বিগব্যাং
মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি তত্ত্ব বিশেষ এই তত্ত্ব অনুসারে  ১৩.৭৯৮± ০.০৩৭০০ কোটি বৎসর আগের একটি বিশাল বস্তুপিণ্ডের বিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময় থেকে বর্তমান মহাবিশ্বের বয়স ধরা হয়। এই তত্ত্বের শুরুতে মোটাদাগে বিগব্যাং-এর সময়কে ধরা হয়েছিল ১৫০০ কোটি বৎসর ধরা হয়েছিল। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, বিগ ব্যাং-এর ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় ১৩৭৫ কোটি বৎসর আগে। এই বিচারে মহাবিশ্বের বয়সও ১৩৭৫ কোটি বৎসর।

১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী জর্জ লেমিটর (Georges Lemaître) এই তত্ত্ব প্রথম প্রকাশ করেন তাঁর মতে সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্বের সকল বস্তু আন্তঃআকর্ষণে পুঞ্জীভূত হয় এবং একটি বৃহৎ পরমাণুতে পরিণত হয় এই পরমাণুটি পরে বিস্ফোরিত হয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয় এই মতবাদকে সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেন এডুইন হাবল (Edwin Hubble) হাবল পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ পান যে মহাকাশের গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে ক্রমান্বয়ে নির্দিষ্ট গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে তাঁর মতে, আদিতে মহাবিস্ফোরণের ফলে গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর দূরে সরে যাওয়ার আচরণ বিগ-ব্যাংকেই সমর্থন করে

এই ভাবে বিস্ফোরণের ফলে যে বিকিরণের (
radiation) সৃষ্টি হওয়ার কথা, তার অস্তিত্ব প্রথম দিকে প্রমাণ করা যায় নাই ফলে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয় ১৯৬৪ সালে Arno Penzias এবং Robert Wilson নামক দুজন বিজ্ঞানী বিকিরণের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন ফলে বিগব্যাং-এর ধারণা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয় মহাবিশ্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই তত্ত্বকেই সত্য বলে বিবেচনা করা হয়

বিগব্যাং মতবাদ অনুসারে মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য
আদিতে মহাকাশের বস্তুপুঞ্জ বিক্ষিপ্তাকারে ছড়ানো ছিল
অবশ্য এই আদি বস্তুপুঞ্জ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর বিন্যাস কিরূপ ছিল, তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারেন নাই বিগব্যাং-এর তত্ত্ব আধুনিক হিসাব অনুসারে
  প্রায় ১৩৭৫ কোটি বৎসর আগে এই সকল বিক্ষিপ্ত বস্তুগুলো আন্ত-আকর্ষণের কারণে পরস্পরের কাছে আসতে থাকে এবং ধীরে ধীরে একটি ডিমের আকার ধারণ করে জর্জ লেমিটর এই পরমাণুটির নাম দিয়েছিলেন আদিম পরমাণু (primæval-atom) উল্লেখ্য এই সময় কোন স্থান ও কালের অস্তিত্ব ছিল না অসীম ঘনত্বের এই মহাপরমাণুর ভিতরে বস্তুপুঞ্জের ঘন সন্নিবেশের ফলে এর তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল- যে কোন পরিমাপ স্কেলের বিচারে ১০১৮ ডিগ্রী বিগ ব্যাং-এর পরের ১ সেকেন্ডে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, তা কালানুক্রমে নিচে তুলে ধরা হলো

১ থেকে ১০-৪৩ সেকেণ্ড : কোয়ান্টাম সূত্রানুসারে বিগব্যাং-এর ১০-৪৩ সেকেন্ডের [এই সময়কে প্লাঙ্ক-অন্তঃযুগ (Planck epoch) বলা হয়] ভিতর চারটি প্রাকৃতিক বলের (force) সমন্বয় ঘটেছিল এই বলগুলো হলো- সবল নিউক্লীয় বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল, বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল ও মহাকর্ষীয় বল সবগুলো মিলে একটি অতি বৃহৎ বলের (super force) সৃষ্টি হয়েছিল

প্লাঙ্ক-অন্তঃযুগ থেকে ১০-৩৫ সেকেণ্ড : প্লাঙ্কের সময় অতিবাহিত হওয়ার কিছু পরে মহাকর্ষীয় বল, অন্য তিনটি বল থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল ফলে মাধ্যাকর্ষণজনিত শক্তির কারণে, মহাপিণ্ডটি সর্বোচ্চ সংকোচন মাত্রায় পৌঁছেছিল তখন ঘনত্বের বিচারে মহাপরমাণুর প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে বস্তু ছিল ৫´১০+৯৩ গ্রাম এই সময় এর তাপমাত্রা ছিল ১০৩২ কেলভিন ১০-৩৫ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে এই তাপমাত্রা এসে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০২৭ কেলভিন এই সময় কোয়ার্ক ও লেপ্টন কণার সৃষ্টি হয়েছিল একই সাথে তৈরি হয়েছিল কিছু বস্তু এবং প্রতিবস্তুসমূহ (antiparticles) পরে বস্তু ও তার প্রতিবস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ হলে উভয় ধরনের বস্তুগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এর ফলে শুধু কোয়ার্ক ও লেপ্টন রয়ে যায়

১০-৩৫ থেকে ১০-১০ সেকেণ্ড : পরবর্তী ১০-১০ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০১৬ কেলভিনে এই তাপমাত্রা পরে আরও কমে গেলে দুর্বল নিউক্লীয় বল ও বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল পৃথক হয়ে যায় এই সময় কোয়ার্কসমূহ সবল বলের প্রভাবে আবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করে ফোটন, প্রোটন এবং নিউট্রন।
১ সেকেন্ড পরে : ১ সেকেন্ড পরে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০১০ কেলভিনে কিন্তু এই তাপমাত্রায় পরমাণু সৃষ্টি অসম্ভব ছিল

স্টিফেন ডব্লু, হকিং তাঁর A Brief history of time গ্রন্থে বলেছেন At the big bang itself the universe is thought to have had zero size, and so to have been infinitely hot. hot. But as the universe expanded, the temperature of the radiation decreased. One second after the big bang, it would have fallen to about ten thousand million degrees. This is about a thousand times the temperature at the center of the sun, but temperatures as high as this are reached in H-bomb explosions. [মনে করা হয়,বিগব্যাং-এর সময় মহাবিশ্বের আয়তন ছিল শূন্য এবং উত্তাপ ছিল অসীম। কিন্তু মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হওয়ার সময় বিকিরণের তাপমাত্রা কমে গিয়েছিল। বিগব্যাগ-এর  ১ সেকেন্ড পর, তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ কোটি ডিগ্রিতে নেমে এসেছিল। এটা ছিল সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার ১০০ গুণ বেশি, কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা যেরূপ উচ্চ থাকে সেরূপ ছিল ] ।

স্টিফেন ডব্লু, হকিং [A Brief history of time অনুসারে] মনে করেছেন, বিগ ব্যাং-এর ১০০ সেকেন্ড পরে তাপমাত্রা ১০০ কোটি ডিগ্রিতে নেমে এসেছিল। এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন নিউট্রন মিলিত হয়ে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছিল  হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম পরমাণু

মূলত বিগ ব্যাং-এর পরে সৃষ্ট প্রোটন ও নিউট্রনের অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল প্রতিরূপ প্রোটন ও নিউট্রনের সাথে সংঘর্ষ করে। এই কণাগুলোর এক চতুর্থাংশ হাইড্রোজেন ও অন্যান্য পদার্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম ইত্যাদি পরমাণু তৈরি হওয়ার পর প্রায় দশ লক্ষ বৎসর আর কোনো নতুন মৌলিক পদার্থ তৈরি হয় নি। এই সময় শুধু মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়েছে।

ধারণা করা হয় বিগব্যাং-এর ৩ সেকেণ্ড থেকে ১০০,০০০ বৎসরের মধ্যে সৃষ্ট কণাগুলো শীতল হয়ে উঠে এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন নিউট্রন মিলিত হয়ে তৈরি হয় হাইড্রোজেন হিলিয়াম পরমাণু এ ছাড়া এই দুটি পদার্থের সাথে ছিল প্রচুর ইলেক্ট্রন প্লাজমা।  সব মিলিয়ে যে বিপুল বস্তুকণার সমাবেশ ঘটেছিল, সেগুলো প্রচণ্ড গতিতে বিগ ব্যাং-এর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল এই সময় এই সকল কণিকাও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ক্রমে ক্রমে এগুলো শীতল হতে থাকলো এবং এদের ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে- কাছাকাছি চলে এসেছিল ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তুপুঞ্জ পৃথক পৃথক দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল এই পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পত্তন ঘটেছিল গ্যালাক্সি আমাদের সৌরজগতও এরূপ একটি গ্যালাক্সির ভিতরে অবস্থান করছে এই গ্যালাক্সির নাম ছায়াপথ


সূত্র:
বাংলা একাডেমী বিজ্ঞান বিশ্বকোষ। প্রথম খণ্ড। আষাঢ় ১৪০৫/জুন ১৯৯৮।
A Brief history of time । স্টিফেন ডব্লু, হকিং।