বিগব্যাং
বানান বিশ্লেষণ: ব্+ই+গ্+ব্+য্+আ+ং।
উচ্চারণ:
big.ŋ (বিগ্.ব্যাং)
শব্দ-উৎস: ইংরেজি Big Bang>বিগব্যাং
পদ: বিশেষ্য
ঊর্ধ্বক্রমবাচকতা { বিস্ফোরণ | শক্তি-অবমুক্তি | ঘটিত বিষয় | ঘটনা | মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা |  বিমূর্তন  | বিমূর্ত-সত্ত | সত্তা |}

অর্থ: ইংরেজি
Big অর্থ বড় এবং অর্থ Bang বিস্ফোরণ। এই বিচারে এর অর্থ দাঁড়ায় বড় বিস্ফোরণ। বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা আকস্মিকভাবে বড় ধরনের ঘটনাকে ইংরেজি অনেক সময় Big Bang। ইংরেজি অভিধানে এর সাধারণ অর্থ হলো any sudden forceful beginning or radical change। বাংলাতে বিগব্যাং শব্দটি ব্যবহার করা হয়, মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি তত্ত্ব হিসেবে

মহাবিশ্ব সৃষ্টির একটি তত্ত্ব বিগব্যাং
এই তত্ত্ব অনুসারে প্রায় 
১৩৮০ কোটি বৎসর আগে একটি বিশাল বস্তুপিণ্ডের বিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময় থেকে বর্তমান মহাবিশ্বের বয়স ধরা হয়।

১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের একজন বিজ্ঞানী জর্জ লেমিটর (Georges Lemaître) এই বিগব্যাং তত্ত্ব প্রথম প্রকাশ করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে প্রায় ১৫০০ কোটি বৎসর আগে, মহাবিশ্বের সকল বস্তু আন্তঃআকর্ষণে একটি বৃহ পরমাণুতে (Supper Atom) পরিণত হয়। জর্জ লেমিটর এই পরমাণুটির নাম দিয়েছিলেন আদিম পরমাণু (primæval-atom)এই পরমাণুটি পরে বিস্ফোরিত হয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে এই মতবাদকে সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেন এডুইন পাওয়েল হাবল (Edwin Powell Hubble)হাবল পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ পান যে মহাকাশের গ্যালাক্সি গুলো পরস্পর থেকে ক্রমন্বয়ে নির্দিষ্ট গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আদিতে মহাবিস্ফোরণের ফলে গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর দূরে সরে যাওয়ার আচরণ বিগব্যাং-কেই সমর্থন করে। এই ভাবে বিস্ফোরণের ফলে যে বিকিরণ সৃষ্টি হওয়ার কথা, তার অস্তিত্ব প্রথম দিকে প্রমাণ করা যায় নাই। ফলে, বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে Arno Penzias এবং Robert Wilson নামক দুজন বিজ্ঞানী বিকিরণের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। ফলে বিগব্যাং -এর ধারণা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই তত্ত্বকেই সত্য বলে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, বিগ ব্যাং-এর ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় ১৩.৭৯৮± ০.০৩৭০০ কোটি বৎসর আগে। বর্তমানে মোটাদাগে বলা হয় এই ঘটনা ঘটেছিল ১৩৮০ কোটি বৎসর আগে।

বিগব্যাং মতবাদ অনুসারে মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য
আদিতে মহাকাশের বস্তুপুঞ্জ বিক্ষিপ্তাকারে ছড়ানো ছিল
অবশ্য এই আদি বস্তুপুঞ্জ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর বিন্যাস কিরূপ ছিল, তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারেন নাই আধুনিক হিসাব অনুসারে
  প্রায় ১৩৮০ কোটি বৎসর আগে এই সকল বিক্ষিপ্ত বস্তুগুলো আন্ত-আকর্ষণের কারণে পরস্পরের কাছে আসতে থাকে এবং ধীরে ধীরে একটি ডিমের আকার ধারণ করে জর্জ লেমিটর এই পরমাণুটির নাম দিয়েছিলেন আদিম পরমাণু (primæval-atom) উল্লেখ্য এই সময় কোন স্থান ও কালের অস্তিত্ব ছিল না অসীম ঘনত্বের এই মহাপরমাণুর ভিতরে বস্তুপুঞ্জের ঘন সন্নিবেশের ফলে এর তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল- যে কোন পরিমাপ স্কেলের বিচারে ১০১৮ ডিগ্রী

বিগ ব্যাং-এর পরের ১ সেকেন্ডে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, তা কালানুক্রমে কয়েকটি অন্তঃযুগে ভাগ করা হয়।

স্টিফেন ডব্লু, হকিং তাঁর A Brief history of time গ্রন্থে বলেছেন At the big bang itself the universe is thought to have had zero size, and so to have been infinitely hot. hot. But as the universe expanded, the temperature of the radiation decreased. One second after the big bang, it would have fallen to about ten thousand million degrees. This is about a thousand times the temperature at the center of the sun, but temperatures as high as this are reached in H-bomb explosions. [মনে করা হয়,বিগব্যাং-এর সময় মহাবিশ্বের আয়তন ছিল শূন্য এবং উত্তাপ ছিল অসীম। কিন্তু মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হওয়ার সময় বিকিরণের তাপমাত্রা কমে গিয়েছিল। বিগব্যাগ-এর  ১ সেকেন্ড পর, তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ কোটি ডিগ্রিতে নেমে এসেছিল। এটা ছিল সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার ১০০ গুণ বেশি, হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা যেরূপ উচ্চ থাকে সেরূপ ছিল ] ।

স্টিফেন ডব্লু, হকিং [A Brief history of time অনুসারে] মনে করেছেন, বিগ ব্যাং-এর ১০০ সেকেন্ড পরে তাপমাত্রা ১০০ কোটি ডিগ্রিতে নেমে এসেছিল। এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন নিউট্রন মিলিত হয়ে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছিল  হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম

মূলত বিগ ব্যাং-এর পরে সৃষ্ট প্রোটন নিউট্রনের অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল প্রতিরূপ প্রোটন ও নিউট্রনের সাথে সংঘর্ষ করে। এই কণাগুলোর এক চতুর্থাংশ হাইড্রোজেন ও অন্যান্য পদার্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ধারণা করা হয় বিগব্যাং-এর ৩ সেকেণ্ড থেকে ১০০,০০০ বৎসরের মধ্যে সৃষ্ট কণাগুলো শীতল হয়ে উঠে এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন নিউট্রন মিলিত হয়ে তৈরি হয় ৩০০,০০০ বৎসর পরে হাইড্রোজেন হিলিয়াম এ ছাড়া এই দুটি পদার্থের সাথে ছিল প্রচুর ইলেক্ট্রন প্লাজমা। এই সময় কোন নক্ষত্রের জন্ম হয় নি। সমগ্র মহাকাশ ছিল অন্ধাকারাচ্ছন্ন। মহাবিশ্বের সৃষ্টির ইতিহাসে এই সময়কে বলা হয় অন্ধকার যুগ (dark ages)। বিগব্যাং-এর পরে ১৫ থেকে ৮০ কোটি বৎসর পর্যন্ত এই অন্ধকার যুগ বিরাজ করেছিল। কালপরিক্রমায় অন্ধকার যুগের সময়কে ধরা যায় ১৩৬০-১২৯৫ কোটি বছর।

এই সময় সকল বস্তুকণা প্রচণ্ড গতিতে বিগ ব্যাং-এর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল
বিগব্যং-এর শুরু দিকে সকল কণিকা ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ক্রমে ক্রমে এগুলো শীতল হতে থাকলো এবং এদের ভিতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে- কাছাকাছি চলে এসেছিল ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তুপুঞ্জ পৃথক পৃথক দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল এই পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পত্তন ঘটেছিল
গ্যালাক্সি। ধারণা করা হয়, বিগব্যাং-এর পরে ৩৮-৫৫ কোটি বৎসর পরে গ্যালাক্সি জন্ম হয়।  কালপরিক্রমায় এই সময়কে ধরা হয়


সূত্র:
বাংলা একাডেমী বিজ্ঞান বিশ্বকোষ। প্রথম খণ্ড। আষাঢ় ১৪০৫/জুন ১৯৯৮।
A Brief history of time । স্টিফেন ডব্লু, হকিং।