নজরুলসঙ্গীতের কালানুক্রমিক সূচি
চতুর্থ পর্ব
২০ বছর অতিক্রান্ত বয়স নজরুলের সাহিত্য-চর্চার সূচনা
এবং পল্টন থেকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন


১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার, ২৪ মে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ) কাজী নজরুল ইসলামের ১৯ বৎসর বয়স পূর্ণ হয়েছিল। তাঁর ২০ বৎসর বয়সের সূচনা হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ (রবিবার, ২৫ মে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ)। এই বয়সবর্ষ পূর্ণ হয় ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১০ই জ্যৈষ্ঠ (শনিবার, ২৪ মে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ)।
 

হাবিলদার-বেশে নজরুল।
[সূত্র: 'নজরুল অ্যালবাম' (অক্টোবর ১৯৯৪)। নজরুল ইন্সটিটিউট]

২৫-৩১মে ১৯১৯ (১১-৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬)
নজরুলের ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শুরু থেকেই করাচি সেনানিবাসে ছিলেন। এই সময়ে তিনি সাহিত্য-চর্চার মধ্যে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। কলকাতা থেকে পাওয়া পত্রপত্রিকা এবং তৎকালীন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিকদের রচিত রচনা পাঠ করেছেন। পাশাপাশি ছিল ফার্সি এবং উর্দু সাহিত্যের পাঠ। সাহিত্য-সৃষ্টির প্রেরণায় তিনি দু'চারটি কবিতা গল্প লিখেছেন এই সময়। তাঁর ১৯ বৎসর অতিক্রান্ত রচনার প্রায় সবই তিনি প্রকাশের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। যদিও সে সব লেখার অধিকাংশই পত্রিকার সম্পাদকরা বাতিল করে দিয়েছিলেন। নজরুল হতোদ্যম না হয়ে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠানোর কাজটি নিষ্ঠার সাথে করে চলেছিলেন। এই রকমই একটি  কবিতা ছিল 'ক্ষমা'। কবিতাটি তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। এই কবিতাটি জুলাই মাসে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল মুক্তি ' শিরোনামে।

জুন-জুলাই ১৯১৯ (১৮ জ্যৈষ্ঠ-১৫ শ্রাবণ ১৩২৬)
১১–১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬ বঙ্গাব্দ
নজরুলের ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের সূচনালগ্নেও তিনি করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। সৈনিকজীবনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এই সময় তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল সাহিত্যচর্চা। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সংগ্রহ করে তিনি নিয়মিত পাঠ করতেন। একই সঙ্গে তৎকালীন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যও পাঠ করতেন।

সাহিত্যপাঠের এই বিস্তৃত পরিসর তাঁর নিজের সাহিত্যসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাকে আরও প্রবল করে তোলে। ফলে করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে তিনি কবিতা, গল্পসহ বিভিন্ন ধরনের রচনা লিখতে শুরু করেন। তাঁর পূর্ববর্তী বয়সবর্ষে রচিত অনেকগুলো লেখা তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদের কাছে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব রচনার অধিকাংশই সে সময় প্রকাশিত হয়নি। সম্পাদকেরা তাঁর অনেক লেখা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বা প্রকাশের উপযোগী মনে করেননি।

তবু এতে নজরুল নিরুৎসাহিত হননি। প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও তিনি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা পাঠিয়ে যেতে থাকেন। সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের এই নিরন্তর প্রয়াসই পরবর্তীকালে তাঁর সাফল্যের পথ তৈরি করে।

এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ছিল ‘ক্ষমা’। নজরুল কবিতাটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’-য় প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। পরে কবিতাটি সম্পাদিত হয়ে ‘মুক্তি’ শিরোনামে পত্রিকাটির ১৩২৬ বঙ্গাব্দের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনা নজরুলের সাহিত্যজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। করাচি সেনানিবাসে বসে লেখা ও প্রকাশের জন্য পাঠানো এইসব রচনার মধ্য দিয়েই নজরুলের সাহিত্যিক সত্তা ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছিল। সৈনিকের কঠোর জীবনযাপনের অন্তরালে তিনি তখন নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে।

সম্ভবত ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের শেষভাগে অথবা মে মাসের প্রথমদিকে নজরুল ‘ক্ষমা’ কবিতাটি করাচি থেকে  বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার -র দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন।  কবিতাটি প্রকাশের জন্য অনুমোদিত হয় এবং ১৩২৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে প্রকাশিত হয়। তবে কবিতাটি ‘ক্ষমা’ নামে প্রকাশিত হয়নি; সম্পাদক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক এর নাম পরিবর্তন করে ‘মুক্তি’ রাখেন।
'...কবি নজরুলের প্রথম কবিতা 'ক্ষমা' নামে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ছাপার জন্য করাচী হইতে তিনি আমার নিকট পাঠাইয়া দেন। আমি উক্ত কবিতা, 'ক্ষমা'র পরিবর্তে 'মুক্তি' নাম দিয়া ১৩২৬ সনের শ্রাবণ মাসে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় প্রকাশ করি। ইহাই নজরুলে ছাপার অক্ষরে প্রথম কবিতা।'
উল্লেখ্য এই কবিতাটি পরে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ (১৯৩৮-৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত ' নির্ঝরঝর (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ, ১৯৩৮-৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) কাব্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

মোজাম্মেল হকের এই স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ‘মুক্তি’ই ছিল নজরুলের ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত প্রথম কবিতা। অর্থাৎ নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা হিসেবে সওগাত-এ প্রকাশিত ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’-র পর তাঁর প্রথম মুদ্রিত কবিতা ছিল ‘মুক্তি’।

আগষ্ট ১৯১৯ (১৬ শ্রাবণ-১৪ ভাদ্র ১৩২৬)
আগের মাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়কায়' নজরুলের 'ক্ষমা' নামক কবিতাটির মুক্তি নামে প্রকাশিত হয়েছিল। বিষয়টি তিনি সানন্দে মেনে নিয়েছিলেন। বিষয়টি জানা যায়, ১৯শে আগষ্টে (২রা ভাদ্র ১৩২৬) বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র কাছে পাঠানো নজরুলের একটি চিঠি থেকে। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন-
'By the by আপনারা যে 'ক্ষমা' বাদ দিয়ে কবিতাটির 'মুক্তি' নাম দিয়েছেন, তাতে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। এই রকম দোষগুলি সংশোধন করে নেবেন। বড্ড ছাপার ভুল থাকে, একটু সাবধান হওয়া যায় না কি? আমি ভালো, আপনাদের কুশল সংবাদ দিবেন।' [দেখুন: মূল পত্র]
চিঠিটি থেকে আরও জানা যায়, নজরুল তখন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা-র পরবর্তী সংখ্যার জন্য নতুন রচনা পাঠাচ্ছিলেন। তিনি একটি দীর্ঘ ‘গাথা’ এবং একটি ‘প্রায় দীর্ঘ’ গল্প পরবর্তী, অর্থাৎ কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। এর ফলে বোঝা যায়, করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করেও তিনি নিয়মিতভাবে সাহিত্যচর্চা ও পত্রপত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।

এই মাসে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্বামীহারা নামক একটি গল্প ।
  • গল্প: স্বামীহারা'
    এই গল্পটি সওগাত পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৬ (আগষ্ট ১৯১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তা 'রিক্তের বেদন' গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল।
  • সওগাত পত্রিকার মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন তাঁর " 'সওগাত ও  নজরুল' প্রবন্ধে লিখেছেন-
    '...নজরুলের দ্বিতীয় গল্প 'স্বামী-হারা' প্রকাশিত হয় প্রথম বর্ষ দশম সংখ্যা, ভাদ্র, ১৩২৬ সনের 'সওগাতে'...।
সেপ্টেম্বর ১৯১৯ (১৫ ভাদ্র- ১৩ আশ্বিন ১৩২৬)
এই মাসে করাচি সেনানিবাস থেকে নজরুলের পাঠানো একটি কবিতা সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটির নাম 'কবিতা-সমাধি'। কবিতাটি সওগাত-এর আশ্বিন ১৩২৬ বঙ্গাব্দ সংখ্যায়, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।  
কবিতা-সমাধি: সওগাতআশ্বিন ১৩২৬ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯১৯)। কবিতাটি কোনো কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয় নি। এটি বর্তমানে 'অগ্রন্থিত কবিতা' হিসেবে নজরুল রচনাবলীতে পাওয়া যায়।
অক্টোবর ১৯১৯ (১৪ আশ্বিন- ১৪ কার্তিক ১৩২৬)
এই মাসেও নজরুল করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। করাচির সামরিক জীবনের পাশাপাশি এ সময় তাঁর সাহিত্যচর্চা ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সঙ্গে পত্রযোগাযোগের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ পাঠাচ্ছিলেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে তাঁর দুটি রচনা প্রকাশিত হয়—একটি প্রবন্ধ এবং অন্যটি গল্প। রচনা দুটি প্রকাশিত হয় যথাক্রমে সওগাতবঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়
  • তুর্ক-মহিলার ঘোমাটা খোলা (প্রতিবাদী প্রবন্ধ)
    ভারতবর্ষ পত্রিকার ৭ম বর্ষ ১ম খণ্ডের ৩য় সংখ্যায় (ভাদ্র ১৩২৬), 'সঞ্চয়' বিভাগে হেমেন্দ্রকুমার রায়-এর 'তুর্ক-মহিলার ঘোমটা-খোলা' নামক একটি রচনা প্রকাশিত হয়েছিল [পৃষ্ঠা: ৪০৬-৪০৭]। এই রচনায় লেখক তৎকালীন আমেরিকান সংবাদপত্র  'New York Herald' -এ  লিখিত জনৈক লেখকের রচনা অনুসরণে তুর্কি-মহিলাদের সম্বন্ধে লেখেন- 'তুর্ক-রমণীরা মোটেই সুন্দরী নয়!' এই রচনার প্রতিবাদে নজরুল 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' নামক এই প্রবন্ধটি রচনা করেন এবং তা সওগাত পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। সওগাত পত্রিকার কার্তিক ১৩২৬ (অক্টোবর ১৯১৯) সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। এটিই ছিল পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের প্রথম প্রবন্ধ।  প্রবন্ধটি নজরুলের কোনো প্রবন্ধগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় নি। নজরুল রচনবলীতে অগ্রন্থিত রচনা হিসেবে পাওয়া যায়।

  • হেনা (গল্প)
    বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার কার্তিক ১৩২৬ সংখ্যায় এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পের লেখক পরিচিতি হিসেবে উল্লেখ ছিল- 'হাবিলদার, বঙ্গবাহিনী, করাচি'। গল্পটি পরে ' ব্যথার দান' গল্পগ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার  সম্পাদক মোজাম্মেল হক, তাঁর 'নজরুল ইসলাম ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি' প্রবন্ধে দাবি করেছেন যে,-
    '...তাঁহার প্রথম গদ্য লেখা ছোটগল্প 'হেনা' আমিই ছাপাইয়াছিলাম ১৩২৬ সনের কার্তিক মাসে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়'।
    প্রকৃতপক্ষে নজরুলের রচিত প্রথম গদ্য রচনা- ' বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী' প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সওগাত পত্রিকার 'জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬' সংখ্যায় এবং এই পত্রিকার দ্বিতীয় গদ্য রচনা স্বামীহারা' প্রকাশিত হয়েছিল সওগাত পত্রিকার ভাদ্র ১৩২৬ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯১৯) সংখ্যায়।
অক্টোবর ১৯১৯-এর এই পর্যায়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—নজরুলের সাহিত্যচর্চা তখন আর কেবল কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কবিতার পাশাপাশি গল্প ও প্রবন্ধ রচনার মধ্য দিয়েও তিনি নিজের সাহিত্যিক পরিচয় নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। করাচি সেনানিবাসের সৈনিকজীবনের মধ্যেই তাঁর লেখকসত্তা ক্রমে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

নভেম্বর ১৯১৯ (১৫ কার্তিক- ১৪ অগ্রহায়ণ ১৩২৬)

নভেম্বর ১৯১৯-এ নজরুল করাচি সেনানিবাসেই অবস্থান করছিলেন। এ মাসে তাঁর কোনো রচনা প্রকাশিত হয়নি। তবে এ সময় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প—‘ব্যথার দান’—প্রকাশের প্রস্তুতি এবং তা নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীকালে নজরুলের সাহিত্যজীবনের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।

‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ ও ‘ব্যথার দান’ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা-র কার্তিক ১৩২৬ বঙ্গাব্দ সংখ্যার মুদ্রণমান নিয়ে সম্পাদকমণ্ডলী সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে পরবর্তী সংখ্যা অন্য কোনো উন্নত প্রেস থেকে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে পত্রিকার সহ-সম্পাদক মোজাফ্ফর আহমদ তৎকালীন কলকাতার পরিচিত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া প্রেস-এর মালিক শ্রীরামরাখাল-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পত্রিকার সহ-সম্পাদক মোজাফ্ফর আহমদ, প্রেসের মালিক শ্রীরামরাখালের সাথে দেখা করেন। রামরাখাল প্রথম আলোচনায় শর্ত সাপেক্ষে রাজি হয়েছিলেন। শর্তটি ছিল-  পত্রিকায় কি প্রকাশিত হবে, তা তিনি আগে থেকে দেখবেন। এর পিছনে রামরাখালের সঙ্গত ব্যবসায়িক কারণ ছিল। কারণটি হলো- ইতিমধ্যে তাঁর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বিনয়কুমার সরকারের সম্পাদিত 'গৃহস্থ' নামক একটি পত্রিকা। এই পত্রিকায় ব্রিটিশ-বিরোধী বক্তব্য  প্রকাশের জন্য রামরাখাল সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। তাই তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা মোজাফ্ফর আহমদ প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপি দেখতে চেয়েছিলেন। এই শর্তে রাজি হয়ে, পত্রিকার জন্য লেখা পাণ্ডুলিপি রামরাখালে কাছে রেখে আসেন। এই পাণ্ডুলিপির ভিতরে ব্যথার দানন' গল্পটি ছিল।

এই গল্পে ছিল রাশিয়া'র লালফৌজেরর কথা। যেখানে ভারতীয় সৈনিকের লালফৌজে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা ছিল গরহিত কাজ। সে সময় ব্রিটিশ-ভারতে লালফৌজ বা রাশিয়া'র বীরত্বসূচক কথা ছিল নিষিদ্ধ। তাই গল্পটির জন্য রামরাখাল পত্রিকাটি প্রকাশ করতে রাজি হন নি। নজরুল যখন ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর বহু রচনা এবং সম্পাদিত পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এই তালিকায় ব্যথার দান' ছিল এমন এমন একটি গল্প, যা প্রকাশের আগেই সরকারের ভয়ে রামরাখাল বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। অবশ্য রামরাখাল  মোজাফ্ফর আহমদ-এর কাছে এই গল্পের উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন। গল্পটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল ' বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার 'মাঘ ১৩২৬' সংখ্যায়।

নভেম্বর ১৯১৯-এর এই ঘটনাটি নজরুলের সাহিত্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। করাচি সেনানিবাসে বসে তিনি তখন কেবল সাহিত্যচর্চাই করছিলেন না; তাঁর রচনায় সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি, রুশ বিপ্লব এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অন্তর্নিহিত প্রতিবাদও ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছিল। তাঁর পরবর্তী বিদ্রোহী সাহিত্যসত্তার বিকাশে এই সময়কার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ডিসেম্বর ১৯১৯ (১৫ অগ্রহায়ণ- ১৫ পৌষ ১৩২৬)
ডিসেম্বর ১৯১৯-এ নজরুল করাচি সেনানিবাসেই অবস্থান করছিলেন। এ সময় তাঁর সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছিল। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ফারসি সাহিত্য পাঠ এবং অনুবাদের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ' আশায়' নামের কবিতা।
  • আশায় (কবিতা)
    এটি মূলত হাফেজ শিরাজির একটি কবিতার অনুবাদ। কবিতাটি তিনি সবুজপত্র পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পত্রিকাটির সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী কবিতাটি প্রকাশ করার অনুমোদন দেন নি।

    এই সময় এই পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। চারুচন্দ্র কবিতাটি প্রবাসীতে প্রকাশ করেন। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী পত্রিকার পৌষ ১৩২৬ সংখ্যার (ডিসেম্বর ১৯১৯-জানুয়ারি ১৯২০) ২৩৯ পৃষ্ঠায়। [নমুনা] শিরোনাম ছিল 'আশায়' (হাফেজ)। কবিতাটির পাদটীকায় কবির নাম ছিল- '(হাবিলদার) কাজী নজরুল ইসলাম'। কবিতাটি পরে '' নির্ঝর' কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

    কবিতাটি প্রকাশের পর, নজরুল একটি পত্রে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছিলেন-
    'প্রবাসী'তে বেরিয়েছে ' সবুজপত্র '-এ পাঠানো কবিতা, এতে কবিতার মর্যাদা বেড়েছে কী কমেছে, তা আমি ভাবতে পারছি না। ' সবুজপত্র'-এর নিজস্ব আভিজাত্য থাকলেও ' প্রবাসী'র মর্যাদা একটুকও কম নয়। প্রচার আরও বেশি। তা ছাড়া আমি কবিতা লিখেছি, পারসিক কবি হাফেজের মধ্যে বাংলার সবুজ দূর্বা ও জুঁই ফুলের সুবাস আর প্রিয়ার চূর্ণ কুন্তলের যে মৃদু গন্ধের সন্ধান আমি পেয়েছি, সে-সবই তো খাঁটি বাংলার কথা, বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আনন্দরসের পরিপূর্ণ সমারোহ। কত শত বছর আগের পারস্যের কবি, আর কোথায় আজকের সদ্য শিশির-ভেজা সবুজ বাংলা। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রুক্ষ পরিবেশে মৃত্যু সমারোহের মধ্যে বসে এই যে চিরন্তন প্রেমিক-মনের সমভাব আমি চাক্ষুস করলাম আমার ভাষায়, আমার আপন জন বাঙালিকে সেই কথা জানাবার আকুল আগ্রহই এই এক টুকরো কবিতা হয়ে ফুটে বেরিয়েছে। জানি না জুঁই ফুলের মৃদু গন্ধ ও দূর্বা শ্যামলতা এর মধ্যে ফুটেছে কি-না। তবু বাঙালির সচেতন মনে মানুষের ভাব জীবনের এই একাত্মবোধ যদি জাগাতে পারে তবে নিজেকে ধন্য মনে করব। অবশ্য বাঙালির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ও যোগ্য বাহনে পরিবেশন করবার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আপনার। ...'

    পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে এই চিঠির একটি জবাব দিয়েছিলেন। এর উত্তরে নজরুল একটি চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিটি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের 'চলমান-জীবন' গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে ছাপা হয়েছে। চিঠিটি হলো-

    '....চুরুলিয়ার লেটুর দলের গান লিখিয়ে ছোকরা নজরুলকে কে-ই বা এক কানাকড়ি দাম দিয়েছে! স্কুল-পালানো ম্যাট্রিক পাশ-না-করা পল্টন-ফেরত বাঙালি ছেলে কী নিয়েই-বা সমাজে প্রতিষ্ঠার আশা করবে! আমার একমাত্র ভরসা মানুষের হৃদয়। হয়তো তা আগাছা বা ঘাসের মতো অঢেল খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু বাংলা দেশে তা যে দুর্লভ নয়, তার প্রমাণ আমি এই সুদূরে থেকেও পাচ্ছি। নিঃসঙ্কোচে ও নির্বিকারে প্রাণ দেওয়া-নেওয়া প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু মন দেওয়া যে স্থান-কাল দূরত্বের ব্যবধান মানে না, তাও উপলব্ধি করছি। ...'

জানুয়ারি ১৯২০ (১৬ পৌষ- ১৭ মাঘ ১৩২৬)
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাস নজরুলের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ সময় তিনি করাচি সেনানিবাসের সৈনিকজীবনের মধ্য থেকে সাময়িকভাবে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় অবস্থানকালে তাঁর সঙ্গে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও মুজাফ্ফর আহমদের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। এই সাক্ষাৎ পরবর্তীকালে নজরুলের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

কলকাতায় নজরুল
নজরুল কলকাতায় আসেন জানুয়ারি (মাঘ ১৩২৬) মাসে । কলকাতায় তিনি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেসে উঠেছিলেন। এই সময় তিনি  শৈলজানন্দের সাথে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে মুজাফ্ফর আহমদের সাথে দেখা করেন। এই প্রথম মুজাফ্ফর আহমদের সাথে শৈলজানন্দ ও নজরুলের প্রত্যক্ষ দেখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই তিনজনের বন্ধুত্ব বাংলা সাহিত্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নজরুল ও মুজাফ্ফর আহমদের সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে সাম্যবাদী ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে নজরুলের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কলকাতায় নজরুল প্রায় তিন দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি নিজ গ্রাম চুরুলিয়াতে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হন। তাঁকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার জন্য শৈলজানন্দ হাওড়া রেলস্টেশনে এসেছিলেন। শৈলজানন্দের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’-এ এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
        [সূত্র: 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে'/শৈলজানন্দ।]

সম্ভবত ৩১ জানুয়ারি (শনিবার, ১৭ মাঘ ১৩২৬) তিনি চুরুলিয়া থেকে আবার করাচি সেনানিবাসে ফিরে যান। করাচি সেনানিবাস থেকে তিনি কলকাতার নূর ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় দুটি গল্প পাঠিয়েছিলেন। গল্প দুটি উক্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এই মাসে। গল্প দুটি হলো-জানুয়ারি ১৯২০-এ নজরুলের জীবনে দুটি ধারা পাশাপাশি এগিয়ে চলেছিল। একদিকে তিনি ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন; অন্যদিকে তাঁর গল্প ও কবিতা কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রে প্রকাশিত হচ্ছিল। কলকাতায় এসে শৈলজানন্দ ও মুজাফ্ফর আহমদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁর সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে ওঠে।

ফেব্রুয়ারি ১৯২০ (১৮ মাঘ- ১৮ ফাল্গুন ১৩২৬)

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে কাজী নজরুল ইসলাম করাচি সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট বা বাঙালি পল্টনের সামরিক প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। ফলে ব্রিটিশ সরকার রেজিমেন্টটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পরিস্থিতিতে নজরুলও তাঁর সামরিক জীবনের অবসান এবং দেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

এ সময় তিনি তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। করাচি থেকে লেখা একটি চিঠিতে নজরুল বাঙালি পল্টন ভেঙে দেওয়ার সংবাদ জানিয়ে দেশে ফিরে শৈলজানন্দের কাছে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শৈলজানন্দ তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ কেউ ভোলে না কেউ ভোলে-এ সেই চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্মৃতিতে নজরুল লিখেছিলেন—  

'...পুরো একটি মাস পরে বেগুনীরঙের কালিতে লেখা একখানি চিঠি পেলাম। নজরুল লিখেছে, তাদের ঊনপঞ্চাশ বায়ুগ্রস্ত বাঙালী পল্টন ভেঙে দেবার কথা চলেছে। ভেঙেই যদি দেয় তো-'বল মা তারা দাঁড়াই কোথা?' আমার সেই পাশ বালিশটা ঘাড়ে তুলে নিয়ে সোজা উঠব গিয়ে তোমার আস্তানায়। তারপর যা থাকে কপালে!'
      [সূত্র: 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে'/শৈলজানন্দ।]

এই চিঠি থেকে বোঝা যায়, পল্টন ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাকে নজরুল শুধু একটি সামরিক প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি হিসেবে দেখেননি; এর সঙ্গে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার প্রশ্নটিও জড়িয়ে গিয়েছিল। প্রায় আড়াই বছরের সৈনিকজীবনের পর এবার তাঁকে নতুন জীবনের সন্ধান করতে হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় ফিরে সাহিত্যজীবনে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করার যে পথ তিনি গ্রহণ করেন, তার পূর্বপ্রস্তুতি মূলত এই সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।

এই মাসে নজরুলের রচিত বা প্রকাশিত কোনো নতুন রচনার নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায় না। তবে সাহিত্যচর্চা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে পত্র-পত্রিকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং ইতিমধ্যে তাঁর বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী, স্বামীহারা, হেনা, মেহের নিগার, ব্যথার দান, মুক্তি, আশায় প্রভৃতি রচনা প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনে মূলত সৈনিকজীবনের অন্তিম পর্যায় এবং সাহিত্যিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতির মাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
 

যুদ্ধ-ফেরত নজরুল ইসলাম।
[সূত্র: 'নজরুল অ্যালবাম' (অক্টোবর ১৯৯৪)। নজরুল ইন্সটিটিউট]

মার্চ ১৯২০ (১৭ ফাল্গুন- ১৮ চৈত্র ১৩২৬)

সৈনিকজীবনের অবসান ও কলকাতায় প্রত্যাবর্তন
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে কাজী নজরুল ইসলাম করাচি সেনানিবাস থেকে ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্ট বা বাঙালি পল্টনের সৈনিকজীবনের অবসান ঘটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। রেলপথে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ছিল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। প্রায় আড়াই বছরের সামরিক জীবন শেষ করে তিনি এবার সম্পূর্ণভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে প্রবেশের পথে এগিয়ে গেলেন।

নজরুল মার্চ মাসে করাচি থেকে সৈনিক জীবনকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন রেলগাড়িতে। এরপর রেলস্টেশন থেকে কি করে এবং কোথায় আশ্রয় পেয়েছিলেন, তা নিয়ে আছে নানা জনের নানা মত। যেমন-
  • বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের  স্মৃতিচারণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ফেব্রুয়ারি মাস অব্দি পলিটেকনিক কমার্স ডিপার্টমেন্ট আর বোর্ডিং হাউস-এ থাকতেন। এই মাসে তিনি বাসা বদল করে রামাকান্ত বোস স্ট্রিটের পলিটেকনিক বোর্ডিং-এ চলে আসেন। নজরুলকে এই নতুন বাসার ঠিকানা পত্র মারফত তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন।

    নজরুল করাচি থেকে সোজা চলে আসেন বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের এই নতুন হোস্টেলে। এই হোস্টেলে প্রথম কয়েকদিনের ঘটনা শৈলজানন্দ তাঁর 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে' গ্রন্থে লিখেছেন যে ভাবে-
আমাদের হোস্টেলে 'অতিথি' হয়ে থাকার কোনও আপত্তি ছিল না। গেস্ট চার্জ মাসের শেষে দিতে হয়। তার ওপর একখানা ফাঁকা সিটও পাওয়া গেছে আমাদের সিটের পাশেই। আনন্দের হাট বসে গেল আমাদের 'রুমে"। নজরুলের সেই মন-মাতানো অফুরস্ত হাসি আর গাঁন, যৌবনোচ্ছল প্রাণের প্রাচুর্য একে একে টেনে আনলে সবাইকে। প্রথমে এলো আমার সেখানকার সহপাঠী বন্ধুরা, তারপর এলেন বয়স্ক শিক্ষকের!

তিন চারটে দিন আমরা হোস্টেল ছেড়ে কোথাও গেলাম না। যাবার সময়ই বা কোথায়? গঙ্গায় স্নান আমার তখন বন্ধ হয়ে গেছে। ম্যালেরিয়ার কথা ভূলেই গেছি।'

কিন্তু এই আনন্দঘন দিন বেশিদিন বজায় ছিল না। হোস্টেলে আসার তিন-চার দিনের মাথায়- হোস্টেলের সুপারেন্টেড শৈলজানন্দকে জানান যে, নজরুল মুসলমান বলে হোস্টেলের চাকরা তাঁর এঁটো বাসন ধুতে অস্বীকার করছে।  তাছাড়া নজরুলের অবস্থানে মেসের অন্যান্য বাসিন্দার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল।

এরপর শৈলজানন্দ কলকাতার ২০, বাদুরবাগান রো (১ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট)-তে অবস্থিত তাঁর মাতামহের একটি খালি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু নজরুল সে প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে,  ৩২ কলেজ স্ট্রিটের ' বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি' অফিসে থাকাটাই শ্রেয় মনে করেছিলেন। পরে শৈলজানন্দ তাঁকে ' বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে পৌঁছে দিয়ে যান।  

'করাচী সেনানিবাস যখন ভেঙে দেওয়া হয় তখন কাজী নজরুল ইসলাম আমাকে পত্র লেখেন: আমাদের সেনানিবাস ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমি বাঁধনহারা, আমার কোন ঠিক ঠিকানা নাই। কোথায় যাব, কিছুই ঠিক করতে পারছি না।

পত্রোত্তরে আমি জানাইলাম "আপনি করাচী হইতে সোজা কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটস্থ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির আপিসে আসিয়া উপস্থিত হন। সেখানে আমার একটি বিশ্রামের কামরা আছে। সেখানে আপনাকে থাকিতে দিব।...

...এই সময় কবি নজরুল ইসলাম ১০ জন সৈনিক ও তাঁহাদের কীট ব্যাগসহ সাহিত্য সমিতির আপিসে আসিয়া হাজির হন। তাঁহারা তাঁহাদের মালপত্রাদি দিয়া সাহিত্য সমিতির পাঠাগার বোঝাই করিয়া ফেলেন। ইহা দেখিয়া আমি কাজী নজরুল ইসলামকে বলিলাম: "কাজী সাহেব, আপনি এসব কি করিয়াছেন। আপনাকে একা আসিতে লিখিলাম, আপনি এতগুলি লোক লইয়া আসিয়া আমার পাঠাগার বন্ধ করিয়া দিলেন।" তিনি উত্তরে বলিলেন: "ভয় পাবেন না, এরা আমার বন্ধু। দু' একদিন পর ওরা সবাই যাবে। আমি একা থাকব।"

'...নজরুল ইসলামও কলকাতায় ফিরে এলো এই মার্চ মাসে। আমি আমার 'কাজী নজরুল প্রসঙ্গে' নামক পুস্তকে লিখেছি 'আগেকার কথা মতো নজরুল তার গাঁটরি-বোচকা নিয়ে সোজা ৩২, কলেজ স্ট্রীটের সাহিত্য সমিতির অফিসে এসে উঠল।" এখন এত বছরের পরে দেখতে পাচ্ছি এই কথাটা পুরো সত্য নয়, আধা সত্য মাত্র। নজরুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন হতে সোজাসুজি ৩২, কলেজ স্ট্রীটের সাহিত্য সমিতির আফিসে চলে আসেন নি। আমি ভেবেছিলেম সে তাই করেছে। শ্রীশৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'কেউ ভোলে না কেউ ভোলে" নামক স্মৃতিকথা প্রকাশিত হওয়ার পরে এখন জানতে পারছি যে বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরে নজরুল ইসলাম কলকাতায় এসে প্রথমে রামকান্ত বোস স্ট্রীটে শ্রীশৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বোডিং হাউসে এসে উঠেছিল। তিন চার দিন সেখানে সে ছিলও। তার পরে বোডিং হাউসের চাকর জানতে পারে যে নজরুল মুসলমান। সে তার এঁটো বাসন ধুতে অস্বীকার করে। তখন শৈলজানন্দ নজরুলকে ২০, বাদুড়বাগান রো'তে (এখন ১, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রীট) তাঁর মাতামহের একটি খালি বাড়ীতে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু সে ৩২, কলেজ স্ট্রীটেই যেতে চাইল। শ্রীশৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সেখানে তাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেলেন। আমরা ভাবলাম শৈলজানন্দ বুঝি নজরুলকে রেলওয়ে স্টেশন হতে নিয়ে এসেছেন। আশ্চর্য এই যে শৈলজানন্দ কোনো৷ দিন আমায় রামকাস্ত বোস স্ট্রীটের ঘটনার কথা জানান নি, যদিও আমাদের পরিচয় খুবই ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। নজরুল ইসলামও কোনো দিন ঘুণাক্ষরেও এই ঘটনার কথা আমায় বলেনি। দু'একবার কেউ কেউ আমায় এই ঘটনার কথা জিজ্ঞাসাও করেছেন । আমি তা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছি।'

'নজরুলের সঙ্গে তখনও আমার সাক্ষাৎকার ঘটে নি। চিঠিপত্রের মাধ্যমেই যেটুকু পরিচয়। তাঁর চেহারা-ছবি সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিল না। সে সময়ে -সম্ভবত ১৩২৬ সালেই হবে, একদিন মিলিটারী ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায়ই নজরুল এসে 'সওগাত' অফিসে হাজির হলেন। 'সওগাত' অফিস ছিল কলকাতার বহুবাজার স্ট্রিটে। স্টেশন থেকে তিনি সোজা 'সওগাত' অফিসেই এসে উঠেছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, করাচী থেকে কলকাতা চলে এলাম। এখন যুদ্ধ থেমে গেছে, অতএব অফুরন্ত ছুটি। কলকাতায় থেকে মনপ্রাণ দিয়ে সাহিত্য-চর্চা চলবে। দু'এক কথার পর বললেন আমি এখান থেকে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে যাব।...'

৩২ নং কলেজ স্ট্রীটস্থ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অপিস
নানা স্মৃতিচারণ ও জীবনীমূলক সূত্রে নজরুলের কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর আশ্রয়স্থল সম্পর্কে কিছু মতভেদ পাওয়া গেলেও, শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে প্রতীয়মান হয় তা হলো—করাচি থেকে ফিরে কাজী নজরুল ইসলাম ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই স্থানটিই তাঁর সৈনিকজীবন-পরবর্তী কলকাতার সাহিত্যিক জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।

সূত্র: পশ্চিমবঙ্গ সরকার, প্রচার বিভাগ, তথ্যচিত্র: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জানুয়ারি ১৯৫৭।

৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বঙ্গীয় সাহিত সমিতির অফিস।
সূত্র: পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রচা বিভাগ তথ্যচিত্র। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জানুয়ারি ১৯৫৭।

মোজাম্মেল হকমুজাফ্ফর আহমদ এর লেখা থেকে '৩২ নং কলেজ স্ট্রীটস্থ ' বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'  সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো- ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির আপিসের কার্যক্রম পরিচালিত হতো- ৪৭/১ নম্বর মীর্জাপুর সড়কস্থ বাড়ির নিচ তলার একটি ছোট ঘরে। মাসিক ভাড়া ছিল ২ টাকা। এই ঘরে মোজাম্মেল হক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র ফ্রি রিডিং লাইব্রেরি স্থাপন করেছিলেন। ক্রমে ক্রমে লাইব্রেরির সদস্য ও পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের ২/৩ কে শীল, এল. এম. এস-এর দোতলার  সামনের দিককার বারান্দা-সহ দুটি কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়েছিল মাসিক ৬০ টাকায়। এই বাড়ির এই অংশটি বাড়ীর অন্য অংশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। অফিসে প্রবেশের জন্য রাস্তা থেকে ওপরে উঠে আসার সিড়ি ছিল। সামনের দিককার দু'খানা ঘরের একখানায় ছিল সাহিত্য সমিতির আফিস। আর একখানা ঘর সাহিত্য সমিতির নিকট হতে মাসিক ২২টাকা হিসেবে ভাড়া নিয়েছিলেন আফজাল-উল হক সাহেব। উল্লেখ্য, ৩ নম্বর কলেজ স্কোয়ারে  কুমিল্লার আশরাফ উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর সঙ্গ যুক্ত মালিকানায় আফজাল-উল হক সাহেবের পুস্তকের দোকান ছিল। তার নাম ছিল- "মোসলেম পাবলিশিং" হাউস।'

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে নজরুল
মুজাফ্ফর আহমদ সাহিত্য সমিতির বাড়ীতে বাস করা শুরু করেছিলেন ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাস থেকে। এই বাড়িতে নজরুল এবং মুজফ্‌ফর আহমদ একই ঘরে থাকা শুরু করেন মার্চ মাস থেকে। নজরুলের এই ঘরে বসবাসের আগে এখানে থাকতেন ড মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। উল্লেখ্য  ড মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১৯ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুজাফ্ফর আহমদ সাথে বাস করা শুরু করেন। এরপর তিনি ফিয়ার্স লেনে একটা মেডিকেল ছাত্রাবাসের সুপারেন্টেন্ডের দায়িত্ব পান। এই কারণে তিনি এই আবাস ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর ছেড়ে যাওয়া জায়গা পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম।

এই সময় নজরুলের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়-  মুজাফ্ফর আহমদ তাঁর ' কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৪৪] লিখেছেন-

'আমি সাহিত্য সমিতির আফিসের পাশের দিককার একখানা ঘরে থাকতাম। সেই ঘরেই নজরুল ইসলামের জন্যে আর একখানা তখ্‌ৎপোশ পড়ল। কৌতুহলের বশে আমরা তার গাঁটরি-বোচকা-গুলি খুলে দেখলাম। তাতে তার লেপ তোশক ও পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল। সৈনিক পোশাক তো ছিলই, আর ছিল শিরওয়ানি (আচ্‌কান),  ট্রাউজার্স ও কালো উচু টুপি যা তখনকার দিনে করাচির লোকেরা পরতেন। একটি দূরবীনও (বাইনোকুলার ) ছিল। কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি, ইত্যাদিও ছিল। পুস্তকগুলির মধ্যে ছিল ইরানের মহাকবি হাফিজের দিওয়ানের একখানা খুব বড় সংস্করণ। তাতে মূল পার্সি প্রতি ছত্রের নীচে উর্দু তর্জমা দেওয়া ছিল। অনেক দিন পরে আমারই কারণে নজরুল ইস্‌লামের এই গ্রন্থখানা, আরও কিছু পুস্তক, কিছু চিঠি-পত্র, অনেক দিনের পুরানো কবিতার খাতা, বিছানা, কিট ব্যাগ সুটকেস্‌ এবং 'ব্যথার দান' পুস্তকের উৎসর্গে বণিত মাথার কাঁটা খোয়া যায়। মিউজিয়মে রক্ষিত মূল্যবান বস্তুর মতো নজরুল এই কাঁটাটিও রক্ষা করে আসছিল। উৎসর্গে লেখা আছে-
        "মানসী আমার !
                মাথার কাটা নিয়েছিলুম বলে
                ক্ষমা করনি,
                তাই বুকের কাটা দিয়ে
                প্রায়শ্চিত্ত করলুম।"...;

প্রথম রাতের গান
মুজফ্‌ফর আহমদের 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থ [পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৫] থেকে জানা যায়, ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের বাড়িতে নজরুল এসেছিলেন, সেদিনই সকলের অনুরোধে নজরুল 'পিয়া বিনা মোর জিয়া না মানে' গানটি পরিবেশন করেছিলেন আফজাল-উল হকের ঘরে।  উল্লেখ্য আফজাল-উল হক ছিলেন শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের পুত্র। এই সময় আফজাল-উল হক মোসলেম ভারত নামক একটি নূতন পত্রিকা প্রকাশের জন্য বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতেন। কারণ পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশের জন্য এপ্রিল মাস নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আফজাল-উল হকের ঘরে গানের আসর শেষ হওয়ার পর, নজরুলের সাথে  মোসলেম ভারত পত্রিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এই আলোচনার সূত্রে নজরুল মোসলেম ভারতে লেখার জন্য রাজি হন। এ প্রসঙ্গে মুজফ্‌ফর আহমদ তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৫৩] লিখেছেন-

নজরুল যেদিন এসেছিল সে রাত্রেই তাকে দিয়ে আফজাল সাহেবের ঘরে আমরা গান গাইয়ে নিয়েছিলেম একথা আমি আগে বলেছি। মোসলেম ভারতের কিছু কিছু লেখা প্রেসে চলে গিয়েছিল। পরের মাসেই তো বা'র হবে কাগজখানা। আমার সম্মুখে সেই রাত্রেই 'মোসলেম ভারতে' লেখা দেওয়ার বিষয়ে আফজালুল হক সাহেবের সঙ্গে নজরুলের কথাবার্তা হয়ে গেল। আফজাল সাহেব সে রাত্রে নজরুলের ওপরে কতটা ভরোসা করতে পেরেছিলেন তা জানিনে, তবে তার কাছ থেকে লেখা তিনি চেয়েছিলেন।'

এই রাতেই তহ্‌মীনা বা বাঁধনহারা গল্পটি প্রকাশের চুক্তি হয়ে গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মুজফ্‌ফর আহমদ তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৫৩] লিখেছেন-

এর আগে তার কয়েকটি লেখা অন্যান্য কাগজে ছাপা হয়েছিল। নজরুল বলল সে একখানা পত্রোপন্যাস লেখা শুরু করেছে। তার কখানা পত্র সে যে করাচির সেনানিবাস হতে লিখে এনেছিল একখানা ফুলস্ক্যাপ ফলিও সাইজের খাতা খুলে আমাদের তা সে দেখিয়েও দিল। আফজালুল হক সাহেব রাজী হলেন যে পত্রোপন্যাসখানা তিনি তাঁর কাগজে ছাপাবেন। তার পরে নাম নিয়ে কথা উঠল। নজরুল বলল, 'তহ্‌মীনা' কিংবা 'বাঁধনহারা' নাম দিতে পারেন। বলা বাহুল্য আমাদের 'বাঁধনহারা' নামটিই পসন্দ হলো। নজরুল কেন পুস্তকখানার 'তহমীন' নাম দিতে চেয়েছিল তা জানিনে, তার পুস্তকে কোনো মেয়ের নাম 'তহমীনা' আছে বলে তো মনে পড়ছে না। হয় তো নামটি তার কল্পনায় ছিল। পরে সে মত পরিবর্তন করেছিল।

পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ
করাচি থেকে ফিরে নজরুল পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করার জন্য তাঁর অফিসে যান এবং তাঁকে না পেয়ে একটি চিঠি লিখে এসেছিলেন। এই চিঠিটি পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক 'চলমান জীবন' গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছেন। চিঠিটি ছিল-

'পবিত্রবাবু, কাল কলকাতায় এসে পৌঁছেছি। দেখা করতে এলাম, কিন্তু বরাত খারাপ। আমি ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে। বাড়িটা আপনার সুপরিচিত। দেখা পাওয়ার আগ্রহে বসে থাকব।'
                        হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম

৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের বাড়িতে থাকার পর, তিনি চুরুলিয়া গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে সাত-আটদিন কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। মুজাফ্ফর আহমদের 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থ থেকে জানা যায়- মায়ের সাথে নজরুলের কিছু বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছিল। তারপর নজরুল আর চুরুলিয়াতে যান নি। এমন কি মায়ের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর সংবাদ শুনেও তিনি মায়ের সাথে দেখা করেন নি।

চুরুলিয়া থেকে কলকাতায় ফেরার পথে, নজরুল বর্ধমানে নেমে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে সাব-রেজিস্টার পদের জন্য একটি দরখাস্ত জমা দিয়ে এসেছিলেন। উল্লেখ্য সে সময়ে পল্টন-ফেরত লেখাপড়া জান সৈনিকদের জন্য সরকার চাকরির সুযোগ দিয়েছিল। কলকাতায় ফেরার পর, নজরুলের নামে সব-রেজিস্টার পদে চাকরির নিয়োগ-পত্র এসেছিল। কিন্তু আফজাল-উল হক, মুজাফ্ফর আহমদ-সহ অনেকেই এই চাকরিতে যোগদানে বাধা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই চাকরিতে নজরুল যোগদান করেন নি।

নজরুল এই সময় আর্থিক সঙ্কটে ছিলেন। এই সময় তাঁর  পাশে বিশেষভাবে দাঁড়িয়েছিলেন আফজাল-উল হকমুজাফ্ফর আহমদ। করাচি থেকে পাঠানো নজরুলের রচনাসমূহ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, সওগাত, নূর, প্রবাসী ইত্যাদিতে প্রকাশের সূত্রে বীরভূম জেলার মাড়গ্রামের অধিবাসী মঈনউদ্দীন হোসয়ন (প্রকৃত নাম আবু আজাহার মহম্মদ কবীর) নজরুলের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি জেনেছিলেন যে, নজরুল কলকাতায় এসে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের বাড়িতে উঠবেন। সম্ভবত মুজাফ্ফর আহমদ কলকাতায় নজরুলের আগমন এবং তাঁর আর্থিক অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর, রেজিস্ট্রি চিঠিতে মঈনুদ্দীন নজরুলকে ৫০ টাকা পাঠিয়েছিলেন।

৩২ নং কলেজ স্ট্রিটের বাড়িতে নজরুল থাকার সময়, দলে দলে পল্টন-ফেরত সৈনিকরা আসতেন।  মুজফ্‌ফর আহমদের 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থ [পৃষ্ঠা: ৪৯] থেকে এদের ভিতরে দুজনের নাম পাওয়া যায়। এঁদের একজন ছিলেন শম্ভু রায় এবং গোপী। এ্‌ই গ্রন্থ থেকে পল্টনের সাত হাজার সৈনিকের প্রত্যেকেই নজরুল এবং শম্ভু রায়কে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। তাঁরা নাচে গানে এই বাসস্থানটিকে হট্টগোলের আখড়া বানিয়ে ফেলেছিলেন। এ নিয়ে বাড়ির মালিক ডা আর কে শীল মোজাম্মেল হকের কাছে  অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। মোজাম্মেল হক বিষয়টি নজরুলকে জানালে, তিনি এবং তাঁর দলবল নিয়ে আরও দ্বিগুণ উৎসাহে গান-বাজনায় মেতে উঠেছিলেন।

 [সূত্র: নজরুল ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি। মোজাম্মেল হক]

এই মাসে প্রকাশিত গল্প

  • ঘুমের ঘোরে। গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল নূর পত্রিকার ফাল্গুন চৈত্র ১৩২৬ সংখ্যায়। গল্পটি পরে ব্যথার দান গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

এপ্রিল ১৯২০ (১৮ চৈত্র -১৭ বৈশাখ ১৩২৭)
এপ্রিল মাসের পুরো সময়ে তিনি প্রায় কর্মহীন অবস্থায় ' বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে কাটান। পল্টন-ফেরত সৈনিকরা  একে একে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিল। অনেকে সরকারে আমুকূল্যে চাকরিও পেয়ে গিয়েছিল। এরপর নজরুলের আড্ডা জমে উঠেছিল সাহিত্যিকদের সাথে। আর্থিক অসুবিধার ভিতরেও নজরুলের নিয়মিত আড্ডা দেওয়াতে কোনো খামতি ছিল না। এই আড্ডার সূত্রে তাঁর বহু সাহিত্যিক বন্ধু-প্রাপ্তি ঘটেছিল। এই সময় এই অফিসে থাকতেন, আফজাল-উল হক, কাজী আব্দুল ওয়াদুদ । বাইরে থেকে আড্ডায় যোগ দিতে আসতেন- পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী প্রমুখ। এঁদের অনেকে পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে যশ্বষী হয়েছিলেন।

মোসলেম ভারতের প্রকাশ ও নজরুলের সঙ্গীত
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের শুরুর দিকে আফজাল-উল হক  মোসলেম ভারত নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি পত্রিকার প্রচার ও প্রসারের জন্য এই পত্রিকার সম্পাদকের নাম হিসেবে তাঁর পিতা মোজাম্মেল হকের নাম ব্যবহার করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে পত্রিকাটির সম্পাদনা থেকে যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন আফজাল-উল হক। সে সময়ে কলকাতার ৩ কলেজ স্কোয়ারে আফজাল-উল হকের 'মোসলেম পাবলিশিং হাউস' নামক একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিল। এটি ছিল তাঁর পত্রিকা প্রকাশের জন্য বাড়তি সুবিধা। আফজাল-উল হক ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। তাই পত্রিকার কাটতির জন্য যেমন পিতা মোজাম্মেল হকের নাম ব্যবহার করেছিলেন। একই সাথে নজরুলের সৃজনশীল রচনার ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে নিয়েছিলেন। পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক সে সময়ে বয়সের কারণে নিষ্ক্রিয় থাকলেও নজরুল এই পত্রিকা নিয়ে মেতে উঠেছিলেন। ফলে এই মাসের প্রথম থেকেই তিনি এই পত্রিকা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (এপ্রিল ১৯২০)।

নজরুলের সঙ্গীত জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাস নজরুলের সঙ্গীতজীবনের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তাঁর সঙ্গীতচর্চার প্রথম পর্বের সূচনা হয়েছিল কৈশোরে চুরুলিয়ার লেটো দলের সঙ্গে। মাত্র তেরো বছর বয়সে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি লেটো গানের জগতে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে গীতিকার ও গায়ক হিসেবে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সৈনিকজীবনে তাঁর সাহিত্যচর্চা, গান পরিবেশন এবং হারমোনিয়াম ও অর্গানবাদনের অনুশীলন অব্যাহত থাকলেও, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর নতুন বাংলা গান প্রকাশের কোনো সুস্পষ্ট নজির পাওয়া যায় না।

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাস পর্যন্ত নজরুল গল্প, কবিতা, সমালোচনা ইত্যাদি প্রকাশিত হলেও নব পর্যায়ের কোনো গান প্রকাশিত হয় নি। এপ্রিল মাস থেকে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। তিনি আবার সক্রিয়ভাবে গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি বাংলা গানের জগতে স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নেন।

তৎকালীন বাংলা গীতিকাব্যের প্রধান ধারায়  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন এবং রজনীকান্ত সেনের মতো গীতিকারেরা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নজরুল ইসলাম,  অজয় ভট্টাচার্য, প্রণব রায়, তুলসী লাহিড়ী, মোহিনী চৌধুরী প্রমুখ গীতিকার হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভা, সুরবোধ, ছন্দের বৈচিত্র্য এবং বাংলা গানের বিষয় ও ভাষায় অভিনবত্বের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সমকালীন গীতিকারদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা অর্জন করেন।

এই সময় থেকেই নজরুলের সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গীতিকার নজরুলের নতুন যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এই যাত্রাই বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের জন্ম দেয়।

নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত গান
নজরুলের সঙ্গীতজীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও’ গানটির মধ্য দিয়ে। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে অবস্থানকালে তিনি গানটি রচনা করেছিলেন। এটি ছিল লেটো-পর্বের পর তাঁর নতুন পর্যায়ের প্রথম প্রকাশিত গান এবং বাংলা গানের জগতে গীতিকার নজরুলের পুনরাবির্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। গানটি সওগাত পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৭ বঙ্গাব্দের (এপ্রিল–মে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় ‘উদ্বোধন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় গানটির রাগ হিসেবে বসন্ত-সোহিনী এবং তাল হিসেবে দাদরা উল্লেখ করা হয়েছিল।

বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও [তথ্য]
নজরুলের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম গান। গানটি তিনি রচনা করেছিলেন, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির' অফিসে বসবাসের সময়ে।

সওগাত পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৭ (এপ্রিল-মে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায়। শিরোনাম: 'উদ্বোধন'। রাগ: বসন্ত সোহিনী। তাল দাদরা। এই গানের বিষয়ে সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন তাঁর 'সওগাত' ও নজরুল প্রবন্ধে লিখেছেন-

"...সওগাত ২য় বর্ষ, বৈশাখ, ১৩২৭-এ প্রকাশিত হয় নজরুলের 'উদ্বোধন' শীর্ষক একটি গান। গানটি 'বসন্ত সোহিনী-দাদরা' তালে রচিত। এটিই নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গান। গানটি এই: বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও..."।
যদিও সওগাত পত্রিকায় গানটির তাল 'দাদরা' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে গানটি 'তেওরা' তালে গীত হয়ে থাকে।
এই গানটি ছাড়া এই মাসে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে নজরুলের আরও কয়েকটি কবিতা, গল্প, পত্রোপন্যাস এবং ভাবানুবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলো হলো-
  • কবিতা
    • প্রিয়ার দেওয়া শরাববঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র বৈশাখ ১৩২৭ (৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি পরে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে ' নির্ঝর' কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
    • মানিনী।  বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র বৈশাখ ১৩২৭ (৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।  পত্রিকাতে কবিতার শিরোনাম ছিল- 'মানিনী বধূর প্রতি'। পক্ষান্তরে 'মানিনী' শিরোনামে কবিতাটি ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ' পূবের হাওয়া' কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
    • চিঠি। বঙ্গনূর পত্রিকার ১৩২৭ বৈশাখ (এপ্রিল-মে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনামের নিচে বন্ধনীর মধ্যে লেখা ছিল 'গাথা'।  কবিতাটি পরে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে ' নির্ঝর' কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
  • গল্প:
    • রিক্তের বেদন। 'নূর পত্রিকার বৈশাখ ১৩২৭ সংখ্যায় (এপ্রিল-মে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটি রিক্তের বেদন নামক গল্প-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে।
  • উপন্যাস:
    • বাঁধন-হারাপত্রোপন্যাস। (ক) [কাজী নজরুল ইসলাম] মোসলেম ভারত বৈশাখ ১৯২৭ বঙ্গাব্দ (এপ্রিল-মে ১৯২০)।  পৃষ্ঠা: ২৮-৩৩।
       
  • ভাবানুবাদ।
    • ইংলিশম্যান পত্রিকার 'ম্যাগাজিন সেকশন' থেকে কিছু লেখার ভাবানুবাদ এবং করেছিলেন নজরুল। এই লেখাগুলো বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র বৈশাখ ১৩২৭ (৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

    লেখাগুলো ছিল-
     

    • তুর্ক-মহিলার ঘোমাটা খোলা
      ভারতবর্ষ পত্রিকার ৭ম বর্ষ ১ম খণ্ডের ৩য়্ সংখ্যায় (ভাদ্র ১৩২৬), 'সঞ্চয়' বিভাগে হেমেন্দ্রকুমার রায় 'তুর্ক-মহিলার ঘোমটা-খোলা' নামক একটি রচনা প্রকাশিত হয়েছিল [পৃষ্ঠা: ৪০৬-৪০৭]। এই রচনায় লেখক তৎকালীন আমেরিকান সংবাদপত্র  'New York Herald'-এ  লিখিত জনৈক লেখকের রচনা অনুসরণে তুর্কি-মহিলাদের সম্বন্ধে লেখেন- 'তুর্ক-রমণীরা মোটেই সুন্দরী নয়!' এই রচনার প্রতিবাদে নজরুল 'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' নামক এই প্রবন্ধটি রচনা করেন এবং তা সওগাত পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন।
এপ্রিল ১৯২০-এর প্রকাশনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এই সময় নজরুল একসঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্যরূপে আত্মপ্রকাশ করছেন। কবিতা, গান, গল্প, পত্রোপন্যাস, প্রবন্ধ এবং ভাবানুবাদ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও’-এর প্রকাশ তাঁর সঙ্গীতজীবনের নতুন পর্বের সূচনা নির্দেশ করে; অন্যদিকে ‘বাঁধনহারা’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘প্রিয়ার দেওয়া শরাব’, ‘মানিনী’ প্রভৃতি রচনা তাঁর সাহিত্যিক পরিসরকে দ্রুত বিস্তৃত করে। এইভাবে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসটি নজরুলের জীবনে শুধু পল্টন-পরবর্তী অবসরকাল নয়; বরং সৈনিক নজরুল থেকে পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক ও গীতিকার নজরুল হয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

১ মে-২৪ মে ১৯২০
(১৮ বৈশাখ- ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭)
মে মাসের শুরু থেকেই নজরুল অধিকাংশ সময় মোসলেম ভারত পত্রিকার লেখা ও অন্যান্য সাহিত্যচর্চা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের এই সময়টি তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। একদিকে পত্রিকার জন্য নিয়মিত লেখা প্রস্তুত করছিলেন, অন্যদিকে কবিতা, গান ও অনুবাদধর্মী রচনার মধ্য দিয়ে নিজের সাহিত্যিক পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত করছিলেন। এই সময়ে মোসলেম ভারত ও নূর পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ সংখ্যায় নজরুলের দুটি কবিতা এবং একটি গান প্রকাশিত হয়।
  • কবিতা
    • কালোর উকিল। কবিতা। 'নূর' জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ (মে-জুন ১৯২০) প্রকাশিত হয়েছিল।
    • এই কবিতাটি নজরুলের জীবদ্দশায় কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় নি।
       
    • শাতি্-ইল আরব। কবিতা। ' মোসলেম ভারত ' পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ (জুন-জুলাই ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি পরে 'অগ্নিবীণা' (ফাল্গুন ১৩২৮, মার্চ ১৯২২) কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

    •  
  • গান
    দুঃখ কি ভাই হারানো সুদিন ভারতে আবার আসিব ফিরে [তথ্য]

    নজরুলের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দ্বিতীয় গান। তিনি প্রথমে পারশ্যের কবি হাফিজের একটি গজলের অনুবাদ করেছিলেন। হাফিজের এই গজলের অনুবাদ সম্পর্কে মুজফ্‌ফর আহমদ তাঁর ' কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৪৪] লিখেছেন-

    '...নজরুল ইস্‌‌লামের নিকটে কবি হাফিজের 'দিওয়ানের' যে একখানা খুব ভালো সংস্করণ ছিল সে কথা আগে বলেছি। একদিন মঈনুদ্দীন সাহেব আর আমি হাফিজের একটি কবিতা নজরুলকে দেখিয়ে দিয়ে-তা বাঙলায় তর্জমা করতে বলি। কবিতাটির প্রথম পংক্তি ছিল-_
            "ইউমফ.-ই-গুম্‌গশতা বাজ আইয়েদ
                        ব-কিন্‌আন্ গম্ মথুর"
             নজরুল তার তর্জমা করেছিল-
             "দুঃখ কি ভাই হারানো ইউসফ্
             কিনানে আবার আসিবে ফিরে"।

    হতাশা ভোলানোর কবিতা। পুরো কবিতাটি মাসিক কাগজে ছাপা হয়েছিল। কিন্তু পরে নজরুল তাতে অনেক পরিবর্তন করেছে এবং হাফিজের ভাবাবলম্বনে লিখিত কবিতা হিসাবে তা পুস্তকে স্থান পেয়েছে।'

    এই গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল 'মোসলেম ভারত ' পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩২৭ (মে-জুন ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায়। এর শিরোনাম ছিল 'বোধন'। হাফিজের গজল 'য়ুসোফে গম্ গশতা বাজ আয়েদ বৎ-কিন্ আন গম্ মখোর' ভাবছায়া অবলম্বনে গানটি রচনা করেছিলেন। সুর-নির্দেশ ছিল-

    • যেদিন সুনীল ভারতবর্ষ জলধি হইতে উঠিলে জননি [দ্বিজেন্দ্রলাল রায়] [তথ্য]
      বিষের বাঁশী প্রথম সংস্করণে (শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ। আগষ্ট ১৯২৪) গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ' বোধন শিরোনামে।
এই নজরুলের ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শেষদিন পর্যন্ত আবাসস্থল ছিল  ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটস্থ  বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিস। অর্থাৎ তাঁর ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের প্রায় সমগ্র শেষ পর্যায়টি তিনি কলকাতার এই সাহিত্যিক পরিবেশেই অতিবাহিত করেন।

এই সময় তাঁর আর্থিক সংকটও কিছুটা লাঘব হতে শুরু করেছিল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিশেষ করে  মোসলেম ভারত-এর জন্য তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। এর পাশাপাশি সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা, গান, কবিতা ও গল্প রচনা—সব মিলিয়ে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ক্রমশ গতিশীল হয়ে উঠেছিল।

এই আড্ডাগুলোর মধ্য দিয়েই তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সাহিত্যিক যোগাযোগের পরিসর বিস্তৃত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীতজীবনের যে দ্রুত বিকাশ ঘটে, তার ভিত্তি অনেকাংশে তৈরি হয়েছিল এই সময়েই।

অতএব, ২০ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শেষ মাস মে ১৯২০ নজরুলের জীবনে ছিল এক পরিবর্তনশীল সময়—সৈনিকজীবন ইতিমধ্যে অতীত, আর সাহিত্যিক ও গীতিকার নজরুলের নতুন পরিচয় ক্রমশ সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।  যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তাঁর ২১ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শুরু থেকেই।
সূত্র:
  • কাজী নজরুল। প্রাণতোষ ভট্টাচার্য। ন্যাশনাল বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা-১২। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ
  • কাজী নজরুল ইসলাম। বসুধা চক্রবর্তী। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া। নয় দিল্লী। জানুয়ারি ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ।
  • কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা। মুজফ্‌ফর আহমদ। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড। ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রীট, কলিকাতা-১২। প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫।
  • কেউ ভোলে না কেউ ভোলে। শৈলাজানন্দ মুখোপাধ্যায়। নিউ এজ পানলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। আগষ্ট ১৯৬০।
  • নজরুল ইসলাম ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। নজরুল-স্মৃতিচারণ। রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত। নজরুল একাডেমী, ঢাকা। ২৫ মে, ১৯৯৫।
  • নজরুল-জীবনী। রফিকুল ইসলাম। নজরুল ইন্সটিটউট, ঢাকা। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।
  • নজরুল তারিখ অভিধান। মাহবুবুল হক। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জুন ২০১‌০ খ্রিষ্টাব্দ।
  • নজরুল রচনা সম্ভার। আব্দুল কাদির সম্পাদিত। ইউনিভার্সল বুক ডিপো। কলিকাতা। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ।
  • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। প্রথম-দ্বাদশ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা]
  • নজরুল সঙ্গীত নির্দেশিকা। ব্রহ্মমোহন ঠাকুর [কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। আষাঢ় ১৪২৫/জুন ২০১৮]
  • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
  • বিদ্রোহী-রণক্লান্ত, নজরুল জীবনী। গোলাম মুরশিদ। প্রথমা, ঢাকা। ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ।
  • বিষের বাঁশী: প্রথম সংস্করণ  [১৬ই শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ (শুক্রবার ১ আগষ্ট ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ)]
  • প্রবাসী পত্রিকা [পৌষ ১৩২৬ সংখ্যা।
  • ভারতবর্ষ পত্রিকা। ৭ম বর্ষ ১ম খণ্ডের ৩য়্ সংখ্যা (ভাদ্র ১৩২৬)।
  • 'সওগাত' ও নজরুল। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। নজরুল-স্মৃতিচারণ। রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত। নজরুল একাডেমী, ঢাকা। ২৫ মে, ১৯৯৫।