গান্ধারী
ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্রে বর্ণিত গ্রামরাগ , জাতিগান, ভাষারাগ , বিভাষা রাগ বিশেষ।

গান্ধার নামক স্বরের নামানুসারে এর নাম রাখা হয়েছিল গান্ধারী রাগ বা জাতি । এই রাগে অংশস্বর থেকে পঞ্চম স্বরের পরে তারগতি হতে পারে। ন্যাস স্বর বার নিম্নস্থ স্বরসমূহে মন্দ্র গতি হতে পারে।এতে মধ্যমসমূহের প্রয়োগ অল্প আর ঋষভের প্রয়োগ অল্পতর। ঋষভধৈবত স্বরসঙ্গতি। এতে ষড়্‌জ, তার সপ্তকে গাওয়া হয়।

গান্ধারী গ্রামরাগ ভিত্তিক জাতিগানের পরিচয়:

গ্রাম:  মধ্যমগ্রাম
জাতি প্রকৃতি: শুদ্ধ
স্বরজাতি:
  • সম্পূর্ণ: সকল স্বর ব্যবহৃত হবে। তবে ঋষভধৈবতের অল্পত্ব হবে। ম ধ রগ সুরশৈলী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • ষাড়ব: ঋষভ বর্জিত হবে।
  • ঔড়ব: ঋষভধৈবত বর্জিত হবে।  ম গ ম সুরশৈলী ব্যবহৃত হয়।খ

অংশস্বর: গান্ধার, ষড়্‌জ, মধ্যম, পঞ্চম এবং নিষাদ
গ্রহস্বর: গান্ধার, ষড়্‌জ, মধ্যম, পঞ্চম এবং নিষাদ
ন্যাস স্বর: গান্ধার
অপন্যাস: ষড়্‌জ এবং  পঞ্চম
রস: অংশস্বর গান্ধার ও নিষাদ হলে করুণ হয়। মধ্যম ও পঞ্চম বহুল হলে শৃঙ্গার ও হাস্য হয়।

এর ব্যবহার ছিল ধ্রুবা গানে।  নাটকের তৃতীয় প্রেক্ষণে করুণ রসে এর প্রয়োগ ছিল। তাল হিসেবে ব্যবহৃত হত চচ্চৎপুট।  এই গান এককল চিত্রামার্গে মাগধীগীতিতে, দ্বিকলে বার্তিক মার্গে সম্ভাবিতা গীতি এবং চতুষ্কলে দক্ষিণামার্গে পৃথুলা গীতিতে ব্যবহৃত হতো।  

সঙ্গীতরত্নাকরে এই রাগের যে প্রস্তার দেওয়া হয়েছে, তা নিচে দেওয়া হলো-

এই জাতির সাথে অন্য জাতির মিশ্রণে সৃষ্ট বিকৃত জাতিসমূহ।  

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীতে ভরতের পুত্র ও শিষ্য শার্দুল এই রাগকে ভিন্নষড়্‌জ গ্রামরাগের মূল ভাষারাগ এবং মালবপঞ্চম গ্রামরাগের অন্তর্গত বিভাষা রাগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নাটকের  নীচজাতীয় ব্যক্তিরা এই গান পরিবেশন করতেন । এই রাগে মধ্যমের প্রাধান্য ছিল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মতঙ্গের রচিত বৃহদ্দেশীতে [পৃষ্ঠা: ২৪৮ শার্দুলের উদ্ধৃতিতে এই রাগের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

গ্রামরাগ: ভিন্নষড়্‌জ
রাগ প্রকৃতি: ভাষারাগ
জাতি: ষাড়ব - ষাড়ব [ঋষভ বর্জিত]
অংশস্বর: গান্ধার
ন্যাস স্বরর: মধ্যম

বৃহদ্দেশীতে বর্ণিত আক্ষিপ্তিকা  নিচে তুলে ধরা হলো।

গান্ধারী বিভাষারাগ
খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীতে ভরতের পুত্র ও শিষ্য শার্দুল এই রাগকে মালবপঞ্চম গ্রামরাগের অন্তর্গত বিভাষা রাগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মতঙ্গের রচিত বৃহদ্দেশী গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ২৪৫] শার্দুলের উদ্ধৃতিতে এই রাগের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা হলো-

গ্রামরাগ : মালবপঞ্চম
রাগ প্রকৃতি:  বিভাষারাগ
জাতি:  সম্পূর্ণ- সম্পূর্ণ
অংশস্বর:  গান্ধার
ন্যাসস্বর: পঞ্চম
রস: করুণ

বৃহদ্দেশীতে এই বিভাষা রাগের যে আলাপ দেওয়া হয়েছে, তা হলো-


গান্ধারী ভাষারাগ
খ্রিষ্টীয় চতুর্থ পঞ্চম শতাব্দীর সঙ্গীতজ্ঞ যাষ্টিকের মতে এই রাগটি ছিল ভিন্নষড়্‌জ গান্ধারপঞ্চম, ও সৌবীর গ্রামরাগের ভাষা রাগ। বৃহদ্দেশীতে [পৃষ্ঠা: ১৯২-১৯৩] যাষ্টিকের উদ্ধৃতিতে ভিন্নষড়্‌জ গ্রাম রাগের ভাষারাগ হিসেবে উল্লেখ আছে।  এর রাগ পরিচিতি হিসেবে উল্লেখ আছে- এটি সঙ্কীর্ণা রাগ। এই রাগে গান্ধার স্বরের বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। গান্ধার ও ধৈবতের মধ্যে স্বরসঙ্গতি হয়।

ভিন্নষড়্‌জ -এর গান্ধারী ভাষারাগ পরিচিতি

গ্রাম: ষড়্‌জ গ্রাম
গ্রামরাগ: ভিন্নষড়্‌জ
রাগ প্রকৃতি: ভাষারাগ
জাতি: ঔড়ব -ঔড়ব [পঞ্চম ও ঋষভ বর্জিত। পঞ্চম যুক্ত হলে- ঔড়ব -ঔড়ব রাগটি]
অংশস্বর: ধৈবত
ন্যাস স্বর: ধৈবত

বৃহদ্দেশী থেকে থেকে এর আক্ষিপ্তিকা দেওয়া হলো-ো-

গান্ধারপঞ্চম -এর অন্তর্গত গান্ধারীর ভাষারাগ পরিচিতি
এই রাগে ষড়্‌জ ও গান্ধারের প্রাধান্য থাকে।

গ্রাম: ষড়্‌জ গ্রাম
গ্রামরাগ: গান্ধারপঞ্চম
রাগ প্রকৃতি: ভাষারাগ
জাতি: সম্পূর্ণ- সম্পূর্ণ
অংশস্বর: ধৈবত
ন্যাস স্বর: ধৈবত

সৌবীর -এর অন্তর্গত গান্ধারীর ভাষারাগ পরিচিতি
বৃহদ্দেশীতে [পৃষ্ঠা: ১৯২-১৯৩] যাষ্টিকের উদ্ধৃতিতে সৌবীর গ্রামরাগের ভাষারাগ হিসেবে উল্লেখ আছে। এই গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ২৩২] গান্ধারীর রাগ পরিচিতি হিসেবে উল্লেখ আছে- এটি সম্পূর্ণ জাতীয় রাগ এবং করুণ রসে প্রযোজ্য।

গ্রাম: ষড়্‌জ গ্রাম
গ্রামরাগ: সৌবীর
রাগ প্রকৃতি: ভাষারাগ
জাতি: সম্পূর্ণ
অংশস্বর: নিষাদ
ন্যাস স্বর: ষড়্‌জ

বৃহদ্দেশী থেকে থেকে এর আক্ষিপ্তিকা দেওয়া হলো-

মোগল যুগের গান্ধারী
রাগটি মোগল আমলে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল সদারঙ্গের রচিত খেয়াল গানের মাধ্যমে। গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত সঙ্গীতচন্দ্রিকাতে সদরাঙ্গের রচিত একটি খেয়াল গান পাওয়া যায় [পৃষ্ঠা: ৮৫৬]।  ভাতেখণ্ডেজির ঠাট বিন্যাসে রাগটিকে আশাবরী ঠাটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই রাগে জ্ঞ, দ, ণ এবং দুই ঋষভ ব্যবহৃত হয়। এর আরোহণে শুদ্ধ ঋষভ এবং অবরোহণে কোমল ঋষভ ব্যবহৃত হয়। এর আরোহ অনেকটা জৌনপুরীর মতো এবং অবরোহণে ভৈরবী -এর মতো।
আরোহণ : ‌স র ম প  দ ণ র্স।
অবরোহণ: র্স দ প, ণ দ প, দ ম প, জ্ঞ ঋ স।
ঠাট: আশাবরী
জাতি : ষাড়ব (গান্ধার বর্জিত)-সম্পূর্ণ (বক্র)।
বাদীস্বর: কোমল ধৈবত।
সমবাদী স্বর: কোমল গান্ধার।
অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ।
সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর।

তথ্যসূত্র:
  • নাট্যশাস্ত্র (চতুর্থ খণ্ড)। ভরত। বঙ্গানুবাদ: ডঃ সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডঃ ছন্দা চক্রবর্তী। নবপত্র প্রকাশন।ডিসেম্বর ২০১৪। পৃষ্ঠা: ১৯
  • বৃহদ্দেশী। মতঙ্গ। সম্পাদনা রাজ্যেশ্বর মিত্র। বিশ্বভারতী, কলকাতা। পৃষ্ঠা ১১০-১১৩।
  • সঙ্গীতমকরন্দঃ। নারদ। সম্পাদনা ও ভাষান্তর ডঃ প্রদীপ ঘোষ। রিসার্চ ইনস্টিটিগুট অব ইন্ডিয়ান মিউকোলজি, কলকাতা ১লা মার্চ ১৯৮৮। পৃষ্ঠা ১৯
  • সঙ্গীতরত্নাকর। শার্ঙ্গদেব। সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা। ১৪০৮। পৃষ্ঠা: ৪১-৪২।
  • হিন্দুস্থানী সঙ্গীতপদ্ধতি দ্বাদশ খণ্ড। পণ্ডিত বিষ্ণু নারয়াণ ভাতখণ্ডে। সম্পাদনা ধরিত্রী রায় ও অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়। দীপায়ন কলকাতা। ১৩৯৯।