হারামণি'র গান
লুপ্ত রাগের পুনরুদ্ধার এবং তার প্রচারের উদ্দেশ্যে, কাজী নজরুল ইসলাম ও সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর যৌথ-উদ্যোগের পরিচালনায় একটি বেতার অনুষ্ঠান।

প্রেক্ষাপট: ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে বেতারের সাথে যুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম। এই তথ্যটি পাওয়া যায়- ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ ঢাকায় অবস্থানরত কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লেখা নজরুলের চিঠি থেকে।
     [দ্রষ্টব্য: কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লেখা নজরুলের পত্র]

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বেতারের নানা ধরনের অনুষ্ঠানে সাথে তাঁর সম্পৃক্ত থাকার কথা জানা যায়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগষ্ট জগৎ ঘটকের রচিত 'ঝুলন' গীতিচিত্র বেতার থেকে প্রচারিত হয়। নজরুল এই গীতিচিত্রের জন্য ৬টি গান রচনা করেছিলেন। এর কয়েক মাস পরে, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে লুপ্ত রাগের পুনরুদ্ধার এবং তা প্রচারের জন্য 'হারামণি' নামক একটি নতুন ধরনের ধারাবহিক অনুষ্ঠান শুরু করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবরের (রবিবার, ২১ আশ্বিন ১৩৪৬)এই অনুষ্ঠানটি প্রথম প্রচারিত হয়েছিল কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে। সময় ছিল ৮.১০-৮.২৯ মিনিট।

সে সময়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বহু রাগ চর্চার অভাবে অপ্রচলিত রাগে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম অপ্রচলিত পটমঞ্জরী রাগে 'আমি পথ-মঞ্জরি ফুটেছি আঁধার রাতে' [তথ্য]  এবং মনোরঞ্জনীরাগে  ' জানি পাব না তোমায় হে প্রিয় আমার [তথ্য] রচনা করেছিলেন। গান দুটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়- ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুলাই (সোমবার ১১ শ্রাবণ ১৩৪৩) নজরুলের সাথে রেকর্ড কোম্পানির চুক্তিপত্রে।

লুপ্তপ্রায় রাগের সুরে নজরুল ইসলামের গান রচনা করাটা ছিল, বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতো। ফলে তাঁর এই ধরনের গান রচনায় কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না। মূলত বেতারে 'হারামণি'র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতার সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর এই বিশেষ কাজের সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন সেকালের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পণ্ডিত সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। ধারাবাহিকভাবে কলকাতা বেতার থেকে প্রকাশিত হারামণির সকল আসরেই- সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী অপ্রচলিত রাগগুলোর  ব্যাখ্যা দিতেন, আর নজরুল ইসলাম সে সকল রাগের তথ্য এবং সুরের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে নতুন গান রচনা করতেন। এই সময় তিনি আমির খসরু রচিত গ্রন্থাবলি এবং নবাব আলী রচিত 'মা'রিফুন্নাগমাত' গ্রন্থের প্রচুর সাহায্য নিয়েছেন। এছাড়া সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী'র কাছ থেকে সংস্কৃত ভাষায় রচিত রাগ বিষয়ক গ্রন্থাদি সম্পর্কে অবহিত হয়ে, সেখান থেকে তথ্যগত সাহায্য নিয়েছেন।

'হারমাণি' প্রতি মাসে একবার হতো। এই ধারার প্রথম গানটি ছিল 'অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী'। ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত মাসিক এই অনুষ্ঠানটির কোনো শ্রবণ নমুনা পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, 'হারামণি' অনুষ্ঠানের জন্য একটি খাতা ছিল। এই খাতাটি নজরুল ইসলামের জীবদ্দশাতেই হারিয়ে যায়।

বেতার জগৎ পত্রিকার ১০ম বর্ষ ১৯শ সংখ্যা থেকে পরবর্তী সংখ্যা অনুসরণ করলে দেখা যায়, কয়েকটি মাসে হারামণি সম্প্রাচরিত হয় নি। এই মাসগুলো ছিল- ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে,
নানা সূত্র থেকে 'হারামণি'র ২৭টি অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়। কিন্তু প্রতি মাসে একটি অনুষ্ঠান হলে, ৩৩টি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। এবং নজরুলের রচিত গানের সংখ্যাও ৩৩টি হ‌ওয়া উচিৎ ছিল। অথচ এখন পর্যন্ত মোট ১৭টি গানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই গানগুলো হলো-
  1. অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি [হারমণি-১] [তথ্য]
  2. আঁধার ভীত এ চিত যাচে [তথ্য]
  3. আমি পথ-মঞ্জরি ফুটেছি আঁধার রাতে [তথ্য]
  4. কার ঝর ঝর বর্ষণ বাণী ( ঝর ঝর বর্ষণ বাণী) [তথ্য]
  5. ছেড়ে দাও মোরে আর হাত ধরিও না [তথ্য]
  6. জয় আনন্দ-ভৈরব [হারমণি-২[তথ্য]
  7. জাগো বিরাট ভৈরব যোগ সমাধি মগ্ন [তথ্য]
  8. নিশি রাতে রিম্‌ ঝিম্‌ ঝিম্‌ বাদল নূপুর [তথ্য]
  9. নীলাম্বরী শাড়ি পরি' নীল যমুনায় কে যায় [তথ্য]
  10. নৃত্যকালী শঙ্কর সঙ্গে নাচে [তথ্য]
  11. বল্‌ রাঙা হংসদূতী তার বারতা [তথ্য]
  12. বলেছিলে ভুলিবে না মোরে [তথ্য]
  13. বসন্ত এলো এলো এলো রে [তথ্য]
  14. বসন্ত মুখর আজি [হারমণি-৩] [তথ্য]
  15. বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে [তথ্য]
  16. মদালস ময়ূর-বীণা কার বাজে [হারমণি-৪] [তথ্য]
  17. সন্ধ্যামালতী যবে ফুল বনে ঝুরে [তথ্য]
প্রাসঙ্গিক তথ্য-সহ অনুষ্ঠানের কালানুক্রমিক তালিকা।

হারমানি'র অনুষ্ঠান শুরুর দিকে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছিল যে, প্রতি মাস  হারামণির একটি করে অধিবেশন হবে। কিন্ত ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে হারামণি প্রচারিত হয় নি। বেতার জগৎ পত্রিকার ১১শ বর্ষ, নবম ও দশম সংখ্যার (মে ১৯৪০) অনুষ্ঠান সূচীতে হারমণির সম্প্রাচার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। মূলত মে মাসের পুরো সময়ে   নজরুলের রচিত নজরুলের রচিত বা নজরুলের অংশগ্রহণ করেছেন এমন ৫টি অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়েছিল। সম্ভবত এই কারণে হারামণি'র নতুন আসর বাদ দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য এই মাসে কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো ছিল-

  • মহিলা মজলিস। নজরুলের রচিত 'সুগোপন' নাট। ৩ মে
  • কবিতা পাঠ (রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিন উপলক্ষে)। ৮ মে
  • নবরাগ মালিকা (নজরুল সৃষ্ট রাগ-ভিত্তিক সঙ্গীতানুষ্ঠান)। ১১ মে
  • জাগো সুন্দর কিশোর (শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত সঙ্গীতালেখ্য)। ২৪ মে
  • বাংলার গ্রাম (লোকসঙ্গীত-ভিত্তিক সঙ্গীতালেখ্য)। ২৫ মে

সূত্র:
  • নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। মার্চ ১৯৯৯।
  • বেতারজগৎ। ১০ম বর্ষ, ১৯শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৭৫১
  • বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ২১শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৩৫
  • বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ২৩শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৯২৬
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১ম সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৩৭
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা।  পৃষ্ঠা: ১৫৬
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ৫ম সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ২৬২
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ৭ম সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৩৪০, ৩৭৬
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৬৭১
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ২২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১২২৪
  • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ, ১৪শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৭৬৪
  • বেতার জগৎ। ১শ বর্ষ, ২৪শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১৩১৮
  • The Indian-Listener. 22 Sepetember 1939/Vol. IV No. 19. Page 1379
  • The Indian-Listener. 4 November 1939/Vol. IV No. 21. Page 1495
  • The Indian-Listener. 22 november 1939- Vol-IV-23 Page 1650
  • The Indian Listener, Vol, V No 14  page 1073]
  • The Indian Listener.  1941. Vol-VI-18. page 59