় বিধিতে এই গ্রামরাগগুলো সবচেয়ে বেশি এবং
গুরুত্বের সাথে ব্যবহৃত হতো- নাটকের
ধ্রুবাগান হিসেবে।
জাতিগানের সুর গ্রামরাগ ভিত্তিক হলেও এই গানগুলো ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট রীতি
ছিল। যেমন- এই জাতিগানগুলো নাটকের কোথায় ব্যবহৃত হবে, এর তাল এবং রস কি হবে তা
সুনির্দিষ্ট করা ছিল। ফলে জাতি গানে গ্রামরাগগুলো অনেকটাই বদ্ধ দশায় পতিত
হয়েছিল।
নাট্যশাস্ত্রের অষ্টাবিংশ অধ্যায়ের ৪০ থেকে ৪৩ সংখ্যাক
শ্লোকে ১৮ প্রকার জাতির নাম পাওয়া যায়। এই জাতিগানগুলো ষড়্জ ও মধ্যম গ্রাম অনুসারে
সাজানো হয়েছিল। এর ভিতরে ষড়্জ গ্রামে ছিল ৭টি জাতিগান। এর ভিতরে ৪টি ছিল শুদ্ধজাতি
এবং ৩টি ছিল বিকৃত জাতি। পক্ষান্তরে মধ্যম জাতির গান ছিল ১১টি। এর ভিতরে
৩টি ছিক
শুদ্ধজাতির এবং ৮টি ছিল বিকৃত জাতির।
নিচে এই জাতিগানগুলোর শ্রেণিকরণ দেখানো হলো।
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ভরতের শতপুত্র এবং শিষ্যদের মাধ্যমে গীতের নতুন শ্রেণিগত বিভাজনের একটি রূপরেখা
স্পষ্ট হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীতে
ভরতের পুত্র শার্দুল
বলেছিলেন- গীত এক প্রকার, তা হলো- ভাষাগীতি। [বৃহদ্দেশী। রাগ। পৃষ্ঠা: ১৩৪]
শার্দুল
গ্রামরাগ-ভিত্তিক জাতিগানকে মেনে নিয়ে- শাস্ত্রীয় গান হিসেবে ভাষাগানকে গীত হিসেবে
স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সম্ভবত শার্দুলের অন্যান্য গীতের মধ্যে ভাষাগীতকে মুখ্য হিসেবে
স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এবং সম্ভবত তাঁর সময়ে ভাষাগীতের পাশাপাশি অন্যান্যা গীতের যথার্থ
বিকাশ ঘটেনি। তারপরেও তিনি বিভাষা গীতির অন্তর্গত কয়েকটি রাগের উল্লেখ করেছিলেন।
এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য ছিল-
র্ধনী, পৌরালী, ত্রাবণী, তানলতিকা, দেহ্যা, শার্দূলী, ভিন্নলতিকা, রবিচন্দ্র, ভিন্নপৌবালী, দ্রাবিড়ী, পিঞ্জরীম পার্বতী, টঙ্ক।দেবলব
বৃহদ্দেশীর রাগ পরিচয়
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠশতাব্দী পর্যন্ত রাগ-ভিত্তিক সঙ্গীতের ধারায় গ্রামরাগের আদিরূপের সাথে
যুক্ত হয়েছিল আরও বহু দেশী রাগ। এর ভিতরে
শার্দুলের উল্লেখিত রাগগুলোও ছিল। এই সময়ের ভিতরে গ্রামরাগের পরিবর্তে শুধু রাগ
শব্দটিই প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিলে। এই সময়ে মতঙ্গ তাঁর রচিত বৃহদ্দেশী গ্রন্থে-
সেকালের প্রচলিত রাগের কাঠামোগত পরিচয়ের পাশাপাশি রাগের শ্রেণিকরণের উদ্যোগ
নিয়েছিলেন। তাঁর মতে গীত ছিল ৭ প্রকার। এগুলো হলো-
চোক্ষ,
ভিন্নকা,
গৌড়িকা,
রাগগীতি, সাধারণী, ভাষা
ও বিভাষা।
মোট কথা
ভরত থেকে মতঙ্গের আমল পর্যন্ত গীতের প্রকরণ করা হয়েছিল, গ্রামরাগ এবং অন্যান্য দেশী
রাগের ভিত্তিতে। তাই গীতের শ্রেণিকরণের সূচনা হয়েছিল গ্রামভিত্তিক। তখন এর সাধারণ
নাম ছিল গ্রামরাগ। ভরতের আমলে জাতিগানের আড়ালে গ্রামরাগ চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু
জাতিগানের শ্রেণিকরণ করা হয়েছিল গ্রামরাগের ভিত্তিতে। পরবর্তী সময়ে রাগের শ্রেণিকরণে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিল গীত। গীত ও রাগের মধ্যে
পার্থক্য নির্ণয়ের একটি সূত্র পাওয়া যায় বৃহদ্দেশীতে। বৃহদ্দেশীতে উল্লিখিত সূত্রটি
হলো- 'গীতে স্বরাদির বিন্যাসে যে দশলক্ষণ লক্ষিত হয়, সেটিই রাগ। তাদের কোথাও অংশ,
গ্রহ, অপন্যাস, ন্যাস ও স্বরাদির আরোপ হয়; এইগুলি মন্দ্রত্ব এবং তারত্ব,- এই দুটির
পরিপ্রেক্ষিতে যোজিত হয় এবং কোথাও অল্পত্ব, কোথাও বহুত্ব পরিলক্ষিত হয়। এতদ্ব্যতীত
আক্ষেপ, নিষ্কাম, প্রসাদিক এবং অন্তরা,- এই পাঁচপ্রকার ধ্রুবাগানেও (নাট্যসঙ্গীতে)
গ্রামসমূহ সংযোজিত হয়।[পৃষ্ঠা: ১৮৭-১৮৮]
মতঙ্গ
তাঁর সময়ের প্রচলিত রাগগুলোর প্রকৃতি অনুসারে
গ্রামরাগ এবং অন্যান্য দেশী রাগগুলোকে শ্রেণিকরণে 'গীত' শব্দটিকে
শব্দ-ঊর্ধ্বক্রমবাচকতার সোপানে বিন্যস্ত করেছিলেন। এই শ্রেণি বিভাজনের উচ্চধাপে ছিল
গ্রাম। এরপর নিম্নক্রমিক ধারাটি ছিল- গ্রামরাগ> জাতিরাগ।
এই ধারায় গ্রামরাগ, গ্রামরাগজাত রাগ ও দেশী রাগের একটি সাধারণ পরিচয় হিসেবে পরিচয়
লাভ করেছিল। বৃহদ্দেশীতে গীতের বিভাজন করা হয়েছিল গ্রামরাগ এবং দেশী রাগের ভিত্তিতে।
এই সূত্রে গীতের বাইরে এসে অতিরিক্ত আরো কয়েকটি রাগপ্রকৃতিকে রাগবর্গীকরণের
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এগুলো ছিল- ভাষারাগ, বিভাষারাগ, অন্তরভাষারাগ, উপরাগ। প্রতিটি ভাগে কতগুলো রাগ
ছিল, তার সংখ্যা নির্দেশ করা হয়েছে। সঙ্গীতরত্নকরের রাগবিবেকাধ্যায়ের ২-৩ শ্লোকে বলা হয়েছে- পাঁচটি গীতির আশ্রয়হেতু
গ্রামরাগ পাঁচ প্রকার। যথা- শুদ্ধা, ভিন্না, গৌড়ী, বেসরা ও সাধারণী।
বৃহদ্দেশীতে বর্ণিত গীতিপ্রকরণের তালিকা
বৃহদ্দেশীতে বলা হয়েছে ভাষা ভেদের গানের বিচারে- ভাষা হলো প্রকরণ। মূলত রাগ হিসেবে ভাষা হলো গ্রাম রাগের প্রকারভেদ। এই শ্রেণির রাগগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- মূল, সঙ্কীর্ণ, দেশজ ও ছায়ামাত্রাশ্রবা। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শার্ঙ্গদেবের রচিত সঙ্গীতরত্নাকরে একে ভিন্ন নামে উপস্থাপিত হয়েছে।
সঙ্গীতরত্নাকরে বর্ণিত বিভাষা রাগের তালিকা
রাগের শ্রেণিকরণের ধারায় আরও কিছু রাগের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলো হলো- অন্তরভাষা রাগ ও উপরাগ।
মূলত খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভিতরে আরও বহুবিধ রাগের
উৎপত্তি হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সুলতান
আলাউদ্দীন খিলজির সভাকবি-
আমির খসরু,
দেশী রাগের চর্চার পাশাপাশি আরব-পারশ্যের রাগের
সংমিশ্রণে নতুন কিছু রাগ তৈরি করেছিলেন।
খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর ভিতরে ভারতীয় রাগসঙ্গীতের ধারায় বহু প্রচীন রাগ বিলুপ্ত
হয়ে গিয়েছিল। আবার দেশীর সুরাবলম্বনে নতুন নতুন রাগের উদ্ভব হয়েছিল।
খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লোচন শর্মার
রচিত 'রাগতরঙ্গিনী' গ্রন্থে এরূপ রাগের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে ৬টি রাগকে আদি
রাগ হিসেবে চিহিত করা হয়েছিল। এগুলো হলো-
ভৈরব,
কৌশিক,
হিন্দোল,
দীপক ও শ্রী।
তিনি পারশ্যের রাগকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কাঠামোতে তৈরি করেছিলেন
ইমন রাগ। পরে এই রাগের সাথে অন্যান্য রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করেছিলেন
ইমন-পুরিয়া, ইমন-ভূপালী, ইমন-বিলাবল, ইমন
বেহাগ, ইমন কল্যাণ।
ফকিরুল্লা'র রাগ দর্পণ গ্রন্থ থেকে ১২টি এরূপ ১২টি রাগের তালিকা পাওয়া যায়। এর
বাইরে পাওয়া যায়-