রাগের কালানুক্রমিক তালিকা
[মূল প্রবন্ধ: রাগ]

খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী
খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে রচিত নারদের রচিত 'নারদীয় শিক্ষা' গ্রন্থের প্রথম প্রপাঠকের চতুর্থ কণ্ডিকার ৮-১১ শ্লোকে পাওয়া যায় ৭টি গ্রামরাগের কথা। এই গ্রামরাগগুলোর নাম ছাড়া প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয়ে নারদীয় শিক্ষা থেকে জানা যায় না।

ষড়জগ্রাম, পঞ্চম, কৈশিক, কৈশিকমধ্যম, মধ্যমগ্রাম, সাধারিত ও ষাড়ব।

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর ভিতরে গ্রামরাগভিত্তিক জাতি গানের উদ্ভব হয়েছিল। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য দেশী গীতসমূহে। তবে শাস্ত্রীয় বিধিতে এই গ্রামরাগগুলো সবচেয়ে বেশি এবং গুরুত্বের সাথে ব্যবহৃত হতো- নাটকের ধ্রুবাগান হিসেবে। জাতিগানের সুর গ্রামরাগ ভিত্তিক হলেও এই গানগুলো ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট রীতি ছিল। যেমন- এই জাতিগানগুলো নাটকের কোথায় ব্যবহৃত হবে, এর তাল এবং রস কি হবে তা সুনির্দিষ্ট করা ছিল। ফলে জাতি গানে গ্রামরাগগুলো অনেকটাই বদ্ধ দশায় পতিত হয়েছিল।

নাট্যশাস্ত্রের অষ্টাবিংশ অধ্যায়ের ৪০ থেকে ৪৩ সংখ্যাক শ্লোকে ১৮ প্রকার জাতির নাম পাওয়া যায়। এই জাতিগানগুলো ষড়্‌জ ও মধ্যম গ্রাম অনুসারে সাজানো হয়েছিল। এর ভিতরে ষড়্জ গ্রামে ছিল ৭টি জাতিগান। এর ভিতরে ৪টি ছিল শুদ্ধজাতি এবং ৩টি ছিল বিকৃত জাতি। পক্ষান্তরে মধ্যম জাতির গান ছিল ১১টি। এর ভিতরে ৩টি ছিক শুদ্ধজাতির এবং ৮টি ছিল বিকৃত জাতির।

নিচে এই জাতিগানগুলোর শ্রেণিকরণ দেখানো হলো।

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে ভরতের শতপুত্র এবং শিষ্যদের মাধ্যমে গীতের নতুন শ্রেণিগত বিভাজনের একটি রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীতে ভরতের পুত্র শার্দুল বলেছিলেন- গীত এক প্রকার, তা হলো- ভাষাগীতি। [বৃহদ্দেশী। রাগ। পৃষ্ঠা: ১৩৪]

শার্দুল গ্রামরাগ-ভিত্তিক জাতিগানকে মেনে নিয়ে- শাস্ত্রীয় গান হিসেবে ভাষাগানকে গীত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সম্ভবত শার্দুলের অন্যান্য গীতের মধ্যে ভাষাগীতকে মুখ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এবং সম্ভবত তাঁর সময়ে ভাষাগীতের পাশাপাশি অন্যান্যা গীতের যথার্থ বিকাশ ঘটেনি। তারপরেও তিনি বিভাষা গীতির অন্তর্গত কয়েকটি রাগের উল্লেখ করেছিলেন। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য ছিল-

দেবলবর্ধনী, পৌরালী, ত্রাবণী, তানলতিকা, দেহ্যা, শার্দূলী, ভিন্নলতিকা, রবিচন্দ্র, ভিন্নপৌবালী, দ্রাবিড়ী, পিঞ্জরীম পার্বতী, টঙ্ক।

বৃহদ্দেশীর রাগ পরিচয়
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠশতাব্দী পর্যন্ত রাগ-ভিত্তিক সঙ্গীতের ধারায় গ্রামরাগের আদিরূপের সাথে যুক্ত হয়েছিল আরও বহু দেশী রাগ। এর ভিতরে শার্দুলের উল্লেখিত রাগগুলোও ছিল। এই সময়ের ভিতরে গ্রামরাগের পরিবর্তে শুধু রাগ শব্দটিই প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিলে। এই সময়ে মতঙ্গ তাঁর রচিত বৃহদ্দেশী গ্রন্থে- সেকালের প্রচলিত রাগের কাঠামোগত পরিচয়ের পাশাপাশি রাগের শ্রেণিকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর মতে গীত ছিল ৭ প্রকার। এগুলো হলো- চোক্ষ, ভিন্নকা, গৌড়িকা, রাগগীতি, সাধারণী, ভাষা ও বিভাষা।

মোট কথা ভরত থেকে মতঙ্গের আমল পর্যন্ত গীতের প্রকরণ করা হয়েছিল, গ্রামরাগ এবং অন্যান্য দেশী রাগের ভিত্তিতে। তাই গীতের শ্রেণিকরণের সূচনা হয়েছিল গ্রামভিত্তিক। তখন এর সাধারণ নাম ছিল গ্রামরাগ। ভরতের আমলে জাতিগানের আড়ালে গ্রামরাগ চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জাতিগানের শ্রেণিকরণ করা হয়েছিল গ্রামরাগের ভিত্তিতে। পরবর্তী সময়ে রাগের শ্রেণিকরণে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিল গীত। গীত ও রাগের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের একটি সূত্র পাওয়া যায় বৃহদ্দেশীতে। বৃহদ্দেশীতে উল্লিখিত সূত্রটি হলো- 'গীতে স্বরাদির বিন্যাসে যে দশলক্ষণ লক্ষিত হয়, সেটিই রাগ। তাদের কোথাও অংশ, গ্রহ, অপন্যাস, ন্যাস ও স্বরাদির আরোপ হয়; এইগুলি মন্দ্রত্ব এবং তারত্ব,- এই দুটির পরিপ্রেক্ষিতে যোজিত হয় এবং কোথাও অল্পত্ব, কোথাও বহুত্ব পরিলক্ষিত হয়। এতদ্ব্যতীত আক্ষেপ, নিষ্কাম, প্রসাদিক এবং অন্তরা,- এই পাঁচপ্রকার ধ্রুবাগানেও (নাট্যসঙ্গীতে) গ্রামসমূহ সংযোজিত হয়।[পৃষ্ঠা: ১৮৭-১৮৮]

মতঙ্গ তাঁর সময়ের প্রচলিত রাগগুলোর প্রকৃতি অনুসারে গ্রামরাগ এবং অন্যান্য দেশী রাগগুলোকে শ্রেণিকরণে 'গীত' শব্দটিকে শব্দ-ঊর্ধ্বক্রমবাচকতার সোপানে বিন্যস্ত করেছিলেন। এই শ্রেণি বিভাজনের উচ্চধাপে ছিল গ্রাম। এরপর নিম্নক্রমিক ধারাটি ছিল- গ্রামরাগ> জাতিরাগ।

এই ধারায় গ্রামরাগ, গ্রামরাগজাত রাগ ও দেশী রাগের একটি সাধারণ পরিচয় হিসেবে পরিচয় লাভ করেছিল। 
 বৃহদ্দেশীতে গীতের বিভাজন করা হয়েছিল গ্রামরাগ এবং দেশী রাগের ভিত্তিতে। এই সূত্রে  গীতের বাইরে এসে অতিরিক্ত আরো কয়েকটি রাগপ্রকৃতিকে রাগবর্গীকরণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এগুলো ছিল- ভাষারাগ, বিভাষারাগ, অন্তরভাষারাগ, উপরাগ। প্রতিটি ভাগে কতগুলো রাগ ছিল, তার সংখ্যা নির্দেশ করা হয়েছে।  সঙ্গীতরত্নকরের রাগবিবেকাধ্যায়ের ২-৩ শ্লোকে বলা হয়েছে- পাঁচটি গীতির আশ্রয়হেতু গ্রামরাগ পাঁচ প্রকার। যথা- শুদ্ধা, ভিন্না, গৌড়ী, বেসরা ও সাধারণী।

বৃহদ্দেশীতে বর্ণিত গীতিপ্রকরণের তালিকা

  • চোক্ষ বা শুদ্ধ: মন্দ্র, মধ্য, তার সপ্তকে যার বিস্তার ছিল এবং ঋজু (সরল), ললিত (মনোহর), সমতাগুণসম্পন্ন (সামঞ্জস্যপূর্ণ) স্বর ও শ্রুতি দ্বারা পূর্ণিত রাগগুলোকে বলা হয়েছে চোক্ষ বা শুদ্ধরাগ। আর এই জাতীয়ে রাগের শ্রেণিগত নাম- চোক্ষরাগ বা শুদ্ধরাগ। এসকল রাগের আগে চোক্ষ শব্দ ব্যবহৃত হতো। এই জাতীয় রাগ ছিল- ৫টি। এগুলো হলো- শুদ্ধষাড়ব, শুদ্ধপঞ্চম, শুদ্ধকৈশিকমধ্যম, শুদ্ধসাধারিত, শুদ্ধকৌশিক
     
  • ভিন্নরাগ: কোনো না কোনো মূল রাগকে ভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশের সূত্রে যে সকল রাগের উদ্ভব হয়েছিল। তাদেরকে ভিন্নকা বা ভিন্নরাগ নামে অভিহিত করা হয়েছিল।  এই জাতীয় রাগ ছিল ৫টি। এগুলো হল- ভিন্নষড়্‌জ, ভিন্নতান, ভিন্নকৈশিকমধ্যম, ভিন্নকৈশিকভিন্নপঞ্চম
     
  • গৌড়িকা: এই জাতীয়ে রাগের ক্রিয়াত্মক অংশ হিসেবে ওহাটি যুক্ত ছিল। উল্লেখ্য, চিবুক বক্ষ বরাবর রেখে গমকযুক্ত মন্দ্র ও অতিদ্রুত গতিতে, হ-কর বা ও-কারযুক্ত ধ্বনি উচ্চারিত হতো। এর বিস্তার ছিল মন্দ্র, মধ্য ও তার সপ্তক ব্যাপী। এই জাতীয় রাগের সংখ্যা ছিল ৪টি। গৌড়ী শ্রেণির রাগের নামের শুরুতে গৌড়ী বা গৌড় ব্যবহৃত হতো।এগুলো হলো- গৌড়ীকৈশিকমধ্যম, গৌড়কৈশিক, গৌড়পঞ্চম।
     
  • রাগগীতি: এই শ্রেণির রাগে বিচিত্র ধরনের মনোহর গমক ব্যবহৃত হতো। এতে ব্যবহৃত হতো প্রসন্ন এবং সমপর্যায়ের গমক ব্যবহৃত হতো। এই রাগে স্থায়ী, আরোহ, অবরোহ এবং সঞ্চারী বর্ণযুক্ত হতো। এই জাতীয় রাগ ছিল ৮টি । এগুলো হলো-  টক্ক, টক্ককৈশিক, বেসরষাড়ব, বোট্ট, মালবকৈশিক, মালবপঞ্চম, সৌবীর ও হিন্দোলক। এই রাগগুলোকে বেসরা (বেগযুক্ত) রাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
     
  • সাধারণী (৭টি রাগ): ককুভ, গান্ধারপঞ্চম, নর্ত, ভম্মাণমাণপঞ্চম, রূপাসাধারিত, শক, ও ষড়্‌জকৈশিক।
  • ভাষা (১৫টি):  মূল রাগের ভিন্নভাবে উপস্থাপনের সূত্রে ভাষারাগের উদ্ভব হয়েছিল। যাষ্টিকের মতে- ভাষারাগসমূহ গ্রামরাগ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ভাষা থেকে বিভাষা (বিভাসিকা) রাগসমূহ উদ্ভব হয়েছে। ভাষারাগগুলো হলো-
    • টক্ক (রাগগীতির অন্তর্গত গ্রামরাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১৬টি। এগুলো হলো- ত্রবণা, ত্ররোণদ্ভবা, বেরঞ্জিকা, ছেবাটী, মালবেসরিকা, গুর্জরী, সৌরাষ্ট্রী, সৈন্ধবী, বেসরী, পঞ্চম, রবিচন্দ্রা, অস্বাহীরী, ললিতা, কোলাহলী, মধ্যমগ্রামদেশী, গান্ধারপঞ্চমী।
    • মালবকৈশিক (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৮টি। এগুলো হলো- শুদ্ধা (পৌরালী), আদ্যবেসরিকা, হর্ষপুরী, মাঙ্গলী, সৈন্ধবী, আভীরী, খঞ্জরী, গুঞ্জরী।
    • ককুভ (সাধারণী গীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৭টি। এগুলো হলো- কাম্বোজা, মধ্যমগ্রামিকা, সালবাহনিকা, ভাবর্ধনী, মুহরী, শকমিশ্রিতা, ভিন্নপঞ্চমী
    • হিন্দোল  (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৫টি। এগুলো হলো- বেসরী, প্রথমমঞ্জরী, ছেবাটী, ষড়্‌জমধ্যমা, মধুরী (মধুকরী)।
    • পঞ্চম (শুদ্ধ বা চোক্ষ গীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১০টি। এগুলো হলো- আভীরী, ভাবিনী, মাঙ্গালী, সৈন্ধবী, গুর্জরী, দাক্ষিণাত্যা, আন্ধ্রী (অন্ধালী), তানোদ্ভবা, ত্রাবণী (ত্রাপণী) ও কৈশিকী।
    • ভিন্নষড়্‌জ (ভিন্ন গীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৯টি। এগুলো হলো- বিশুদ্ধা, দাক্ষিণ্যাত্যা, গান্ধারী, শ্রীকণ্ঠী, পৌরালী, মাঙ্গলী, সৈন্ধবী, কালিন্দী ও পুলিন্দী।
    • সৌবীর  (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৪টি। এগুলো হলো- সৌবীরী, বেগমধ্যা, সারিতা ও গান্ধারী।
    • ভিন্নপঞ্চম (ভিন্ন গীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৪টি। এগুলো হলো- শুদ্ধভিন্না, বরাটী, ধৈবতভূষিতা এবং বিশালা।
    • মালবপঞ্চম (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১টি। রাগটি হলো- ভাবিনী (লোকভাবিনী)
    • বোট্ট (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১টি। রাগটি হলো- মঙ্গল
    • টক্ককৈশিক (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ৩টি। এগুলো হলো-মালবা, ভিন্নললিতা ও দ্রাবিড়ী
    • বেসরষাড়ব: (রাগগীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ২টি। এগুলো হলো- বাহ্যষাড়ব ও নাদ্যা।
    • ভিন্নতান (ভিন্ন গীতির অন্তর্গত মূল রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১টি। রাগটি হলো-তানোদ্ভবা।
    • গান্ধারপঞ্চম (সাধারণী গীতের অন্তর্ভুক্ত রাগ): এই রাগের অধীনস্থ রাগের সংখ্যা ১টি। রাগটি হলো-গান্ধারী।
    • পঞ্চম ষাড়ব (উপরাগ): এর রাগের উপরাগের অন্তর্গত রাগ শক। এটি রেবাগুপ্ত নামক উপরাগের অধীনস্থ রাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

    বৃহদ্দেশীতে বলা হয়েছে ভাষা ভেদের গানের বিচারে- ভাষা হলো প্রকরণ। মূলত রাগ হিসেবে ভাষা হলো গ্রাম রাগের প্রকারভেদ। এই শ্রেণির রাগগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- মূল, সঙ্কীর্ণ, দেশজ ও ছায়ামাত্রাশ্রবা। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শার্ঙ্গদেবের রচিত সঙ্গীতরত্নাকরে একে ভিন্ন নামে উপস্থাপিত হয়েছে।

    • মূল বা মুখ্য: যা অপরের উপর নির্ভরশীল নয়। এই শ্রেণীর রাগের মধ্যে মুখ্য রাগগুলো হলো- শুদ্ধা, আভীরী, রগন্তী, তিন প্রকার মালববেসরী।
    • স্বরখ্যা: স্বরের নামে যা উৎপন্ন হয়েছে।
    • দেশজ বা দেশখ্যা: দেশের নামে নামকরণ হয়েছে
    • উপরাগজা: উল্লিখিত তিনটি প্রকরণের বাইরের পৃথক প্রকরণ
       
  • বিভাষ (১২টি)। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রচিত সঙ্গীত রত্নকরে বিভাষা রাগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ২০টি। এগুলোকে কয়েকটি গ্রামরাগের অধীনে রাখা হয়েছিল। যাষ্টিকের মতে- ভাষারাগসমূহ গ্রামরাগ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ভাষা থেকে বিভাষা (বিভাসিকা) রাগসমূহ উদ্ভব হয়েছে।

    সঙ্গীতরত্নাকরে বর্ণিত বিভাষা রাগের তালিকা

    • টক্ব গ্রামরাগ: বিভাষা ৪টি। আন্ধ্রী (আন্ধালী), গুর্জরী, দেবারবর্ধনী ও ভাবনী
    • টক্ককৈশিক গ্রামরাগ। বিভাষা ১টি। দ্রাবিড়ী
    • মালবকৈশকি গ্রামরাগ: বিভাষা ২টি। কাম্ভোজী ও এর মতো দেববর্ধনী 
    • পঞ্চম গ্রামরাগ। বিভাষা ২টি। ভাষ্মানী ও আন্ধালিকা
    • বেসরষাড়ব গ্রামরাগ। বিভাষা ২টি। পার্বতী ও শ্রীকণ্ঠী
    • ভিন্নপঞ্চম গ্রামরাগ। বিভাষা ১টি। কৌশলী
    • ভিন্নষড়্জ গ্রামরাগ। বিভাষা রাগ ৪টি পৌরালী, মালবা, কালিন্দী ও দেবারবর্ধনী।
    • সৌবীর গ্রামরাগ : বিভাষা ৩টি। আভিরীরিকা, ভোগবর্ধনী ও মধুকরী।
    • পল্লবী

রাগের শ্রেণিকরণের ধারায় আরও কিছু রাগের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলো হলো- অন্তরভাষা রাগ ও উপরাগ।

  • অন্তরভাষা (৩টি)। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে যাষ্টিক গীতের তিনটি প্রকরণের কথা বলেছিলেন। এগুলো হলো- ভাষা, বিভাষা ও অন্তরভাষা। [বৃহদ্দেশী। রাগ। পৃষ্ঠা: ১৩৩-১৩৪]। অন্তরভাষা হিসেবে পাওয়া যায় ৩টি রাগের নাম। এগুলো হলো- ভাসবলিতা, কিরণাবলী ও শকনলিতা
  • উপরাগ: মূলধারার এই রাগগুলোর বাইরে লৌকিক গানের সূত্রে আরও কিছু রাগকে বিবেচনায় আনা হয়েছিল। এই রাগগুলোকে বলা হয়েছে উপরাগ। উপরাগগুলো তৈরি হয়েছিল গ্রামরাগের ছায়া অবলম্বনে। বৃহদ্দেশীতে এইরূপ তিনটি উপরাগের নাম পাওয়া যায়। এগুলো হলো- পঞ্চমষাড়ব, রেবাগুপ্ত ও টক্কসৈন্ধব।  শার্ঙ্গদেব তাঁর সঙ্গীতরত্নাকরে এর বাইরে আরো পাঁচটি উপরাগের উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো- শকতিলক, কোকিলাপঞ্চম, ভাবনাপঞ্চম, নাগগান্ধার ও নাগপঞ্চম।

মূলত খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভিতরে আরও বহুবিধ রাগের উৎপত্তি হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সুলতান আলাউদ্দীন খিলজির সভাকবি- আমির খসরু, দেশী রাগের চর্চার পাশাপাশি আরব-পারশ্যের রাগের সংমিশ্রণে নতুন কিছু রাগ তৈরি করেছিলেন।

খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর ভিতরে ভারতীয় রাগসঙ্গীতের ধারায় বহু প্রচীন রাগ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। আবার দেশীর সুরাবলম্বনে নতুন নতুন রাগের উদ্ভব হয়েছিল।  খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে লোচন শর্মার রচিত 'রাগতরঙ্গিনী' গ্রন্থে এরূপ রাগের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে ৬টি রাগকে আদি রাগ হিসেবে চিহিত করা হয়েছিল। এগুলো হলো- ভৈরব, কৌশিক, হিন্দোল, দীপক ও শ্রী

তিনি পারশ্যের রাগকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কাঠামোতে তৈরি করেছিলেন ইমন রাগ। পরে এই রাগের সাথে অন্যান্য রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করেছিলেন ইমন-পুরিয়া, ইমন-ভূপালী, ইমন-বিলাবল, ইমন বেহাগ, ইমন কল্যাণ। ফকিরুল্লা'র রাগ দর্পণ গ্রন্থ থেকে ১২টি এরূপ ১২টি রাগের তালিকা পাওয়া যায়। এর বাইরে পাওয়া যায়-

  • দেওয়ালি (মুয়সাফ্‌ফেগ): বীরারী, মালশ্রী, দুগাহ, লুসায়ণীর মিশ্রণ
  • মহীর: টোড়ি, পঞ্চগাহ এবং মুহাইয়ীর গোশা-র মিশ্রণ
  • জিলফ: ঘনম, পূরবী, শাহনাজ, খট-এর মিশ্রণ
  • উশশাক: গৌরী, ফরঘানা, সারঙ্গের মিশ্রণ
  • সরপর্দা: বিলাবল, গৌড়-সারঙ্গ রাস্তের মিশ্রণ
  • ফিরোদস্ত: কানাড়া ও অন্যান্য কিছু রাগের মিশ্রণ
  • ইমনী: ইমনের সাথে নীরীজ মিশ্রণ
  • বাখরজ: দেশকারের সাথে বাখরজের মিশ্রণ
  • সাজগিরী: পূরবী, বিভাস, গৌরী, গুণকেলী ও ইরাকের মিশ্রণ।
  • ইমন-বসন্ত: ইমন ও বসন্তের মিশ্রণ
এছাড়া তিনি প্রণয়ন করেছিলেন- ঝিঁঝিট, যমনী, তুরস্ক-গৌড়, তুরস্ক টোড়ি, বাহার, আলাইয়া বিলাবল, সাহানা, অাড়ানা, মোহনী. সুহ. সুখরাই, রুলীক, মারু, পিলু, বারওয়া, লুম ইত্যাদি।
 

তথ্যসূত্র:
  • নাট্যশাস্ত্র (চতুর্থ খণ্ড)। ভরত। বঙ্গানুবাদ সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। নবপত্র প্রকাশন। পঞ্চম মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৪।
  • বঙ্গীয় শব্দকোষ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • বৃহদ্দেশী। মতঙ্গ। রাজ্যেশ্বর মিত্র সম্পাদিত। সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার। কলকাতা। ১৯৯২।
  • ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস । প্রথম খণ্ড। স্বামী প্রজ্ঞানন্দ
  • ভারতীয় সঙ্গীতকোষ। শ্রীবিমলাকান্ত রায়চৌধুরী। বৈশাখ ১৩৭২।
  • সঙ্গীতরত্নাকর। সুরেশচন্দ্র অনূদিত।  রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা। ২২ শ্রাবণ ১৪০৮।